আহসান হাবিব বুলবুল

Poetry is the spontaneous over-flow of powerful feelings.-wordsworth.

কবিতা হল অনুভূতির শিল্পরূপ, চিন্তার নান্দনিক প্রকাশ-যা কবির অন্তরের গহীন কোণ থেকে শব্দ ও ছন্দের আলপনায় ফুটে ওঠে। কবি শাহীন সৈকত এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “জলের শব্দে তোমার ঘ্রাণ” (প্রকাশকাল-একুশে বইমেলা’২০২৬) এমনই এক অনুভূতির স্মারক, যা সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার ধারায় একটি নবতর সংযোজন। নব্বই এর দশকে বেড়ে ওঠা কবি তাঁর এই কাব্যগ্রন্থে কেবল শব্দের বুননই করেন নি, বরং জীবন প্রেম প্রকৃতি দেশাত্মবাধ নানা মাত্রিক রূপকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন; যা পাঠককে বাস্তবতার রূক্ষতা থেকে টেনে নিয়ে যায় কল্পনার এক মায়াবী জগতে। গ্রন্থটির ছত্রে ছত্রে মিশে আছে আনন্দ, বিরহ, গ্রামীণ জীবন মধ্যবিত্তের সুখ দুঃখ ও জীবনবোধের এক প্রগাঢ় সত্য।

‘জলের শব্দে তোমার গ্রাণ’ নামটি শুরুতেই পাঠককে একটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়। কবি শাহীন সৈকত শব্দের ব্যবহারে বিশেষ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। জলের অবিরাম শব্দ এবং প্রিয়জনের ঘ্রাণ দুইয়ের সংমিশ্রণে কবি যে রোমান্টিক আবহ তৈরি করেছেন তা পাঠককে চুম্বকের মতো টানে।

তোমার চোখে ডুব দেবো বলে

বসে আছি কখন সূর্য ডোবে

চাঁদ ভেসে ওঠে দূর আকাশে

রাত্রি নামে যদি তবে। (চোখের জলে ডুব)

অথবা,

তুমি এলে এ হৃদয়ে প্রশান্তি নামে

মিলে মিশে একাকার জল আর ঘামে। (প্রণয় পঙক্তি)

এই গ্রন্থে আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতি এবং সমাজ-রাজনীতির বিচিত্র অনুসঙ্গ উঠে এসেছে; তবে এর মূল সুরটি একান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতির; যেখানে কবি নিজের অস্তিত্বের অনুসন্ধান করেছেন। শহরকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনের ক্লান্তি এবং যান্ত্রিকতার বিপরীতে প্রকৃতি ও ভালোবাসার আশ্রয় খুঁজেছেন তিনি।

আমরা লক্ষ্য করি, কবির জন্ম পদ্মাপাড়ের ‘পুরুলী’ গ্রামের নানাবাড়িতে। গ্রামীণ পরিবেশে নদীর কলতান শুনে, সবুজের রঙ মেখে, কাঁদামাটির সোঁদা গন্ধ নিয়ে ও প্রজাপতির সাথে সখ্য করে তাঁর বেড়েওঠা। শৈশব কৈশোরের সেই গড়ন আজো তার জীবনকে ছেঁয়ে আছে। কবি গন্থের মুখবন্ধে লিখেছেন, “... আর বেড়ে ওঠার কাল কেটেছে পদ্মার তীরবর্তী গোপালবাড়ি গ্রামে, তাই আমার গায়ে পলিমাটির সোঁদা গন্ধ লেগে আছে ভালোভাবেই। এতে আমার কোনো গ্লানি নেই, আমি তাকে ধারণ করেই চলেছি।”

আমার নদীতে জোয়ার আসুক

ছলাৎ ছলাৎ নৌকা চালাও

মাঝি! বৈঠা চালাও জোরে

কৃষক! আমার জমি আবাদ করো

ফলাও ফসল, শস্য তোলে ঘরে।

(আমার নদী)

অথবা,

আমি তোমাদের এই কাঁচের শহরে থাকতে চাই না

---

আমি ফিরে যেতে চাই গাছগাছালি আর পশুপাখির কাছে,

সবুজ প্রকৃতির কাছে, বনাঞ্চল ঘেরা পদ্মার পাড়ে

পূর্ণিমার ধবল জ্যোৎস্নায় ভাসা আমার গ্রামে।

(আমি যেতে চাই)

কবি শাহীন সৈকত এর কবিতায় চরম সুন্দর (প্রেম/প্রকৃতি) আর পরম সুন্দরের (স্রষ্টা/অস্তিত্ব) মধ্যে এক মেলবন্ধনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। “জলের শব্দে তোমার গ্রাণ” কাব্যগ্রন্থে প্রেম শুধুমাত্র দু’জন মানুষের সম্পর্কের আখ্যান নয়, বরং তা প্রকৃতি ও স্রষ্টার সান্নিধ্যের এক আধ্যাত্নিক যাত্রাও বটে।

আর হৃদয় গলা কাঁদামাটিতে

যে নতুন আমি তৈরী হই, তার নাম ‘মায়া’

আর সে মায়ার সবটা জড়িয়ে থাকো তুমি।

(হৃদয় গলানো আলো)

অথবা,

তোমার ভালোবাসার কাদামাটিতে হে উর্বশী!

