গাজী গিয়াস উদ্দিন
বরেণ্য কবি আল মাহমুদের মতো উদার সহনশীল দরদী মানুষ আমি কম দেখেছি। যদিও প্রখ্যাত সাংবাদিক সাহিত্যিক সানাউল্লাহ নূরীর সান্নিধ্যে আমার পরিপুষ্টি। কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, কবি আসাদ চৌধুরী, হেলাল হাফিজ ও কে জি মোস্তফা প্রমুখের সান্নিধ্যেও পুলকিত হয়েছি। আল মাহমুদকে আমি ‘ বাংলা কবিতার ভ্রমর’ আখ্যা দিয়ে প্রবন্ধ লিখেছি। বাংলা কবিতায় আল মাহমুদ জীবনানন্দ দাশের পরবর্তী সংস্করণ। আসল কথায় আসি।
কবি আল মাহমুদের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯১ সালে। তিনি তখনো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা পরিচালক। আমার উপন্যাস “ বনস্পতি “ ( আমার সম্পাদিত ‘বাঁশখালী বার্তা’য় প্রকাশিত) এর ভূমিকা কবি লিখবেন। তখন দৈনিক রূপালীতে আল মাহমুদের “ ঘৃণার পালঙ্কে “ কবিতা পড়ে “ আল মাহমুদকে “ নামে একটি কবিতা লিখে কবিকে দেখাই। কবি বল্লেন,- হ্যাঁ, তুমি এটা ছাপতে পারো। তখনো চট্টগ্রামে থাকি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অনার্স শেষে মাস্টার্স পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। চট্টগ্রাম থেকে “ বন্দর বার্তা “ নামে লিটল ম্যাগ করি। প্রখ্যাত সাংবাদিক নূর সাঈদ চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক দেশের কথায় সাব এডিটর। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য। দৈনিক নতুন বাংলাদেশে অনুবাদ বিভাগে কাজ করেছি আমি।
কবিবন্ধু ও সাংবাদিক পরবর্তীতে দৈনিক নয়া দিগন্তের উপ বার্তা সম্পাদক ছিলেন মরহুম হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী।
১৯৯৩ এর ১৮ মার্চ রমজান মাস। কবি আল মাহমুদ, কবি আবিদ আজাদ, কবি নাসরীন নঈম ও নাট্যশিল্পী দিলারা জামানকে আমন্ত্রণ জানিয়ে লক্ষ্মীপুর নিয়ে আসি। আমার একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “ হরিৎ পান্ডুলিপি “ প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করি নিজেই। নূর কম্প্রিন্ট নামে ফকিরাপুলে কম্পোজ এবং নয়াপল্টনে গুডলাক প্রিন্টার্স থেকে প্রকাশ করি। কবি আল মাহমুদ তখন দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান। কবি আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা লিখে দেবার কথা ছিল। কিন্তু আমার বাউণ্ডুলে স্বভাবের উদাসীনতায় কবির কাছে যাওয়া হয়নি। বইটি প্রকাশের পর সংগ্রামে গিয়ে আল মাহমুদকে প্রথম বইটি দিলাম। তিনি বইটি হাতে নিয়ে বল্লেন,” তোমার কবিতার বই বেরিয়েছে, তুমিতো কবি হয়েই গেছ।” মনে পড়ে ২০০৫ সালে আমার কাব্যগ্রন্থ “অকথিত” প্রকাশিত হলে হারুন এন্টারপ্রাইজে কবি ফজল শাহাবুদ্দীনকে প্রদান করি। তিনি বইটির নাম দেখেই বল্লেন, “ অকথিত না কি তথাকথিত? ”। আমি বিনয়ের সাথে বল্লাম পড়ে দেখুন। ২০০৪ সালে ফজল শাহাবুদ্দীন লক্ষ্মীপুরে কবি শাহীন রেজা, কামরুজ্জামান ও ফারুক আফিনদী-কে নিয়ে আমার অনুষ্ঠানে আসেন। জীবনানন্দ দাশের ধূসর পান্ডুলিপির অনুকরণে হরিৎ পান্ডুলিপি। কাব্যের শুরুতে এ কবির কবিতার উদ্ধৃতি সন্নিবেশ করেছি:
“ কেউ যাহা জানে নাই - কোন এক বাণী -
আমি বহে আনি;
একদিন শুনেছ যে - সুর -
ফুরায়েছে, পুরানো তা - কোন এক নতুন - কিছুর
আছে প্রয়োজন
তাই আমি আসিয়াছি, - আমার মতন
..............................................
কেন আমি গান গাই?
