- ৫ বছরে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা
- ৫ বছরের জন্য শুল্ক ছাড় দেয়ার পরিকল্পনা
- রাজধানীতে সব বাসার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ
- তৈরি পোশাক খাতের অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে
জ্বালানি সংকটের এসময়ে নতুন করে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সৌর বিদ্যুৎ খাতের। সৌর শক্তি কাজে লাগাতে সরকারও নুতন উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ৫ বছরে সৌর শক্তি থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী মাসে সৌর বিদ্যুতখাতে জন্য নীতিমালা ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার।
এছাড়া রাজধানীর সব বাসার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সৌর শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফল হতে পারলে সব থেকে বেশি লাভবার হবে তৈরি পোশাক খাত। সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এখাতে ৫ বছরের শুল্ক ছাড় দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল বৃহস্পতিবার একটি সেমিনারে বলেছেন, সৌর বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী জুনের মধ্যেই সরকার একটি নীতিমালা ঘোষণা করতে পারে। এ নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মতো বিপ্লব ঘটতে পারে সৌর বিদ্যুৎ খাতে। সৌর বিদ্যুতে পাঁচ বছরের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’ (কর অবকাশ) অথবা নামমাত্র শুল্ক সুবিধা দেওয়া যায় কিনা তা ভেবে দেখা হচ্ছে ।
সূত্র জানায় , পাকিস্তান সরকার সোলার সরঞ্জাম আমদানি করে বিনিয়োগকারীদের (প্রণোদনাসহ) দিয়ে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও সরকার সরঞ্জাম আমদানি করে দিতে পারে অথবা বেসরকারি খাতকে আমদানির সুযোগ করে দিতে পারে সরকার। সোলার ফ্রেম, ফটোকল এবং ব্যাটারি প্রাথমিকভাবে এই তিনটি জিনিসের শুল্ক কমানো নিয়ে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। সরকার বিনিয়োগ করবে না, সরকার কেবল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে। বিনিয়োগ আসবে বেসরকারি খাত থেকে।
সূত্র জানায়, ঢাকায় সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরের সব ছাদ যদি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের দেওয়া হয়, এই দুই এলাকা থেকেই ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। এতে গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎ শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা যাবে বিদ্যুৎ খাতে জাতীয়করণের ফলে ব্যবস্থাপনা ও আদায় ব্যবস্থায় যে স্থবিরতা এসেছে, তা দূর করতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা রয়েছে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় সৌর বিদ্যুৎ গ্রিড স্থিতিশীল রাখতে এবং জ্বালানি ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিদ্যুতের চাপ কমাতে রাজধানী ঢাকার প্রতিটি ভবনে সোলার প্যানেল (সৌর বিদ্যুৎ) বসানোর উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৮০৯ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্বে আসার পর তার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকেই তোলা হয়। কী উপায়ে সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো যায়, তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চায় প্রধানমন্ত্রী।
সূত্র জানায়, ব্যবসায়িক ও লাভজনক মডেল অনুসরণ করে ঢাকা শহরসহ সর্বত্র বাড়ির ছাদে সৌর বিদ্যুতের প্যানেল বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ঢাকাকে ছয়টি বা আরও কয়েকটি ব্লকে ভাগ করা হবে । একেকজন বিনিয়োগকারীকে যদি একেকটি ব্লক দিয়ে দেওয়া যায়। বিনিয়োগকারী নিজে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বেসরকারি পর্যায়ে বিক্রি করবে। এখানে সরকার হাত দেবে না বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, কেউ বাসায় নির্দিষ্ট পরিমাণ সৌর বিদ্যুৎ বসালে তার হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ বা কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। এতে করে সৌর বিদ্যুৎখাতে বিপ্লব ঘটে যাবে। সরকারি জমিতে সৌর প্যানেল বসানোর আরেক পরিকল্পনা রয়েছে। , রেল মন্ত্রণালয়ের প্রচুর জমি খালি পড়ে আছে। মানুষ দখল করে খাচ্ছে। সড়ক বিভাগের প্রচুর জমি খালি পড়ে আছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রচুর খাস জমি আছে। এসব জমিতে সৌর প্যানেল বসানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তানের উদাহরণ বিশ্লেষণ করে প্রবন্ধে দেখানো হয়, দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ সম্ভব হলেও শক্তিশালী গ্রিড ও নীতিগত সহায়তা ছাড়া তা টেকসই হয় না। ভিয়েতনাম দুই বছরে ১৬.৫ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যোগ করলেও দুর্বল গ্রিডের কারণে বিপুল বিদ্যুৎ অপচয় হয়েছে। অন্যদিকে ভারত প্রতিযোগিতামূলক নিলাম ও “প্লাগ অ্যান্ড প্লে” অবকাঠামোর মাধ্যমে সৌরবিদ্যুতের খরচ কমাতে সফল হয়েছে।
ঐ প্রবন্ধে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সোলার হোম সিস্টেম, সোলার সেচপাম্প ও গার্মেন্টস খাতে নেট মিটারিংকে সফল উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে জমি সংকট, উচ্চ আমদানি শুল্ক, দীর্ঘসূত্রতা এবং অনুমোদন জটিলতাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির ওপর উচ্চ শুল্ক বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে ।
