বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের শতাধিক বিশিষ্ট মুফতি এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছেন, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অনুমোদিত 'সম্পত্তি হস্তান্তর আইন'টি সরাসরি কুরআন হাদীস তথা ইসলামী বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তারা অনতিবিলম্বে কোরআন বিরোধী এ আইন বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে বিশিষ্ট মুফতিগণ বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনটি (Gift Reserving Life Usufruct.) (যাতে বলা হয়েছে- নির্দিষ্ট রক্ত-সম্পর্কীয় ব্যক্তি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমনভাবে সম্পতি দান করা যাবে, যাতে দাতা তাঁর জীবদ্দশায় ঐ সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারেন।") পাস করে ৯১ ভাগ মুসলমানের এই দেশে, বর্তমান সরকার আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ইসলামী বিধানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এটি সরাসরি কুরআন হাদীস তথা ইসলামী বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। অনতিবিলম্বে কোরআন বিরোধী এ আইন বাতিল না করলে সরকারকে চরম খেসারত দিতে হবে।

মুফতিগণ বলেন:

১.হেবা তথা দানের ক্ষেত্রে দানকারী দানীয় সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার- এটা দ্বারা মূলত মরনের পরে যেহেতু দেওয়া হচ্ছে সেহেতু এটা "মিরাসী সম্পত্তি বোঝায়"। অপরদিকে মিরাসী সম্পত্তি আল্লাহতালা কর্তৃক নির্ধারিত ওয়ারিশগণ নির্ধারিত অংশ পাবেন এখানে ইন্টারফেয়ার করার কোন সুযোগ নেই।

২. দ্বিতীয়ত: হেবা করার পর উক্ত দানীয় সম্পদ দাতা কর্তৃক ভোগ করার ক্ষেত্রে শরীয়তের কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বরং বোখারী মুসলিম শরীফসহ সহি হাদিসের কিতাবে বলা হয়েছে:"দান করে ওই সম্পদ যদি কেউ ফেরত নেয় তাহলে সে ঐ কুকুর যে কুকুর নিজের বমি নিজে খায়"

৩. ওয়াসিয়াতের ক্ষেত্রে একটি সীমা ঠিক করে দেওয়া আছে যে, ক.সর্বোচ্চ এক তৃতীয় অংশ ওসিহত করতে পারবেন। খ. ওয়ারিসদের কে ওসিহত করা যাবে না। সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে: "মহান আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অতএব কোন ওয়ারিসের জন্য ওসিয়াত করা যাবে না।"

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মুসলিম এবং মুসলিম নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পত্তির হস্তান্তরের ক্ষেত্রে হেবা, মিরাস ও ওসিয়াতের বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সম্পত্তি দানসংক্রান্ত নতুন কোনো আইন বা বিধান প্রণয়নের সময় ইসলামী শরিয়াহর প্রতিষ্ঠিত নীতিমালার সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এই ব্যবস্থা ইসলামী আইনের হেবা (দান), মিরাস (উত্তরাধিকার) এবং ওসিয়াত (Will/Bequest)—এই তিনটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থার মধ্যকার সীমারেখা ও শর্তাবলির আলোকে গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহগত প্রশ্নের উদ্রেক করে।

স্থায়ী ফতোয়া কমিটির মত: সৌদি আরবের আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ লিল-বুহূস আল-ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতা-র ১১০৮৭ নম্বর ফতোয়ায় বলা হয়েছে

International Union of Muslim Scholars—IUMS)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বিষয়টির ক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্স-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত … সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং কোনো উত্তরাধিকারীর ক্ষতি না করার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়ায়ও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওয়ারিশদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সব সম্পত্তি হেবা করে দেওয়া গুনাহের কাজ।

উল্লেখ্য যে ধর্মমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১/২/২০২৬ তারিখ এ ব্যাপারে ফতোয়া চাওয়ার প্রেক্ষিতে বাইতুল মোকাররমের খতিব আল্লামা মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব ৪/২/২০২৬ নিম্নোক্ত ফতোয়া প্রদান করেন:-

“১. এ ধরনের হেবার হুকুম যা-ই হোক না কেন, যেহেতু এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত মিরাস বণ্টননীতিকে এড়িয়ে যাওয়া, তাই এ ধরনের হেবা স্পষ্ট হারাম।হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে—

