প্রচণ্ড গরম, এর মধ্যে নেই বিদ্যুৎ—এই দুইয়ে মিলে কিশোরগঞ্জের জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। টানা তিন দিন ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটছে জেলার পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের। টানা ৭২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের।
পয়লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) রাতে কালবৈশাখী ঝড়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে পল্লী বিদ্যুতের লাইনের ওপর গাছ পড়ে ছিঁড়ে গেছে তার, কোথাও কোথাও ভেঙে পড়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি। ফলে তিন দিন ধরে জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অন্ধকারে নিমজ্জিত। ফ্রিজে রাখা পচনশীল খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট। চার্জের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে মোবাইল ফোনসহ জরুরি যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। সব মিলিয়ে আধুনিক জীবনযাত্রা এখন পুরোপুরি স্থবির।
কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাভুক্ত কিশোরগঞ্জ সদর, নিকলী, বাজিতপুর, হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, কটিয়াদী, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার গ্রাহকেরা এই সংকটের মুখে পড়েছেন। গ্রাহকেরা বলেন, ‘দিনের বেলা তীব্র গরমে ঘরে থাকা দায়, আর রাতে অন্ধকারের কারণে বাড়ছে চুরি। ঝড়ের অজুহাতে এত দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকা মেনে নেওয়া যায় না।’
সদর উপজেলার রশিদাবাদ ইউনিয়নের সগড়া গ্রামের নজরুল ইসলাম, কামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় তিন দিন যাবৎ কোনো বিদ্যুৎ নেই। যে কারণে তীব্র খাবার পানির সংকটে পড়েছি। পাশাপাশি কোরবানির ঈদে বিক্রির জন্য যে গরু লালন-পালন করছি তাতে তীব্র সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। গরুকে গোসল পর্যন্ত দিতে পারছি না। একেকটা গরুর দাম তিন-চার লাখ টাকা। এই সমস্যা থেকে মুক্তি চাই।’
একই গ্রামের বাসিন্দা আলাল উদিন বলেন, ‘আমার ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে পড়াশোনায় ক্ষতি হচ্ছে।’
তাড়াইল উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী,হাবিবুর, দীন ইসলাম বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের ব্যবসায় লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের জয়সিদ্ধি বাজারের ব্যবসায়ী সানি আহমেদ বলেন, ‘আমার কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা চাঙে উঠেছে।’ ইটনা সদর ইউনিয়নের ব্যবসায়ী হাফেজ আবুল হোসেন বলেন লোডশেডিং এর কারনে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে।
সদর উপজেলার লতিবাবাদ ইউনিয়নের অটোরিকশাচালক হান্নান মিয়া বলেন, ‘অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় অটোরিকশা চার্জ দিতে পারছি না। যে কারণে গাড়ি বাসায় পড়ে আছে। ইনকাম নেই। ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছি।’
সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াল ইউনিয়নের বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুৎ নেই তিন দিন ধরে। মোবাইল বন্ধ। যে কারণে আত্মীয়স্বজন মারা গেলেও কাউকে জানানো সম্ভব না।’
কটিয়াদী উপজেলার মানিকখালী বাজারের দোকানদার খাঁজা মিয়া জানান ২৪ ঘন্টায় ১৮ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকেনা। একই উপজেলার জালালপুরের মিজানুর রহমান জীবন এই প্রতিনিধিকে জানান বিদ্যুৎ যায় না বিদ্যুৎ মাঝে মাঝে আসে। নিকলী উপজেলার সদর ইউনিয়নের আবু তাহের জানান বিদ্যুতের জন্য শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করতে পারছে না। বাজিতপুর উপজেলার সরারচর এলাকার ইউনুস মিয়া জানান অব্যাহত লোডশেডিং এর কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে পড়ালেখা ব্যাহত হচ্ছে। অষ্টগ্রাম উপজেলা সদরের সারোয়ার হোসেন বলেন লোডশেডিং নিয়ে আমরা খুব মসিবতে আছি।
মিঠাই মন উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী গোলাম রব্বানী জানান বিদ্যুৎ নিয়মিত ব্যবহারের ফলে এখন বিদ্যুৎ না থাকায় খুবই সমস্যা হচ্ছে।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন ‘পয়লা বৈশাখের রাতে হওয়া ঝড়ে লাইনের ওপর গাছপালা পড়ে তার ছিঁড়ে যাওয়ায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সন্ধ্যায়ও ঝড়ে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে মেইনটেন্যান্স (সংস্কারকাজ) পুরোদমে চলছে এবং আজকের মধ্যেই সব এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হবে।’