মুনীরা ফেরদৌসী
আজ কুসুমের গায়ে হলুদ। পুরো বাড়ি নতুন সাজে সেজেছে। বাড়ির উঠানে গ্রামের মহিলারা জড়ো হয়েছে। সামনে রাখা হয়েছে একটি পিঁড়ি, রঙিন কুলায় এক বাটি কাঁচা হলুদ বাটা, সরিষার তেল, ঘাস-দুর্বা, কয়েকটা ধান এবং আমপাতা দিয়ে ঢাকা এক কলস পানি। হলুদ শাড়িতে জড়ানো কুসুমকে পাঁজাকোলে করে উঠানে এনে পিঁড়িতে দাঁড় করালো। মুখটি লজ্জায় নেমে এসেছে বড় ঘোমটার ভেতর। একে একে সবাই এসে হাত, পা, গালে, কপালে হলুদ ছুঁয়ে দোয়া দিল। কুসুমের মা কাঁকন বিবি নিজ শাড়ির আঁচল ধরলেন মেয়ের মাথায়। তাতে ধান-দুর্বা আর সরিষার তেল পুরে দিলেন কুসুমের মেঝো চাচি। আঁচল থেকে সরিষার তেল চুইয়ে চুইয়ে পড়ে কন্যার কপালে, নাকে-মুখে। রাঙা মুখখানা আরো উজ্জ্বল হয়ে গেলো। কাঁকন বিবি মেয়েকে চুমু খেয়ে ডানে-বায়ে থুথু ফেললেন যাতে হলুদে নজর না লাগে। হঠাৎই পদ¥া পাড়ের উত্তাল হাওয়া এসে কুসুমের বড় ঘোমটা খানি ফেলে দিলো। ‘অমন দমকা বাতাস আইলো ক্যান গো! মাইয়ার ঘোমটাটা মাথায় আবার তুইলা দাও গো কুসুমের মা।’ দাওয়া থেকে পানভর্তি মুখে গমগম করে বলল কুসুমের দাদী। কাঁকন বিবি ব্যতিব্যস্ত হয়ে ঘোমটা তুলে দিয়ে আমপাতায় পানি ছিঁটিয়ে হলুদ দিয়ে কঁচলে মেয়ের গোসল দিলেন। কুসুমদের বাড়ি পদ্মার পাড়ে। পদ্মা প্রতি বছরই বর্ষায় আর শীতের শেষে নিজের রাক্ষসী রূপ দেখায়। নৌকা ডুবে, মানুষ মরে, পাড় ভাঙে, ঘর ভাঙে, আর ভাঙে স্বপ্ন। ভেঙে ভেঙে সে আজ কুসুমদের দোরগোড়ায়।
ছোটবেলায় কুসুম এতো বড় পদ্মা নদী কখনোই দেখেনি। কতো শত বায়না ধরতো বাবার কাছে পদ্মায় যাওয়ার জন্য! কুসুমের বাবা জমির শেখ পদ¥ার স্রোতে ইলিশ ধরেন। চকচকে সে ইলিশ। বাজারে একবার উঠাতে পারলেই চড়া দাম। মাঝরাতে পদ্মায় যখন কাঁপুনি উঠে তখন সেই পাহাড়সমান ঢেউয়ে তার ছোট্ট কুসুমকে যদি তিনি হারিয়ে ফেলেন সেই ভয়ে মেয়েকে তিনি তার মাছ ধরার নৌকায় কখনোই তুলেন নি। কুসুম কতো করে বলতো-
‘বাবা গো, ও বাবা এইবার বর্ষায় আমি কিন্তু তোমার লগে পদ্মার ওইপাড় যামু। ঢেউয়ের লগে মিলাইয়া নাচমু। আমারে কিন্তু লইয়া যাইতে হইবো। ফাঁকি দেওন যাইবো না। আমি কিন্তু রাইতে জাইগগা থাকমু। না নিলে সারাদিন ভাতই খামু না কইলাম!’