“যে ব্যক্তি আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন— এমন কোন উত্তরাধিকার বাতিল করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের উত্তরাধিকার বাতিল করে দেন। —সুনানে সাঈদ বিন মানসূর, পৃ. ১১৮, হাদীস ২৮৫; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, খ. ১৬, পৃ. ২১৫, বর্ণনা ৩১৬৬৮”

২.দ্বিতীয় কথা হলো, নিজের জীবদ্দশায় এভাবে হেবা করা যে, হেবাকারীর মৃত্যুর পর তা কার্যকর হবে— এটির নাম যদিও হেবা, কিন্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিবেচনায় এটি হচ্ছে অসিয়ত। অথচ ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত করা শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম এবং বাতিল। অর্থাৎ কেউ যদি এ হারামে লিপ্তও হয়, তবুও তা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে হ্যাঁ, যদি সকল ওয়ারিশ প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং তারা স্বেচ্ছায় খুশি মনে উক্ত অসিয়ত বাস্তবায়ন করে দেয় তাহলে ভিন্ন কথা। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে—"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছেন। অতএব কোন উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই। —জামে তিরমিযী, হাদীস ২১১৭; কিফায়াতুল মুগতাধী, খ. ১১, পৃ. ৪১০”

হাদীস ও ফিকহের অনেক ইমাম স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এ হাদীসে যে বিধান দেয়া হয়েছে, তা ইসলামী শরীয়তের মুজমা আলাইহি (ইজমাসম্মত) বিধান। এবং এ বিধান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তাওয়াতুর সূত্রে প্রমাণিত। অর্থাৎ এটি সাধারণ কোন সহীহ হাদীস নয়; বরং মুতাওয়াতির হাদীস, যা প্রত্যাখ্যান করা মানে কুরআনের হুকুমকে প্রত্যাখ্যান করা।”

অতএব আইনটি বাতিল করে দেশের স্বীকৃত মুফতি, ইসলামি আইনবিশেষজ্ঞ, মুসলিম পারিবারিক আইনবিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট আলেমদের সমন্বয়ে এর বিস্তারিত শরিয়াহ পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। বিষয়টির ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, পারিবারিক সম্পত্তির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং শরিয়াহ নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত বিধানটি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পুনঃপর্যালোচনা জরুরী.

তাই দেশের শীর্ষ মুফতি গণসম্পত্তি হস্তান্তর আইনটি যেহেতু সরাসরি কুরআন- সুন্নাহ বিরোধী অতএব এ আইনটি বাতিল করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

সকলকে মনে রাখতে হবে, সরকার আসে, সরকার যায়, ইসলামিক বিধান নিয়ে ষড়যন্ত্র ও তামাশা করে কেউ কোনদিন টিকে থাকতে পারে না। তাই অবিলম্বে সরকার এ কোরআন বিরোধী আইন বাতিল করতে হবে। অন্যথায় যেকোনো পরিস্থিতির দায়-দায়িত্ব সরকারকে বহন করতে হবে।

