জাফর তালুকদার

গ্রন্থবিশেষজ্ঞ আইভ্যান ক্যাটস সম্ভবত বইটি উপহার দিয়েছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কবি সৈয়দ আলী আহসান-কে। একদিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘দ্যাখো তো, এটা অনুবাদ করতে পারো কিনা?’ ইন্দোনেশিয়ার গল্পগ্রন্থটি হাতে নিয়ে অবাক হই। একেবারে সাদামাটা। মুদ্রণ, প্রচ্ছদ, কোথাও আভিজাত্যের ছোঁয়া নেই । সাকল্যে ৫টি গল্প । লেখকের নাম অপরিচিত । কিন্তু গল্পগুলো পড়তে গিয়ে চোখ আটকে যায়। কাহিনী, ঘটনার পটভূমি, সামাজিক কর্মকাণ্ড, মানুষের সুখ-দুঃখের পাঁচালি—সবই মনে হল আমাদের চারপাশের পরিচিত সমাজের প্রতিচ্ছবি । অনুবাদ শেষ হল । এর আগে এখানে ইন্দোনেশিয়ার কোনো গ্রন্থ অনুবাদ হয়েছে কিনা আমার জানা নেই । সে-কারণে সম্ভবত কিছুটা রোমাঞ্চিত ছিলাম। কিন্তু প্রকাশক? কী মনে করে যোগাযোগ করলাম ইন্দোনেশীয় দূতাবাসের সঙ্গে। তাঁরা খুব আগ্রহ দেখালেন। আমি নিশ্চিন্ত হলাম । কিন্তু বাড়া-ভাতে ছাই দেয়ার জন্যে নির্বাসিত বিপ্লবী লেখক প্রমেয়েদয় অনন্ত তোয়ের বসে আছেন কে জানত! বিশ্বসেরা এই লেখকটি যে ইন্দোনেশীয় সরকারের চক্ষুশূল সে-কথা জানা ছিল না মোটেই। লেখক পরিচিতিতেও তাঁর অস্পৃস্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। ফলে যা হবার তাই হল । দূতাবাস থেকে বিনয়ের সঙ্গে অর্থাভাবের অজুহাতে পাণ্ডুলিপিটি ফিরিয়ে দেয়া হল । প্রথম প্রেম প্রত্যাখ্যানের মতো কষ্ট বিধল মনে । শুকনো মুখে একদিন দুপুরে হাজির হলাম মুক্তধারার শ্রীচিত্তরঞ্জন সাহার দরবারে। তিনি বরাবর কেন জানি আমাকে একটু প্রশ্রয়ের চোখে দেখতেন । তখন মুক্তধারার রমরমা দিন। ডাকসাইটে সব লেখক এই সংস্থার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। লেখকরা কাতর-চোখে তাকিয়ে থাকতেন কখন মুক্তধারা থেকে বই বের হবে তাদের। জাতে- ওঠার স্বপ্নে নয়, স্রেফ বইটা বের হোক এই অভিপ্রায়ে দ্বারস্থ হয়েছিলাম চিত্তবাবুর । তিনি আমাকে খাতির করে সন্দেশ আর চা খাওয়ালেন। ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠি। প্রত্যাখ্যানের লজ্জা সামাল দেবার জন্য এই আপ্যায়ন-চিকিৎসা নয়তো!

যখন ওঠার সময় হল, তিনি লোক ডেকে একটা চুক্তিনামায় সই করতে বললেন আমাকে । অর্থাৎ পাণ্ডুলিপি মঞ্জুর। শুধু তাই নয়, দক্ষিণা হিসাবে একখানা খাম এগিয়ে দিলেন সামনে ।

আমার প্রথম বই ‘ইন্দোনেশিয়ার গল্প’ প্রকাশের অভিজ্ঞতা এমনই নিরাভরণ আর আকস্মিক। বইটির পাঠক-প্রিয়তা কেমন ছিল জানি না কিন্তু বইটির প্রথম সংস্করণ ধূলোয় গড়াগড়ি খায়নি প্রকাশকের গুদামে। অনেক বড় লেখক দয়া করে বইটি সম্পর্কে দু’চার বাক্য লিখেছেন পত্র-পত্রিকায়। এটা তাদের বদান্যতা। আমার প্রিয় অনুবাদক বরেণ্য শিক্ষাবিদ শ্রদ্ধেয় কবীর চৌধুরীর বক্তব্যটি সেই প্রয়াসেরই অংশ ।