তাজ ইসলাম
আমাদের কী কী নাই
বলাটাও শিখি নাই
যতটুকু শিখছি
তাও ভয়ে লিখি নাই।
স্লোগানের হাত নাই
পেট ভরা ভাত নাই
জোসনার চাঁদ দেখে
ঘুমানোর রাত নাই
আমাদের কী কী নাই
টাস করে বলবার
ভাষাটাও শিখি নাই।
আমাদের কী কী নাই
সাহসের সাথে বলা
কৌশলও শিখি নাই।
পুরো ছড়া এখানে নাই। সম্পূর্ণ ছড়া আছে ছড়া সংকলনে। এই ছড়াটা ছাপা হয়েছে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ‘ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছড়া’ সংকলনে। এটি আমার ছড়া। নিজের ছড়া সংকলনে ছড়া ছাপা হয়েছে প্রায় ৩১৩ জন ছড়াকারের। ৩৬০ পৃষ্ঠার বিশাল কলেবর।
এর আগে বাংলা একাডেমি গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা সংকলন করেছে জুলাই ভিত্তিক। কবিতা সংকলন বিতর্কিত হয়েছে সারাদেশে। ছড়া সংকলনটি নিয়ে আপাতত কোন বিতর্ক চোখে পড়েনি। ৩১৩ জনের ছড়া নির্বাচিত করা হয়তো কাকতালীয়। তবে ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে দারুণভাবে মিলে যায়। সত্য মিথ্যার প্রথম লড়াইয়ে সত্যের পক্ষের লড়াকু ছিলেন ৩১৩ জন।
জুলাইয়ে সত্য মিথ্যা, শান্তি অশান্তির সংঘাত ছিল। জালেম ও মজলুমের লড়াই ছিল, ফ্যাসিবাদ ও নিরীহ জনতার লড়াই ছিল, একনায়কতন্ত্র ও গণতন্ত্রের লড়াই ছিল। সে লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠুর, পাষাণ, হত্যাকারী, খুনি ফ্যাসিস্টের পলায়ন হয়। শান্তিকামী মানুষের হয় বিজয়।
১৬ বছরের সংগ্রাম জুলাইয়ে এসে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের মতো উত্তপ্ত হয় সমগ্র দেশ। জন বিক্ষোভ, গণঅভ্যুত্থান পরিণত হয় গণ বিপ্লবে। বিপ্লবে পালিয়ে যায় ইতিহাসের কুখ্যাত চরিত্র হাসিনা সরকার।
এই লড়াইয়ে সর্বস্তরের জনতা সত্যের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যায়। সমগ্র বাংলাদেশ দু ভাগে বিভক্ত হয়। এক পক্ষে খুনি হাসিনার আওয়ামী লীগ অন্য পক্ষে সমগ্র বাংলাদেশ।
কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক কলম যেমন হাতে নেন, রাজপথেও মিছিলে স্লোগানে তারা ছিলেন সোচ্চার। ছড়াকাররাও তাদের শব্দ বুলেটে উদ্দীপ্ত করেন সংগ্রামীদের।
শব্দবানে জর্জরিত করেন ফ্যাসিস্টদের। তারা নিজের জীবন বাজি রেখেই সজ্ঞানে সরব ছিলেন।
বাংলা একাডেমি ছড়াকারদের ছড়া নিয়ে সংকলন করে পালন করেছেন ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে কথা বলা, কিছু লেখা কোনটাই নিরাপদ ছিল না। যে বা যারাই কথা বলেছে তারাই হয়েছে হাসিনার খুনি বাহিনীর শত্রু। ছড়া লেখাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তবু ছড়াকারগণ সাহসের সাথে লিখে গেছেন। তখনও একদল কবি, ছড়াকার লেখায় বক্তব্যে সমর্থন দিয়েছে ফ্যাসিস্টকে। এসব একদিন ইতিহাস হবে। ইতিহাসের তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা সময়ের কাজ। বাংলা একাডেমি সেই কাজ নিজের দায়িত্ব মনে করেছে।