ফুল-ফসলে ভরে ওঠে তার প্রাঙ্গণ।

শুকরিয়া সেই মহান প্রভূর

দিলেন পাহাড় ও গিরি,

এতেই পুরুষ ধন্য হয়েছে

আর তৃপ্ত হয়েছে নারী।

(ভালবাসার কাদামাটি)

কবি একজন রাজনৈতিক সচেতন মানুষ। তাঁর কবিতায় দেশপ্রেম ও বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।

চাঁদের আলো জ্যোৎস্না বিলায়

বিলের জলে রোজ

এমন দেশের কথা তোমরা

কেউ কি রাখো খোঁজ!

(প্রিয় জন্মভূমি)

অথবা,

ফিলিস্তিনের শিশু আমি

গাজায় আমার বাড়ি,

---

যে জাতি প্রতি বছর

রোজায় করে পার,

(ফিলিস্তিনের শিশু)

কবি শাহীন সৈকত জুলাই বিপ্লবের একজন লড়াকু কলম সৈনিক।

তিনি লেখেন:

বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলী কর

বাংলা মায়ের দামাল ছেলে সব পেতেছে বুক

এ সব দেখে জালিমশাহী কাঁপছে যে ধুকধুক

(ছত্রিশে জুলাই’২৪)

কবির কবিতায় মধ্যবিত্ত পরিবারের সুখ-দু:খ হাসি-কান্না গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।

আমরা অভাবী মানুষ,

সব স্বপ্নই আমাদের পূরণ

হবার নয়, না হোক অন্তত

শাওনের মেঘহীন রাতের আকাশে

চাঁদ দেখা দোষের কিছু নয় নিশ্চয়!

(স্বপ্ন ভঙ্গের রাত)

একজন বিশ্বাসী কবি হিসাবে শাহীন সৈকত বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত, সর্বোত্তম আদর্শ আমাদের প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে ভুলে যান নি। তিনি নবীর শানে লেখেন:

তোমার কথা মনে হলে বদর সামনে আসে

তোমার কথা মনে হলেই ওহুদ চোখে ভাসে,

আল্লাহর তুমি পেয়ারা হাবীব নবী কামলীওয়ালা

মুমিন হৃদয় তোমার জন্যে ব্যাকুল ও উতালা।

(রাসূল সা. শানে)

কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ হিসাবে কবিতাশৈলীতে কিছু দুর্বলতা থাকা স্বাভাবিক।- লক্ষ্য করা গেছে, কিছু কবিতায় চিত্রকল্পের পুনরাবৃত্তি ও গতানুগতিক শব্দের ব্যবহার কাব্যিক নতুনত্বকে কিছুটা ম্লান করেছে। কবি যে রূপক বা উপমা ব্যবহার করেছেন তা অনেক ক্ষেত্রে খুবই সরল ও সরাসরি। সমসাময়িক কবিতায় যে ধরনের নতুন ও ধারালো উপমা আশা করা হয়, তা হয়ত সব জায়গায় পাওয়া যায় না।

তারপরও বলবো, সামগ্রিকভাবে “জলের শব্দে তোমার ঘ্রাণ” একটি প্রতিশ্রুতিশীল কাব্য গ্রন্থ। সমাজ ও রাজনীতির উত্থান-পতনের মাঝেও ব্যক্তিগত অস্তিত্বের যে শান্ত সুর, তা এই গ্রন্থের মূল সম্পদ। তাঁর এই কাব্যগ্রন্থ পাঠকদের আত্মোপলব্ধির পথে নতুন করে ভাবাবে। এমন প্রত্যাশা করা যায়।

বইটি প্রকাশ করেছেন টইটই প্রকাশন। প্রচ্ছদ এঁকেছেন, পিয়াস, ফুজি টাচ্, রাজবাড়ী। ঝকঝকে ছাপা, ভরাট মলাট সব মিলে কাব্যগ্রন্থটি আকর্ষণীয় হয়েছে। আমি গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করছি।