কেন এই ভাষা
বলি আমি!- এমন পিপাসা
বার- বার কেন জাগে! “
আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থে এ ঐতিহাসিক উল্লেখ স্পর্ধা নয়। খানিক সান্ত্বনা বা আত্মপ্রেরণা।
বইয়ের মুখবন্ধে লিখেছিলাম- “ আবেগে, আবেদনে আর প্রেরণা - রোমাঞ্চের বশে এমনকি স্বতস্ফুর্তায় আমি পদ্য হলেও লিখে চলেছি। তবে আমার মনে হয়, কবি হিসেবেই আমার জন্ম; কবিতা লেখার জন্যেই করুণাময় আমাকে পাঠিয়েছেন। “ কাব্যগ্রন্থটির উৎসর্গ পাতায় লিখি:
“ মফস্বলের তথা প্রত্যন্ত গ্রাম বাংলার অবহেলিত কবি প্রতিভাদের অপ্রকাশিতের গ্লানি ও যন্ত্রণার প্রতি আমার সমবেদনা। “ ২৩ পৃষ্ঠায় “ আল মাহমুদকে “ কবিতাটি ছাপা হয়। কবিতাটি তুলে দিচ্ছি :
আল মাহমুদকে
(কবির ঘৃণার পালঙ্কে কবিতার প্রেক্ষিতে)
এ কোন ভাগ্যলক্ষ্মী কবি
ঘৃণার পালঙ্কে সওয়ার
বোরাকে ধুলি খেলে মুক্ত সাহারার,
তবু নিতে গেলে নিজ গুণে ঘৃণার উপহার।
আল মাহমুদ যখন সৌর ভ্রমণে
তখনো ভাগ্যহতরা ভ্রমের আঁচলে,
ঈর্ষায় মাতম তোলে
তবু যায় ধ্বজার জিগির বিফলে।
হে কবি সাধক
আত্মবিশ্বাসী - বখতিয়ারের ঘোড়া,
আগাছার ক্ষেতে সোনার ফসলে
শিল্প দিগন্ত জোড়া।
গ্লানির পরশ পাথর হবে কালের ঐতিহ্যে
গৌরব গাথা।
২৮/৭/৯১
প্রথম বই প্রকাশের স্মৃতি রোমন্থনে আরো দুটো কথা পাড়বো। বইটির প্রকাশক যেহেতু নিজেই। স্ত্রীর বড় বোনের মেয়ে শারমিন তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। ঢাকায় ইসলামপুরে তাদের বাসায় গেলে হাতে পড়ে তার স্কুলের জন্যে আঁকা অসাধারণ একটি পোট্রের্ট। শারমিন বড় হয়ে টাঙ্গাইলের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী। এ চিত্রশিল্পটিই আমি আমার কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ করি। এ বইটির পান্ডুলিপি তৈরি হয়েছে। কিন্তু মুদ্রণ খরচ কোথায় পাবো?
আমার জেলা লক্ষ্মীপুরের একজন অবস্থাপন্ন রাজনীতিবিদ জামাল আহমেদ। উদারচেতা পরহিতাকাক্সক্ষী ব্যক্তিত্ব। তখন তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা জন্মে। বইটি প্রকাশে তাঁকে সহযোগিতার অনুরোধ জানালাম। বই প্রকাশের পুরো খরচটাই তিনি দিলেন। তাঁর প্রতি আমার চিরকৃতজ্ঞতা। নিজেই প্রুফ দেখে নিজেই মুদ্রণের সব কাজ সময় দিয়ে করে প্রকাশ করলাম আমার প্রথম বই “ হরিৎ পান্ডুলিপি “।
চতুর্থ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে প্রথম ছড়া লিখি।
১৯৭৮ সালে হাবীবুর রহমান সম্পাদিত সাপ্তাহিক জাহানে নও পত্রিকায় আমার প্রথম গদ্য লেখা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্কে নিয়ে প্রকাশিত হয়। ১৯৮১ সালে দৈনিক সংগ্রামের ছোটদের পাতা “ শাহীন শিবির” এ প্রথম গল্প ‘ বুবু,’ এবং ছড়া প্রকাশিত হয়। তখন আমি দৈনিক সংগ্রামের লক্ষ্মীপুর মহকুমা সংবাদদাতা।
আমার এ পর্যন্ত ১৫ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে ৭ টি কাব্য এবং দুটো প্রবন্ধগ্রন্থ। বই প্রকাশের সাধ্য সবসময় ছিল না কিন্তু সবসময় মনে হতো এ আমার শুধু বই নয়, আমার ভবিষ্যৎ প্রতিনিধি। আমার সন্তানের মতো। নিজের সৃষ্টি কখনো পাঠ করি। কখনো মনে হয় এ আমি কি লিখলাম? দৈন্য অসহায়ত্বে ভুগি। কখনো এমন মনে হয়, এ আমি লিখতে পারলাম।
আমার সৃষ্টি আমাকে এতোটাই বিস্মিত ও আনন্দিত করে। কবি মাশুক চৌধুরীর কথা মনে হয় অনেকে ভুলে গেছি। তিনি নাকি আমার কবিতার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন।
আল মাহমুদের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। তাঁর কথা দিয়ে শেষ করি। ১৯৯৩ সালে তিনি আমার আমন্ত্রণে লক্ষ্মীপুর আসলে আমার তখনকার ভাড়া বাসায়ও আসেন। আমার স্ত্রী তখন সন্তানসম্ভবা। আল মাহমুদ আমার স্ত্রীকে দেখেই বল্লেন, “ তুমি না কি মা এ পাগলের ঘর কর।” প্রসঙ্গত আমার মায়ের কথাও মনে পড়লো। কৈশোরে আমি প্রায়ই বাড়ি থেকে শহরে বন্দরে পালিয়ে যেতাম। আমার মা মৌলভি মাহমুদউল্লাহ খোনকারকে ধরালেন। খোনকার সাহেব বলেছিলেন জ্বিনের তাছিরে আমি এসব ছোটাছুটি করি। তিনি আমার জন্যে তাবিজও দিয়েছিলেন। আমার এখনো মনে হয় জ্বিনের তাছিরেই আছি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়:
“.......... অলৌকিক আনন্দের ভার
বিধাতা যাহারে দেয়, তা’র বক্ষে বেদনা অপার,
তা’র নিত্য জাগরণ; অগ্নিসম দেবতার দান
উর্ধ্বশিখা জ্বালি’ চিত্তে অহোরাত্র দগ্ধ করে প্রাণ।”