বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, দলীয় পেটুয়া বাহিনী দিয়ে জনগণকে দমিয়ে রাখা যায় না, যাবে না। তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রয়োজন জনসমর্থন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জ্বালানি সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবিতে গতকাল শনিবার রাজধানীর বিজয়নগরে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এই শীর্ষ নেতা সরকারের উদ্দেশে বলেন, সংসদে আপনাদের চেয়ে বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল আওয়ামী লীগের। কিন্তু জনগণের বিপক্ষে গিয়ে আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় টিকতে পারেনি। গণভোটের রায় মেনে না নিয়ে আপনারাও জনগণের বিপক্ষে গেলে ক্ষমতায় টিকতে পারবেন না। জনগণ যদি রাজপথে নামে তবে রক্ষা পাওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও বিএনপি মানতে রাজি হয়নি, পরবর্তীতে আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নিয়েছে। জুলাই সনদও বিএনপি মানতে চাচ্ছে না, তবে আন্দোলনের মুখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য হতে হবে।
সরকার মব সৃষ্টিতে উসকানি ও সমর্থন দিচ্ছে উল্লেখ করে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, সরকার যেই সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে, সেই সংবিধানে কি মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই? যদি থাকে তবে কেন জাগপার মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধানের বাসায় মব সৃষ্টি করা হয়েছে? কোন সংবিধানের ক্ষমতাবলে সরকার গঠন করেছেন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, সংবিধানের কিছু অংশ মানবেন কিছু অংশ মানবেন না- তা হতে দেয়া হবে না। জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে। সুতরাং, পুরাতন ব্যবস্থায় আর দেশ চলতে পারে না। নতুন ব্যবস্থার জন্য দ্রুত গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে অধিবেশন ডাকতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপির পরিচালনায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর গণতন্ত্রের পরিবর্তে জিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় বসেই রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠান দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে দখল করে নিয়েছে। মানুষকে তেলের জন্য সরকার সিরিয়ালে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেই সিরিয়ালে দিনের অর্ধেক শেষ হয়ে যায়। সকালে সিরিয়ালে দাঁড়ালে বিকেলে বলে তেল নেই, আবার সন্ধ্যায় এসে লাইনে দাঁড়ালেও বলে তেল নেই। কিন্তু জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, তেলের সংকট নেই। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যাবে একাত্তর ও চব্বিশের জুলাই যোদ্ধাদের চেতনায়, শহীদ ওসমান হাদির চেতনায়। জিয়াতন্ত্র দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, দলীয়করণ বন্ধ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না হলে বাঙ্কারে ঢুকেও রক্ষা পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকারের আচরণ দেখে মনে হয় না চব্বিশের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে কোনো পরিবর্তন হয়েছে। সরকারের আচরণে মনে হয় না, নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। হাসিনার সরকারের মতোই বর্তমান সরকার গণবিরোধী সরকারের ভূমিকায় আবির্ভুত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার সংসদে সংবিধান সংবিধান বলে জিকির করে। কিন্তু, সেই সংবিধানে রয়েছে নাগরিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে মব সৃষ্টি করে তাদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধানের বাড়িতে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের মব সৃষ্টির প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেই সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে সেই সংবিধান মোতাবেক রাশেদ প্রধানের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি।
খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী বলেন, জুলাই যোদ্ধারা ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে রক্ত দিয়েছেন। কিন্তু যারা আজ ক্ষমতায় বসেছেন, তারা জনগণের সঙ্গে গাদ্দারি করে নব্য ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার দিকে ছুটছে। তিনি আরও বলেন, জনগণের বিপক্ষে গিয়ে হাসিনা যেমন রান্না করা খাবার খাওয়ার সময় পায়নি, আপনারাও পাবেন না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সেবাদাস সরকার এদেশের জনগণ মেনে নেবে না।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার বলেন, বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে আমরা এখনো আওয়ামী লীগের যুগে আছি। তিনি বলেন, বিএনপি ফ্যাসিবাদের আমদানি শুরু করেছে। তবে নতুন বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ আমদানি করতে দেয়া হবে না।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে আছি আমরা প্রধানমন্ত্রীর মতো চুপ করে থাকতে পারি না। আজকে কৃত্রিম জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ অতিষ্ঠ। জনগণ বিক্ষব্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসার আগে সময় থাকতে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যা সমাধনের উদ্যোগ নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, গ্রামাঞ্চলে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের ভোগান্তি, তেলের সংকট। কিন্তু সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী দাবি করেছেন, দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই। তাহলে সেই তেল কোথায় রাখা হয়েছে প্রশ্ন রাখেন তিনি। রাশেদ প্রধান বলেন, নতুন করে হাওয়া ভবন তৈরি করা হয়েছে। তিনি কোনো হুমকি-ধামকিতে ভীতু নয়। ইনসাফের পথে লড়াই অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা এনামুল হক বলেন, ৫ আগস্টের আগে যেমনি এদেশের মানুষ ভালো ছিল না, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পরও এদেশের মানুষ ভালো নেই। জনরায় মেনে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের ভালো থাকা কেড়ে নিলে সরকারও ভালো থাকতে পারবে না।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. বিল্লাল হোসেন মিয়াজী বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী গণভোটে হ্যাঁ ভোট চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর তিনি জনরায় উপেক্ষা করে ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে বলেন, মনে রাখবেন জনগণের বিপক্ষে গিয়ে হাসিনাও ক্ষমতায় টিকতে পারেনি, আপনিও পারবেন না।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে বলেছেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, নির্বাচনের পর গণভোটের রায় মেনে না নেওয়ায়ই কী তার প্ল্যান ছিল? জনরায় উপেক্ষা করে বেশি দিন ক্ষমতায় টিকতে পারবেন না, সতর্ক করেন বিডিপি চেয়ারম্যান।
বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি উপস্থিত সর্বসাধারণকে গণমিছিলে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজকের গণমিছিল হবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে। এখান থেকে সরকারকে আমরা বার্তা দিতে চাই- শান্তিপূর্ণভাবে জনরায় মেনে নিন। দেশকে সংকট ও সংঘর্ষের দিকে ঠেলে না দিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
পরে এক বিশাল গণমিছিল বিজয়নগর-কাকরাইল- নাইটেঙ্গেল মোড় হয়ে শান্তিনগর গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে হাজার-হাজার ছাত্র-জনতা অংশগ্রহণ করেন। এসময় ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।