৩১৩ জন ছড়াকারের ছড়া আছে সংকলনে। শুধু মাত্র নাম উল্লেখ করলেও বিশাল আয়োজন। উদ্ধৃতি দেওয়া আরও জটিল। প্রথম ছড়াটি অনিক খানের। অনিক খান প্রথমে এসেছেন হরফের যাদুতে। অর্থাৎ সূচি করা হয়েছে হরফের ভিত্তিতে। তার ছড়ার প্রথম পর্বের কী চাস? পিশাচ অন্তমিল দুর্বল। তবে বক্তব্য চমৎকার। অনিক খানের পর অলাত এহসান, আইউব সৈয়দ, আতিক হেলাল, আফসার নিজাম, আবদুল হাই শিকদার, আবিদ আজম এর ছড়া আছে।
এই মহৎ কাজের গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন আবিদ আজম। আবিদ আজম সম্পাদক, সহকারী সম্পাদক জিয়া হক। আর প্রধান সম্পাদক হিসেবে আছেন মোহাম্মদ আজম। ছড়া আছে আমিন আল আসাদ, আরমান জিহাদ, আল নাহিয়ান, আল হাফিজ, আহমদ আমিন, আহমেদ ইসহাক, ইমরান মাহফুজের।
ইরশাদ জামিল, এনায়েত রসুল, এরশাদ জাহান, ওলি মুন্সি, জগলুল হায়দারও লিখেছেন এই সংখ্যায়। জনি হোসেন কাব্য জব্বার আল নাঈম, জাকির আবু জাফর, জানে আলম, জামসেদ ওয়াজেদ, দিপ্র হাসান, নকিব মুকশি, নয়ন আহমেদ, নোমান সাদিক,পলিয়ার ওয়াহিদ, ফরিদ সাইদ, ফেরদৌস সালাম,বকুল আশরাফ, মহিবুর রহিম, মাহফুজ ইকরাম, মাহফুজা অনন্যার প্রতিবাদী ছড়া পাঠককে মোহিত করে।
‘ ছাত্রসমাজ ডাক দিয়েছে, লোকটা ছোটে রাজপথে,/ প্রেত তাড়াতে লাখো মানুষ নেমে এলো আজ পথে (মাহমুদউল্লাহ) ‘
‘ এই ছেলে জেন-জি/সময়ের কথা বলে/ অনিয়ম, দুর্নীতি / করে দেবে চেইঞ্জই ( মিজান ফারাবী)’
‘করবা কী আর? হয় বড়োজোর/ দিবা না হয় ফাঁসি/ ঈমান আছে, ন্যায়ের পথে/ মরণ ভালোবাসি/ সত্য বলার সাহস রাখি/ অহংকার ও বড়াই না,/ আমরা তো আর ডরাই না। (মুন্সি বোরহান মাহমুদ)
তিনজনের তিনটা ছড়ার একটু অংশ উপস্থাপন করলাম। তিনটা ছড়া তিন জনের, তিন রকমের। বিষয় জুলাই,কিন্ত বক্তব্য,উপস্থাপন ভিন্নরকম। একটি সংকলনে ৩১৩ জন ছড়াকারের ছড়া আছে। একেকজন ছড়াকার নিজের মতো করে নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। সমগ্র সংকলন পাঠ করলে ছড়ার মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ পাঠকের কাছে হাজির হবে একটি সময়, সময়ের ইতিহাস। সে ইতিহাসে থাকবে জুলাইয়ের খুনিদের চরিত্র আর জুলাইয়ের লড়াকুদের গৌরব, ত্যাগ সাহসীকতার কথা। কাজেই অনায়াসে বলা যায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সম্পাদক আবিদ আজমকে এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য আমরা আবারও অভিনন্দন জানাতে পারি। এই গ্রন্থে
ছড়াকারের তালিকায় আছেন মুর্শিদ-উল-আলম, মুস্তাফা ইসলাহী,মুহিব নেসার, মুহিম মাহফুজ, মোশাররফ হোসেন খান, মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন, রহমান তাওহীদ, রেজা কারীম।