বিবৃতিতে নিম্নোক্ত মুফতি গণ স্বাক্ষর করেন,

বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য, ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন পরিষদের আমীর ও সম্মিলিত উলামা সভাপতি মুফতি মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন, বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ড ও সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব ড. মুফতি মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী, জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য,মুফতি আবু জাফর কাসেমী, ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহ কাউন্সিলের সাবেক সেক্রেটারি ড. মুফতি মাওলানা আব্দুস সামাদ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ ড. সামিউল হক ফারুকী,মুফতি আলী হাসান ওসামা, মুফতি নুরুজ্জামান নোমানী,শায়খ সাইফুল্লাহ নোমানি,খতিব ও পরিচালক আল- আমিন জামে মসজিদ ও মাদরাসা, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা, মুফতি শফিকুল ইসলাম বিন বাহাউদ্দিন, বেফাকুল মাদারিস বাংলাদেশ, মুফতি আবু দাউদ জাকারিয়া,মুফতি আবুল কাশেম গাজী,মুফতি আব্দুল আউয়াল,মুফতি মুজিবুর রহমান হামিদী, প্রধান মুফতি মাদ্রাসা নুরিয়া ঢাকা, মুফতি সুলতান মহিউদ্দীন, ইফতার বিভাগ মাদ্রাসা নুরিয়া ঢাকা, মুফতি আবুল কালাম মুহতামিম মিরপুর জামিয়া মুফতি বরকত উল্লাহ আনসারী,খতিব ও প্রিন্সিপাল, বাইতুল মেরাজ জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা ঢাকা,খতিব সাবার জামে মসজিদ,মুফতি ফখরুল ইসলাম, মুহতামিম বাইতুল আজিজ মাদ্রাসা কামরাঙ্গীরচর, মুফতি আবুল কাশেম কাসেমী, মুফতি কবির আজহারী আজহারী,খতিব বিশ্ব রোড জামে মসজিদ, মুফতি ইসমাইল হোসাইন,প্রফেসর মুফতি আ.ন.ম. রশিদ আহমাদ মাদানী, ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন পরিষদের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ আশরাফী, হক্কানী পীর মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব মুফতি মাওলানা শাহ আরিফ বিল্লাহ সিদ্দীকি, খেলাফাতে রব্বানী আমির মুফতি ফয়জুল হক জালালাবাদী, মুফতি মহিউদ্দিন খতিব আদর্শ নগর জামে মসজিদ ঢাকা, মুফতি সরফুল ইসলাম, খতিব আফতাব নগর জামে মসজিদ, মুফতি ডক্টর জাকারিয়া নূর, মুফতি লুৎফর রহমান খতিব পল্টন জামে মসজিদ,খতিব পল্টন জামে মসজিদ, মুফতি ইব্রাহিম খলিল টঙ্গী,অধ্যক্ষ মুফতি মিজানুর রহমান খতিব আনোয়ারা খাতুন জামে মসজিদ ঢাকা, অধ্যাপক মুফতি শফিকুল ইসলাম খতিব আবহাওয়া কোয়াটার জামে মসজিদ উত্তরা ঢাকা,মুফতি আব্দুল কুদ্দুস, খতিব খালাসী জামে মসজিদ খুলনা, মুফতি অধ্যক্ষ রাহমাতুল্লাহ, খতিব নেসারিয়া জামে মসজিদ খুলনা, মুফতি অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, খতিব বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদ খুলনা, মুফতি মোস্তাফিজুর রহমান, মুফতি জাহিদুর রহমান,খতীভ চাঁদনী চক জামে মসজিদ ঢাকা, পীর মুফতি মাওলানা শরীফ হোসাইন, মুসলিম জনতা পরিষদের আমির মুফতি মাওলানা আজিজুর রহমান আজিজ,হক্কানী ত্বরীকত মিশনের জেনারেল সেক্রেটারী মুফতি আল্লামা মুস্তাক আহমাদ, জমিয়াতে উলামা দেওবন্দ পরিষদের সেক্রেটারী হযরত মুফতি মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক কাসেমী, মীরের সরাইর পীর সাহেব মুফতি মাওলানা আঃ মোমেন নাছেরী, টেকের হাটের পীর সাহেব মুফতি মাওলানা কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী, অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা মোশাররফ হোসাইন, মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার,গাউছিয়া দরবার শরিফের পীর মুফতি ড. আব্দুল কাইউম আল আযহারী,বিশিষ্ঠ মুফাসসির মুফতি মাওলানা ফখরুদ্দীন আহমাদ, মুফতি মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালী, মুফতি মাওলানা মো: নূরুল আমীন, মুফতি ড. কামরুল হাসান শাহীন, মুফতি ড. সাইফুল ইসলাম রফিক (প্রিন্সিপাল মুহাম্মাদাবাদ ফাযিল মাদরাসা),জাতীয় খতীব পরিষদের আমীর মুফতি মাওলানা মাউদুর রহমান, হুফ্ফাজ পরিষদ সেক্রেটারী মুফতি মাহবুবুর রহমান, মাওলানা সাদিকুর রহমান আজহারী,কওমী হাফেজ পরিষদ সভাপতি মুফতি নূরুল আমিন গোপালগন্জী হুজুর, সম্মিলিত ইসলামিক জোটের আমির মুফতি মাওলানা আবদুল বাকি, ইসলামী জনতা সভাপতি মুফতি আবদুল কুদ্দুস, মহাসচিব হাফেজ মুফতি আবুল কাসেম, মুহাদ্দিস আবু বকর সিদ্দিক, ইসলাহুল উম্মাহ সভাপতি মুফতি মাওলানা আবু হানিফ নেছারী, মুফতি ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন আযহারী, মুফতি মাওলানা ইরশাদুল্লাহ আযহারী, মুফতি মাওলানা আবু নাঈম, মুফতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ(খতিব, আজাদ মসজিদ, গুলশান), মুফতি মাওলানা সাদিক মুহাম্মাদ ইয়াকুব আল আযহারী প্রমুখ।