রাত জেগে জেগে কুসুম ঘুমিয়ে পড়তো। সারাদিন ভাতও খেতো না। কিন্তু তাতে কি আর এই ছোট্ট টুকটুকে মেয়েকে ঐ রাক্ষুসী পদ¥ায় নিয়ে যাওয়া যায়! আজ কুসুমের বিয়ে। লাল বেনারসিতে অপরুপ সাজে সেজেছে। এক হাতে লাল চুড়ি, অন্য হাতে সোনার বালা, গলায় চেইন, কানে ঝুমকা, নাকে নথ, পায়ে নূপূর, সিঁথিতে টিকলি। সব কুসুমের পছন্দের। ‘কিরে কই, সাজগোজ শ্যাষ হইল?” তাড়া দিতে দিতে ঘরে এলেন জমির শেখ। পাড়ার মেয়েরা ঘিরে আছে কুসুমকে। তিনি তাদের সরিয়ে মেয়ের মুখটি দেখলেন।
‘ওরে আল্লাহ্! কিইই সুন্দর লাগতাছে আমার মাইয়ারে। আর সাজন লাগবো না। জামাই অহনই আইয়া পড়বো। সবাই রেডি থাকো।’
ঘর থেকে বেড়িয়ে উঠানে পা রাখলেন জমির শেখ। হাজারো ভাবনা এসে জড়ো হলো মগজে। তার সেই ছোট্ট কুসুম আজ কত্ত বড় হয়ে গেছে। বউয়ের সাজে না দেখলে তিনি জানতেই পারতেন না। আজ তার বাড়িভর্তি মেহমান। সবাই মিলে তার মাকে আজ পর করে দেবে। তার ছোট্ট মা আর এ বাড়ি আসবে না। কিভাবে আসবে! সে তো যাবে পদ্মার ঐপাড়। অতো বড় নদী ছোট্ট কুসুম কিভাবে পাড়ি দিয়ে আসবে! আসবে না। তার কুসুম আর আসবে নাহ!
ওসমান মিয়া চলে এসেছেন ছেলে আর আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বিয়ে বাড়ির রঙিন গেইটে। তার মাছের আড়তে মাছ দিতো জমির শেখ। পদ্মার এপাড় ওপাড় ব্যবসা করতে করতে একদিন জমির শেখের বাড়িতে আসেন। কুসুমকে দেখেন তিনি। মনস্থির করে ফেলেন। এই মেয়েই তার সজলের সাথে মানায়। বাবার পছন্দে না করেনি সজল। কথা পাকাপাকির দিনে কুসুমকে এক পলক দেখেছিলো সে। কুসুম শুধু একবার চোখ তুলে তাকিয়েছিলো। সে চাহনিতে কী অসহনীয় মায়া ছিলো সজল জানে না। কুসুমের ভাবিকে অনেক অনুরোধ করে আলাদা কথা বলার অনুমতি পাওয়া গেলো। কিছুক্ষণ নিরব থেকে জড়তার সকল খোলস ভেঙে সজল বলে- ‘বিয়াতে তুমি কেমন সাজবা? মানে তোমার কি কি পছন্দ যদি কইতা তাইলে তোমার মনমতো সব কিনত্্্ পোরতাম আরকি!’ আন্ত মুখে ভয়মিশ্রিত কণ্ঠে কুসুম বলে ‘আমারে খালি একটা লাল বেনারসি দিয়েন। আমার আর কিছু লাগবো না।’ ‘আর কিছুই লাগবো না? খালি বেনারসি?’ অবাক হয় সজল। ‘না, আর কিছু নাহ। লাল বেনারসি পইরা বর্ষায় পদ্মার ওপাড় যাইমু।’ ‘আইচ্ছা। কিন্তু অহন তো বর্ষা না, অহন তো শীত।” কুসুম আর কিছু বলে না। ধীর পায়ে উঠে নিজের ঘরে চলে যায়। সজল ফিরে এসে ওসমান মিয়ার কানে কানে কি যেনো বলে।
