শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা : জ্বালানি সংকটে বোরো ক্ষেতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষক। পাম্প ও ডিলারদের কাছে গিয়ে কাক্সিক্ষত জ্বালানি তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন তারা। এই কারণে এবার বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন শিবালয়ের কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, তারা গেলে পাম্প মালিক ও ডিলাররা ডিজেল সংকট দেখান। অথচ গোপনে বেশি দামে অন্যত্র বিক্রি করেন।
কৃষকরা জানান, ইরানে যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পর থেকেই পাম্প মালিক ও ডিলাররা ডিজেলের সংকট দেখিয়ে গোপনে অন্যত্র বেশি দামে বিক্রি করে আসছেন। ফলে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় হতাশায় ভুগছেন তারা।
গত বৃহস্পতিবার সকালে বরংগাইল রুমি ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি স্টেশনে সাড়ে ৯ হাজার লিটার ডিজেল ও পেট্রোল আসে। সাড়ে চার হাজার লিটার পেট্রোল ও ডিজেল চোরাচালানির মাধ্যমে টেপড়া মামুন এন্টারপাইজের মালিক মামুন প্রধানের কাছে বিক্রি করে দেয়। গত বৃহস্পতিবার সকালে বিষয়টি জানতে পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার। অবৈধভাবে ডিজেল বিক্রি করায় বরংগাইল রুমি ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি স্টেশনের মানেজার এসএম বাবুল হোসেন ও টেপড়া মামুন এন্টারপাইজের মালিক মামুন প্রধানকে আটক করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেই সঙ্গে পাচার হওয়া সাড়ে চার হাজার লিটার ডিজেলসহ একটি লরি জব্দ করেন। এ ব্যাপারে শিবালয় থানায় মামলা হয়েছে।
উথলী ইউনিয়নের কান্দাবাইল গ্রামের আফসার উদ্দিন জানান, তাঁর প্রজেক্টে প্রায় ৬০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেন কৃষকরা। প্রতিবছর কৃষকদের ফসলি জমিতে ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি দেন তিনি। কিন্তু এবার ইরানে যুদ্ধের কারণে বোরো ধান রোপণের শুরু থেকেই ডিজেলের সংকট দেখা দেয়। ডিলারের কাছে ও পাম্পে গিয়ে চাহিদা অনুসারে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। পাম্প মালিকরা সংকট দেখিয়ে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল দিচ্ছেন না। পাম্পে ডিজেল আনতে গেলে চার-পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর ২০-৩০ লিটার ডিজেল দিচ্ছেন, তাও দু-তিন দিন পর পর।
পাম্প মালিকরা বলছেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল নেই। ফলে কম করে ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। এই কারণে এবার বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটে কেবল কৃষক নন, যানবাহন চালকরাও দিশেহারা। পাম্পে গিয়ে চাহিদা অনুসারে ডিজেল না পাওয়ায় বাস ও লঞ্চের ট্রিপ সংখ্যা অনেক কমে গেছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চের চালক আনোয়ার হোসেন বলেন, পাম্পে চাহিদা অনুসারে ডিজেল না পাওয়ায় তাদের লঞ্চের ট্রিপ সংখ্যা অনেক কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে এক একটি লঞ্চ ৮-১০টি ট্রিপ দিতো। ডিজেল সংকটের কারণে এখন পাঁচ-ছয়টি ট্রিপ দিতে হচ্ছে।
পাটুরিয়া-ঢাকা রুটে চলাচলরত বাসের চালক আরমান হোসেন জানান, পাটুরিয়া ঘাট থেকে ঢাকার গাবতলী ঘুরে আসতে ৩০-৩২ লিটার ডিজেল লাগে। পাম্পে গিয়ে ৩০-৩২ লিটার ডিজেল আনতে চার-পাঁচ ঘণ্টা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এই কারণে তাদের ট্রিপ সংখ্যা অনেক কমে গেছে।
ডিজেল সংকটে তাদের মতো অনেক বাস ও লঞ্চের ট্রিপ সংখ্যা কমে গেছে বলে জানিয়েছেন চালকরা।
উথলী মোড়ে সারমো ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার দাউদ হায়দার বলেন, কৃষক ও বাস চালকদের চাহিদা অনুসারে ডিজেল পাম্পে না আসায় কম করে ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। এখন বোরো ধানের মৌসুম, যে কারণে ডিজেলের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া তরফদারের ভাষ্য, এ বছর শিবালয়ে বোরো ধান চাষ হয়েছে ১১ হাজার ৩৪৭ হেক্টর জমিতে। এসব জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য দুই হাজার ৯৭৭টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন (অগভীর নলকূপ) দুই হাজর ৪৬৫টি। ডিজেলচালিত গভীর নলকূপ ১৯টি। বিদ্যুৎচালিত ৪৯৩টি সেচপাম্প রয়েছে। তেলের পাম্পে গিয়ে কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় বোরো ক্ষেতে পানি দিতে সমস্যা হচ্ছে। ডিজেল সংকটে অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, অবৈধভাবে ডিজেল পাচার করে বেশি দামে বিক্রি করায় বরংগাইল রুমি ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি স্টেশনের মানেজার এসএম বাবুল হোসেন ও টেপড়া মামুন এন্টারপাইজের মালিক মামুন প্রধানকে আটক করা হয়েছে। পাচার হওয়া সাড়ে চার হাজার লিটার ডিজেলসহ একটি লরি জব্দ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে শিবালয় থানায় মামলা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে।