বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কিছু শ্রমিক সুবিধা পেলেও দেশের বিপুলসংখ্যক অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক এখনো ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত। ফলে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয় নিশ্চিত হচ্ছে না।
শনিবার (১আগষ্ট) সকালে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের হলরুমে ষান্মাসিক সেক্টর দায়িত্বশীল বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কিছু শ্রমিক সুবিধা পেলেও দেশের বিপুলসংখ্যক অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক এখনো ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত। ফলে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয় নিশ্চিত হচ্ছে না। আমরা যে যেই সেক্টরে কাজ করি, সেখানে ন্যায্য মজুরি ও ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।
এখনো বিভিন্ন সেক্টরে আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টা কার্যকর হয়নি। পরিবহন খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিককে দৈনিক ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করে। এমন পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল শ্রমিককে দোষারোপ করা অন্যায়। তাদের সাপ্তাহিক ছুটি নেই, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ নেই। একজন শ্রমিককে মানসিকভাবে সতেজ থাকার ন্যূনতম সুযোগ না দিয়ে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত শ্রম আদায় করা হয়। এটি রাষ্ট্রেরও একটি ব্যর্থতা।
বাংলাদেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই এককভাবে শ্রমিকের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই। একটি সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালক দায়ী হতে পারেন না। গাড়ির ফিটনেস না থাকলে মালিকের দায় রয়েছে, রাস্তার ত্রুটি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা থাকলে তারও জবাবদিহি থাকতে হবে। একইভাবে শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানে শ্রমিকদের জন্য যে অধিকার ও সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবে তারা পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। আইনের প্রয়োগে যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিতও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশের অধিকাংশ শ্রমিক এখনো নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে নারী শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক ও ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে তারা প্রাপ্য ক্ষতিপূরণও পান না। ক্ষতিপূরণ না পাওয়া শ্রমিকদের অন্যতম বড় সংকট। ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। নির্মাণ শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিকসহ বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মক্ষমতা হারানোর পর কোনো পেনশন, রেশনিং বা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পায় না। এটি একটি মানবিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যারা সারাজীবন রাষ্ট্রের অর্থনীতি সচল রাখতে শ্রম দিয়েছেন, বার্ধক্যে তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কর্মক্ষমতা শেষ হলে তাদের জন্য পেনশন, রেশনিং ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আমরা শুধু এসব বাস্তবতা দেখেই থেমে থাকতে পারি না। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যারা ট্রেড ইউনিয়ন করি, যেখানে অন্যায় ও জুলুমে আপস করা যাবে না। আপসকামিতা ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির অধ্যায় থেকে চিরতরে বিদায় নিতে হবে।
আমাদের এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। আমরা জুলুম করি না, জুলুম সহ্যও করব না। মহানবী (সা.)-এর হাদিসে জুলুমের প্রতিবাদ করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আজ শুধু মনে মনে ঘৃণা করার সময় নয়; অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় এসেছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের সব পেশার শ্রমিকের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের জন্য পেনশন, রেশনিং, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারী শ্রমিকদের নিরাপদ, শালীন ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের অর্ধেকেরও বেশি নারী শ্রমশক্তির যথাযথ সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত হলেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।
আমরা বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কর্মীরা যেন গর্বের সঙ্গে বলতে পারি—“আমরা মজলুম শ্রমিকের কণ্ঠস্বর।” সাধারণ শ্রমিকদের কল্যাণে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করাই আমাদের অঙ্গীকার। এই সুযোগকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন এবং একটি সফল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাব।
সাধারণ সম্পাদক লসকর মোঃ তসলিম এর সঞ্চালনায় রিক্সা সেক্টর সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খাঁন, কৃষি ও মৎস সেক্টর সভাপতি গোলাম রব্বানী, পরিবহন সেক্টর সভাপতি কবির আহমদ, স্থলবন্দর সেক্টর সভাপতি মজিবুর রহমান ভুঁইয়া, সহ মোট ১৯ সেক্টরের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বৃন্দ উপস্থিত থেকে রিপোর্ট পর্যালোচনা করেন।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন আমরা মূলত একটি ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন। শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন যদি কেবল গতানুগতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং শ্রমিকের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারে, তাহলে সেই সংগঠন শ্রমিকের কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। রাষ্ট্র শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার যে সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার দিয়েছে, বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগের সুযোগও নিশ্চিত হচ্ছে না।
আমরা যারা বিভিন্ন সেক্টরের দায়িত্বশীল, তারা শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করি। শ্রমিক সংকট ও বাস্তবতা সবার আগে আমাদেরই বুঝতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক বা রুটিনভিত্তিক কাজ করে শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমস্যাগুলো কী, কেন সৃষ্টি এবং কীভাবে তার সমাধান করা যায়—এসব বিষয় গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই প্রকৃত অর্থে শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা রাখা সম্ভব ।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশটি জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এবং অসংখ্য পেশাভিত্তিক সংগঠন রয়েছে। এত ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক সমস্যায় কার্যকর ভূমিকার প্রশ্ন থেকেই যায়, যদি এসব সংগঠন শ্রমিকদের পক্ষে সোচ্চার হতো, তাহলে বহু সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত। এটি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।