১৩৮৮ বঙ্গাব্দ, আষাঢ় মাসের ২০ তারিখ বিয়ের দিন ঠিক হয়। কুসুমের মন নেচে উঠে। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি চমকায়। সে হাসি সজল মিয়া দেখে কিনা কেউ জানে না। বিয়ে সম্পন্ন হয়। সজল মিয়ার হাতে কুসুমের হাতটি পড়লো। ‘এইবার আমাগো বিদায় দেন গো চাচি আম্মা। নাতনী আর নাতজামাইরে মন ভইরা দোয়া কইরা দেন।’ ওসমান মিয়া বিদায় নেন কুসুমের দাদীর কাছ থেকে। জমির শেখ অশ্রুসিক্ত চোখে বাড়ির এককোণে দাঁড়িয়ে ছিলো। বাবার মন এক নিরব রক্তক্ষরণে জর্জরিত। ‘জমির শেখ, কালকেই আইসো তোমরা। আমি বড় কইরা বৌভাত করুম। অহন বিদায় দেও। আসমানে মেঘ করে যে।’ ওসমান মিয়ার কপালে চিন্তার রেখা ভেসে ওঠে।
লাল বেনারসিতে সেজে সজলের হাত ধরে কুসুম পদ্মার পাড়ে এসে দাঁড়ায়। ফুল দিয়ে আপাদমস্তক সাজানো বড় বড় পাঁচটি সাম্পান নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। বাতাসের ঝাপটায় কুসুমের ঘোমটা খুলে গেলো। খোঁপার চুলগুলো যেনো উড়তে চায়। কান্না ভুলে নদীর দিকে তাকায়। কালোমেঘের কালো দেহ নদীতে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সূর্য ডুবতে থাকে পদ্মায় ঢেউয়ের ভেতর। কুসুম নৌকায় পা রাখলো। কালচে লাল জলে লাল বেনারসির ছায়া পড়লো। ‘আকাশটা ঘুটঘুইট্টা আন্ধার। কিচ্ছু দেখা যাইতেছে না। কতো কইরা কইলাম ট্রলার ভাড়া করি। না, তাগো নৌকাই লাগবো। অহন এই আন্ধার রাইতে এতোদূর কেমনে যাইমু! ও মাঝি কতোদূর?” তাড়া দেয় ওসমান মিয়া। ‘চাচা, অবস্থা ভালো মনে হইতেছে না। তুফান আইতে পারে।’ এক মাঝি হাঁক দিয়ে বললো। ‘কও কি হ্যাঁ! ডর দেখাইয়ো না তো বাপু। কত্তো মাছ ধরছি এমন তুফানে। তাড়াতাড়ি বৈঠা বাও।’ এই নৌকায় ওসমান মিয়া আর কিছু বরযাত্রী। একদম সামনের নৌকায় বর-বউ ও বউয়ের দুই একজন আত্মীয় স্বজন। অন্য নৌকাগুলোতে বরযাত্রীরা। ‘এই কুসুম, তোমার কি ডর করতাছে?’ কুসুমের হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো সজল। কুসুম মাথা নাড়ায়। ‘আসমানে কি অনেক মেঘ? একটু পর পর বাতাস ছাড়তাছে!’ ‘হ, অনেক মেঘ। তয় ডরাইয়ো না। আমি আছি তো। এই লাল বেনারসিডায় তোমারে যে কী সুন্দর লাগতাছে কুসুম!’ ভীষণ লাজে কুসুম ঘোমটাখানি একহাত টেনে দেয়। ঠিক এই সময় মেঘের বোমা ফেলা চিৎকার শোনা যায়। ভরা নদী কেঁপে উঠে। দৈত্যের মতো কালো ঢেউ আছড়ে পড়ে নৌকার পাটাতনে। কুসুম ঢেউ ছুঁয়ে দেখে। আকাশে বিদ্যুতের কারুকাজ। কুসুম দু’চোখ ভরে দেখে। তৃষ্ণার্ত হৃদয় যেনো পানির স্পর্শ পেলো। ঢেউয়ের তালে নেচে উঠে দেহ-মন। ঠোঁটে কাঁপন লাগে। আচমকা নদীর বুকে বাঁজ পড়ে। সজলের বুকে মুখ লুকায় কুসুম। পাহাড় সমান ঢেউয়ে তলিয়ে যায় দুনিয়া।
দিন তিনেক পর মুন্সিগঞ্জের চরে ভেসে আসে কিছু মানুষ। ভিড় করে আছে আরও কিছু মানুষ, জ্যান্ত মানুষ। জমির শেখের পরিবারের একাংশ দেখা যায়। জমির শেখ মাটিতে বসে আছেন। দু’চোখে নিস্তব্ধতা। হাতে একটা ছেঁড়া শাড়ির আঁচল। একটা শাড়ি, একটা লাল বেনারসি।