রেদওয়ানুল হক রেদুমিক লেখেন। এই সংকলনে তার তিনটি রেদুমিকের একটি এমন,
‘ উল্টে যাবে সেদিন তোমার গদিটিও/ যেদিন ঠিকই জাগবে মানুষ/ তুমুল বেগে রাগবে মানুষ/ থামবে না আর বিষের কালো নদীটিও।/ উল্টে যাবে সেদিন তোমার গদিটিও/ যেদিন ঠিকই চাবেন খাদা অদ্বিতীয়।
জুলাইয়ে কবিতার খাতা ছেড়ে মিছিলে, স্লোগানে সশরীরে হাজির ছিল নিরীহ একজন শব্দ সৈনিক। ঢাকাসহ সারাদেশে এদের সংখ্যা অগণিত। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনের দীর্ঘ জুলুম পীড়নে তারা অতিষ্ঠ হয়েছিল। দেশের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে সেদিন এক হয়েছিল বিবেকবান মানুষেরা। ৫আগস্টের পর তারা আবার ফিরে গিয়েছিল কবিতার খাতায়। কেউ কেউ তখনও জুলাইকে রক্ষা করতে মাঠে ময়দানে ছিল তৎপর। শরিফ ওসমান হাদি তাদের একজন। হাদি পরবর্তী সময়ে দেশ বিদেশে তুমুল আলোচিত জুলাইযোদ্ধ। তিনি রাজপথের কবি, বিপ্লবের কবি ,বিপ্লবীদের কবি হয়ে পরিচিতি পেলেন। এই গ্রন্থে গ্রন্থিত হয়েছে তার কিছু পঙক্তি। তার সেসব পঙক্তি যেন জুলাই ও ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে বিশ্লেষণ করার তুখোড় শব্দমালা। ‘ জুলাইয়ের পঙক্তি ‘ শিরোনামের কয়েকটি ছোট ছোট ছড়া থেকে আমরা উদ্ধৃত করলাম
‘আয়নাঘর আর মর্গ/ ফেরাউসিনার স্বর্গ।/...’
‘একাত্তরেও এত গুলি/ ঢাকার মাইনষে দেহে নাই/ হাসপাতালেও হামলা করতে / দস্যু রানির বাধে নাই।’ হাদি আজ আর আমাদের মাঝে নাই। ‘ জান দেবো জুলাই দেব না ‘ বলা হাদি নিজের জান দিয়ে জুলাইকে রক্ষার সংগ্রাম জারি রেখেছেন।
‘শহিদ আজাদ, শাকিল মাহমুদ, শাকিল রিয়াজ, শান্তা মারিয়া, শাহনাজ পারভীন, শাহাদাত ফাহিম, শিকদার মোস্তফা, সরদার আব্বাস উদ্দিন, সাজজাদ হোসাইন খান ছড়া লিখে জুলাই যোদ্ধা তালিকায় রয়ে গেছেন স মহিমায়।
সাম্য শাহ, সায়দী উসমান, সিদ্দিক আবুবকর, সুদীপ কুমার দীপ, সুমন রায়হানদের সুখপাঠ্য ছড়া গ্রন্থের গুরুত্ব বৃদ্ধি সহায়ক।
‘ লগি বৈঠার মন্ত্র পড়ে/ বাকশালীদের তন্ত্রধরে/ দেশটারে তুই দাবাস, সাবাস বুবু সাবাস। ( হাসনাইন ইকবাল)’ সহজ কথায় ঐতিহাসিক তথ্য আর বাস্তবতা জানতে এই সংকলনটি সংগ্রহশালাকে সম্ভ্রান্ত করতে সহায়ক হবে নিঃসন্দেহে।
হাসান রোবায়ের,হাসান হাফিজ, হোসনে মোবারক, হোসাইন মোস্তফা দিয়ে এই বিশাল কলেবরের সংকলনটি সমাপ্ত। আমরা ঘরে ঘরে, পাঠকের হাতে হাতে পৌছে যাওয়ার শুভ কামনা করি। বাংলা একাডেমির এমন কাজের প্রশংসা করতেই হয়। সারাদেশে আরও অনেক সংগ্রামী ছড়াকার রয়ে গেছে। আমরা এর আরও সংখ্যা প্রত্যাশা করি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছড়া
সম্পাদক : আবিদ আজম
মূল্য:৭০০ টাকা
প্রকাশক বাংলা একাডেমি।
প্রথম প্রকাশ
ফাল্গুন ১৪৩২/ফেব্রুয়ারি ২০২৬