ও নীরব কবি, ওহে অন্ধ লিপিকার
মুজতাহিদ ফারুকী
দিগন্ত রেখায় আঁকা ধূপছায়া গ্রাম
হাতির পিঠের পারা অবিকল তসবির দানা
মাঝে মাঝে তালগাছ বালিকার শ্যামল কপালে
আলটপকা বিচূর্ণ কুন্তল; পেছনে পাখির নীড়
এইসব বনলতা নীল
চিরন্তন আলোকচিত্রণ, হয় না পুরনো, তবু
বড়ো অবসন্ন বুড়ো প্রাচীন পৃথিবী
পলকে দেখার লোভে থিতানো অতীত চোরাবালি ফাঁস
নৈঃশব্দ্যে ডুবে থাকা আজন্মের স্মৃতি বিস্মৃতি চোখ মুদে
নিতে চায় নির্জনতা ক্ষণিক বিরাম।
ও কবি, ওহে অন্ধ লিপিকার, কোনখানে থাকো
কোন মেঘচূড়া থেকে করেছো নজর?
দূরবীনে ফউতি আঁধার, ঝিঁঝিঁ ডাকা সন্ধ্যা ক্রমে
কাজল চোখের ভাঁজ খোলে
তিমিত প্রদীপ শিখা কাঁপে ত্রস্ত রগুড়ে বাতাসে
ভূ-দৃশ্যে নিথর নদী, বিষণ্ন, অনীহ, ম্রিয়মাণ।
চিত্রপটে বর্ণবিভা, বেশুমার সূর্যাস্তের মায়া, বিমূঢ় সবুজ চারপাশে
অজ্ঞানের আগ্রাসনে নীহার নিকানো ভোর
জীর্ণ ইমারতে পরাহত
কাহিনীকল্পে হায়, একটাও শুচিস্নিগ্ধ সূর্যোদয় নাই।
বৃষ্টি আসবে
রানা হোসেন
রোদের জালে আটকানো মেঘ
দূরের আকাশ নীল বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে
যেন বৃষ্টি আজ ঝরতে চায়, অঝোর ধারায়
-আকাশের বুকে জমাট বাঁধা মেঘ
বৃষ্টি কখনো পৃথিবীতে ঝরে পড়তে চায়
নিশ্চিন্তে দিনে-রাতে যে কোন সময়।
বৃষ্টি আসবে আমি জানি, বৃষ্টি আসবে
কারো মন প্রফুল্ল করতে নয়
হাসি দেখতে নয়
একান্ত মৃত্তিকার টানে, বৃষ্টি আসবেই।
পৃথিবী আর প্রকৃতির উপর
কোনো বজ্রপাত নেই!
সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা কিংবা ভোর রাতে
সারা আকাশে আলোর ঝলকানি নেই।
হঠাৎ কবে কখন, বৃষ্টি আসবে কেউ জানে না
কবে কখন এক পলক মেঘ জমবে, বৃষ্টি ঝরবে
নদী ভরে যাবে কূলে কূলে
নীরবে নিভৃতে, একদিন, এক সময় বৃষ্টি আসবে।
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট
তুহীন বিশ্বাস
পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়ে লাল নীল কষ্ট
পাদদেশে জন্মানো ছোট ছোট গুল্মলতা -
ঢেকে গেছে অপরিকল্পিত দুঃখের আবরণে,
অবুঝ কীটপতঙ্গ উড়ে উড়ে পড়ে মৃত্যুফাঁদে।
কাব্যকলায় বর্ণিত জীবনের গল্পটাও অদ্ভুত
প্রেম আর মায়ায় অপ্রাপ্তির বেদনাও আছে,
মন পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে নির্মল বাতাসে
ভুল নেই কোথাও তবু সূর্যটা দুর্ভাগ্যের গ্রাসে।
নির্ঘুম রাতেরা বড্ড নির্মম নিষ্ঠুরতার শিকার
যেখানে নির্বিকার স্বপ্নগুলো সুইসাইড করে,
পোস্টমর্টেম রিপোর্টে লেখা আছে, অবহেলা ;
আর আমিও নতুন স্বপ্ন বুনি কবিতার ছন্দে।
খুঁজে পাইনি
মোহাম্মদ ইসমাইল
আমার আমাকে খুঁজে পাইনি কোনোদিন।
তবু হিসাবের কড়চা নিয়ে নিজেকে খুঁজছি প্রতিদিন!
নিজের চতুর্পাশে কত যে সংখ্যার জোড়াতালি
তবু সবার মধ্যে নিজেকে মেলাতে গেলে- লাগে শুধু খালিখালি;
জন্মাবধি এখনো তাই নিজের নামতা খাতায়
এক হালি শূন্য দিয়ে ঝুড়ির হিসাব মিলাই!
কিও আম্মা
জুবায়ের বারী
কিও আম্মা তোমার মাঝে এমন কি আছে?
যা এই পৃথিবীর বিশালতায় খুঁজে পাই না।
আজ পর্যন্ত তোমার হাতের ভাত খাওনের পর,
যখন আমি ভাত খাইছি,
তখন তৃপ্তি পাই নাই,
কেন জানি অতৃপ্তি নিয়ে ভাত খাওয়া শেষ করছি ক্ষুধার যন্ত্রণায়।
কিন্তু তৃপ্তি পাই নাই।
তৃপ্তি পাইছি তোমার হাত থাইকা দুই লোকমা ভাতের মধ্যে।
যার হাতের মাখানো ভাত খাইতে এখনো ভাল্লাগে।
কাঁচা মরিচ, সরিষার তেল,
আর পিঁয়াজ দিয়ে কচলানো ভাত এখনো খাইতে ইচ্ছে করে।
ইচ্ছে করে তোমার বকাঝকা শুনতে।
শুনতে ইচ্ছে করে সেহরির সেই ডাকাডাকি আওয়াজ।
তাড়াতাড়ি উঠ আযান দিয়া লাইতাছে।
আর মাত্র দশÑপন্ড মিনিট রইছে।
ছেরাডা একদিন সময় মতো উডে না।
খালি দেরি হরবো।
আম্মা আম্মা ওগো আম্মা
আমার মাঝেই তো তোমার বসবাস হওয়ার কথা।
এই হৃদয়ে,
এই শরীরে,
এই সর্বাঙ্গে,
তুমি চিন্তিত হইও না।
হে খোদা,
তোমার কাছে একটাই ফরিয়াদ।
প্রতিডা সেজদায় তোমার নামের সাথে
তাঁর নাম যেন থাকে।
সুবর্ণ প্রহর
শারমিন নাহার ঝর্ণা
উত্তপ্ত দুপুরের ঝকঝকে সোনালী রোদ ছুঁয়েছে
ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া হৃদয় ভিটে,
অনুভূতির চারা আহত হয়ে কাতরায় নিঃশব্দে
নিরানন্দ হৃদয় ভিটে জুড়ে শুধুই জঞ্জাল,
চারদিকে অথৈ শূন্যতার বিস্তার
এক পেয়ালা রোদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে,
অকস্মাৎ সুবর্ণ প্রহরের মুখোমুখি।
কারো উদ্ভুত মায়ার দৃষ্টিতে উড়ে যায়
রাশি রাশি পুষে রাখা শূন্যতা।