আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের কাছে তাঁরা নয় দফা দাবি লিখিতভাবে হস্তান্তর করেছেন এবং এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

তিনি বলেন, জামায়াতের অন্যতম প্রধান দাবি হলো এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া। দেশে ৩০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে তাঁরা বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়া ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের স্থানীয় নির্বাচনে অযোগ্য করার সুপারিশকে বৈষম্যমূলক দাবি করে তা বাতিলের আহ্বান জানান তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একজন ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন, অথচ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না—এ ধরনের বিধান বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জামায়াতের দ্বিতীয় দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ, সেসব দলের নেতা বা পদধারীদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকে রাজনৈতিক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তাই নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া শামসুল আলমের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও বৈঠকে উদ্বেগ জানানো হয়েছে বলে জানান জামায়াতের এই নেতা। তাঁর দাবি, শামসুল আলম অতীতে একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনবিষয়ক কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন—এমন তথ্য ও প্রমাণ তাঁদের কাছে রয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এমন ব্যক্তির নিয়োগ হওয়া উচিত নয়, যার কারণে প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন তাঁদের জানিয়েছে, বিষয়টি সরকারের কাছে অবহিত করা হবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত। দলটির আশঙ্কা, এসব নিয়োগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থানীয় নির্বাচনের মাঠ প্রস্তুতের সুযোগ পেতে পারেন।
এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে জামায়াত। তফসিল ঘোষণার পর তারা পদত্যাগ করলেও যেন প্রার্থী হতে না পারেন—এমন দাবিও জানানো হয়েছে।
জামায়াত আরও দাবি করেছে, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তারা যেন স্থানীয় নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিতে না পারেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নতুন আচরণবিধি প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বৈঠকের বিষয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তাঁদের নয় দফা দাবির কয়েকটি বিষয় নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে বিবেচনায় নিয়েছে এবং কিছু বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। আবার কিছু দাবি সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেও কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘এই মুহূর্তে নির্বাচন বর্জনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।’ তাঁরা এখনো আশাবাদী বলেও জানান তিনি।
তবে নির্বাচন কমিশনের ওপর দলীয় সরকারের কোনো চাপ রয়েছে কি না—এমন একটি বিষয় কমিশনের কথাবার্তা ও আচরণ থেকে তাঁদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কারণে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেওয়ার প্রশ্ন নেই। তবে স্থানীয় শাখাগুলোকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে এবং সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়নের কাজ করতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য কেবল জাতীয় নির্বাচনের জন্য ছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রত্যেক দল নিজ নিজভাবে প্রার্থী দিতে পারবে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁদের নয় দফা দাবির মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচনের মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং জনগণের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
বৈঠকে জামায়াতের প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি, আবদুর রব, মোবারক হোসাইন, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ইয়াছিন আরাফাত।