প্রবন্ধে রোডম্যাপে কৃষিজমির সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের সমন্বয়, কাপ্তাই লেকে ভাসমান সৌর প্রকল্প, শুল্ক প্রত্যাহার এবং স্মার্ট গ্রিড ও ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়। এছাড়া কমিউনিটি সোলার, গ্রিন বন্ড এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, সূর্য আয়তনে পৃথিবী থেকে প্রায় ১৩ লক্ষগুণ বড়। সূর্যের ভর পৃথিবীর ভরের চেয়ে ৩৩০০০০ (তিন লক্ষ ত্রিশ হাজার) গুণ ভারী। সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৬৫০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় ৩০০০০০০০ (তিন কোটি) ডিগ্রী সেলসিয়াস। সূর্য পৃথিবী থেকে গড়ে ১৪ কোটি ৮৮ লক্ষ কিলোমিটার দূরে। তাই সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে ৮ মিনিট সময় লাগে। সূর্য নিজে থেকেই এক বিশাল এনার্জির উৎস, ৫০০ কোটি বছর থেকে আমাদের এনার্জি সঞ্চার করে আসছে আর নিঃসন্দেহে আরো ৫০০ কোটি বা তার অধিক সময় এনার্জি সঞ্চারিত করেই যাবে। যুগের পরিবর্তনে, প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ সূর্যের আলো প্রয়োজনানুসারে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সোলার প্যানেল বা সৌরবিদ্যুৎ।
লোডশেডিংয়ের সময়টায় কারখানাগুলো ডিজেল জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু অনেক কারখানা যখন তেল জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখনও কিছু প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। এর পেছনের কারণ হলো, কারখানার ছাদে স্থাপন করা সোলার প্যানেল।
তৈরি পোশাক খাতের এরকমই একটি চিত্র এটি। গত কয়েক বছরে দেশের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের কারখানার ছাদগুলোকে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপান্তর করেছে। ৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে তারা ১২ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্যানেল স্থাপন করেছে।
রপ্তানিকারকেরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ইতিমধ্যে দেশের বড় শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী কারখানাগুলো এই উৎপাদন হ্রাসের ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে পারছে।
কেপিজেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, ‘যুদ্ধ বা লোডশেডিংয়ের কারণে সৃষ্ট ডিজেল সংকটে আমরা ভুগছি না। আমাদের অনেক কারখানা রাতে কম চলে, ফলে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করা যায়। সেদিক থেকে সৌরবিদ্যুৎ আমাদের ভালো মুনাফা দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ালে শিল্পকারখানাগুলো লোডশেডিং ও ডিজেল সংকট থেকে রক্ষা পাবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো বড় বাজারগুলোতে ক্রেতারা এখন পরিবেশবান্ধব (গ্রিন) কারখানার প্রতি বেশি ঝুঁকছেন, তাই এটি ক্রয়াদেশ বাড়াতেও সাহায্য করবে।
সূত্র জানায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিক থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫১ শতাংশই এসেছে জীবাশ্ম ছাড়া অন্য জ্বালানি থেকে (নন-ফসিল ফুয়েল)।
কম্বোডিয়া তাদের মোট বিদ্যুতের ৬২ শতাংশই পায় নবায়নযোগ্য উৎস, বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ থেকে। এর ফলে তাদের বস্ত্র খাতে কার্বন নির্গমনের হার অনেক কম। অন্যদিকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট জ্বালানি ব্যবহারে নবায়নযোগ্য বা পরিচ্ছন্ন শক্তির অবদান প্রায় ৪৬ শতাংশ। এর বিপরীতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য উৎসের অবদান মাত্র ৩ শতাংশ।
উদ্যোক্তারা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে প্রধান বাধা হলো এর উচ্চ খরচ। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে শুরুতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয় এবং যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্কও অনেক বেশি।
বর্তমানে শিল্পে ব্যবহৃত (ইন্ডাস্ট্রি-গ্রেড) লিথিয়াম ব্যাটারির ওপর ৫৮ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। কারখানার মালিকেরা বলছেন, চলমান জ্বালানি সংকটের সময়ে দুই-তিন বছরের জন্য হলেও এই শুল্ক কমানো হলে উদ্যোক্তারা ডিজেল জেনারেটরের বদলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে আগ্রহী হবেন। এতে সরকারের জ্বালানি আমদানির খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, যেসব কোম্পানি সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করেছিল, তারা এখন এর সুফল পাচ্ছে, যা একটি ভালো খবর। এটি অন্যদেরও গ্রিন ট্রান্সফরমেশনে উৎসাহিত করবে।
সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াতে তিনি সরকারকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট থেকে শিল্পকে বাঁচাতে আশপাশের আঞ্চল থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আনার বিষয়েও সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মুজাফফর আহমেদ মনে করেন, অনেক কারখানা জ্বালানির সংকটে ভুগছে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানোর বড় সুযোগ তৈরি করেছে। স্রেডা এ বিষয়ে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, যদিও আমদানি শুল্ক কমানোর বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এখতিয়ারে পড়ে।