যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তৈরি এই খসড়া চুক্তিটি গতকাল শুক্রবার রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে বলে বিশেষ সূত্রে জানিয়েছে দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া। আল আরাবিয়ার হাতে আসা চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, উভয় পক্ষই জল, স্থল ও আকাশপথসহ সব ক্ষেত্রে একটি তাৎক্ষণিক, ব্যাপক ও শর্তহীন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের সামরিক, বেসামরিক কিংবা অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে কোনো ধরনের হামলা না চালানোর পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে সমস্ত সামরিক অভিযান বন্ধের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যকার চলমান ‘মিডিয়া যুদ্ধ’ বা প্রচারণামূলক লড়াইও স্থগিত করা হবে। চুক্তিতে একে অপরের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের সুরক্ষায় আরব সাগর, হরমুজ প্রণালি এবং ওমান সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এই খসড়ায়। চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হলে তা নিরসন এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ তদারকি ব্যবস্থা বা মেকানিজম গঠন করা হবে। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে দুই পক্ষ নিজেদের মধ্যকার অন্যান্য অমীমাংসিত সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করবে। চুক্তির শর্তগুলো ইরান যথাযথভাবে মেনে চললে তার বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে, যা দুই পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার সাথে সাথেই কার্যকর হবে। অবশ্য এই চুক্তি নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করতে নারাজ ওয়াশিংটন। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের জানান যে আলোচনায় কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল বা শুল্ক ব্যবস্থা চালু রাখার চেষ্টা করে, তবে এই সংকটের কোনো সমাধান হবে না। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি অধিকাংশ জাহাজের জন্য কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। রুবিও আরও বলেন, আমি অতিরিক্ত আশাবাদী হতে চাই না। আগামী কয়েক দিন কী ঘটে, তা আমাদের দেখতে হবে। রয়টার্স, আল-আরাবিয়া, তাসনিম নিউজ, ফার্স্টপোস্ট, মিডল ইস্ট আই, ইন্ডিপেন্ডেন্ট।

আলোচনার টেবিলে দুই দেশের মধ্যকার দূরত্ব অনেকটাই কমে এসেছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখনো কিছু বিষয়ে মতদ্বৈধতা রয়ে গেছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন এক ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা। তা সত্ত্বেও, পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতায় দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থা কাটানোর ক্ষেত্রে একে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

ইরানের উদ্দেশে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হতে পারে এমন গুঞ্জনের মধ্যে ইরানে যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির। গতকাল শুক্রবার (২২ মে) তিনি তেহরানের উদ্দেশে রওনা দেন।

পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের বরাতে ইরানি সংবাদমাধ্যম ইরনা জানিয়েছে, ফিল্ড মার্শাল মুনির ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বর্তমানে পাকিস্তানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি ইরানে অবস্থান করছেন।

গত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যদি কোনো চুক্তির সম্ভাবনা থাকে তাহলে ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির ইরানে যাবেন। গত বৃহস্পতিবার তার যাওয়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত আর যাননি। যদি তিনি গতকাল যেতেন তাহলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করতেন মুনির।

এদিকে সৌদি আরবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়া জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার একটি খসড়া চুক্তি আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘোষণা দেওয়া হবে। যদিও এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘোষণা এখনো আসেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ইরান শান্তি আলোচনায় বড় অগ্রগতির খোঁজে পাকিস্তান

যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা করতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠকে বসলেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভি; যদিও ইউরেনিয়ামের মজুত এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মূল বিরোধগুলো এখনো কাটেনি। ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাত্র দুই দিন পর গতকাল শুক্রবার তেহরানে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ ও আইএসএনএ জানিয়েছে। আইএসএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের অবসান ও দুই পক্ষের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যেই পাকিস্তান এই আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় কিছু ‘ভালো লক্ষণ’ দেখা গেছে। তবে তেহরান হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল আরোপের চেষ্টা করলে কোনো সমাধান সম্ভব নয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। রুবিও সতর্ক করে বলেন, ‘আমি এখনই বেশি আশাবাদী হতে চাই না। আগামী কয়েক দিনে কী ঘটে, দেখা যাক।’ ইরানের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, দুই পক্ষের মধ্যকার বড় মতবিরোধগুলো কিছুটা কমে এসেছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রধান অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

হজ¦ শেষ হওয়া পর্যন্ত ইরানে হামলা স্থগিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদীর আহ্বান

সৌদি আরবের এক সতর্কবার্তার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন বলে একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সৌদি আরব হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে পবিত্র হজ চলাকালীন এই ধরনের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের মারাত্মক ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ করতে পারে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়ার পর দেশটিতে আবারও বিমান হামলা শুরু করার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি তার অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং জানান যে এই যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে তার কোনো তাড়া নেই। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছিলেন, তিনি ইরানের ওপর হামলা চালানোর ঠিক ‘এক ঘণ্টা আগের’ চূড়ান্ত অবস্থানে ছিলেন, কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতাদের মধ্যস্থতায় তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেন।

এক সাক্ষাৎকারে উপসাগরীয় অঞ্চলের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল যে এই পবিত্র হজ মৌসুমে হামলা চালানো হলে মুসলিম বিশ্বে আমেরিকার মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। এছাড়া, হজে¦র ঠিক পরপরই মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা উদযাপিত হয়।

এই সময়ে যদি নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয় এবং ইরান পাল্টা জবাব হিসেবে সৌদি আরব বা এর আশেপাশের দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, তবে অঞ্চলজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। এর ফলে হজে আসা লাখ লাখ পুণ্যার্থী সেখানে আটকা পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় দশ লাখের বেশি মুসলিম হজ পালন করতে সৌদি আরবে সমবেত হন।

আলোচনার বিষয়ে অবগত একজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাও এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ট্রাম্পের নিজস্ব পরামর্শক দলও তাকে সতর্ক করেছিল যে হজের সময় হামলা চালালে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে আনবে। তবে সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তাই ধারণা করছেন, হজে¦র আনুষ্ঠানিকতা এবং ইসলামের এই পবিত্র উৎসব শেষ হওয়ার পর আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হতে পারে। চলতি বছরের রমজান মাসের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু হজ¦ মৌসুমের বিশাল জনসমাগম এবং এর সাথে জড়িত লজিস্টিক ও কৌশলগত জটিলতার কারণে এবার হামলা চালানো থেকে বিরত থাকাকেই শ্রেয় মনে করেছে হোয়াইট হাউস।

এদিকে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নতুন কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে চলমান ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইরান ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত গতিতে তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করেছে। সিএনএন-কে চারজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান ইতোমধ্যে তাদের ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো প্রতিস্থাপন করেছে এবং সামরিক উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ইরানকে পুনর্গঠনের জন্য যে সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল, ইরানিরা তার চেয়েও দ্রুত গতিতে এটি সম্পন্ন করেছে। ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, তারা এই যুদ্ধবিরতির সুযোগকে দেশের শক্তি এবং সামরিক সক্ষমতা ‘পুনর্নির্মাণের’ কাজে সফলভাবে ব্যবহার করেছেন।