॥ আসিফ আরসালান ॥

আজ আমার লেখার বিষয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি সঠিক সিদ্ধান্ত। এটি এতো সঠিক এবং সময়োপযোগী যে সেটি আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য স্বৈরাচার বিরোধী একটি সঠিক সিদ্ধান্ত হিসাবে পরিগণিত হবে। তার আগে খুব সংক্ষেপে প্রেসিডেন্ট শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর লন্ডন সফর নিয়ে দুটি কথা।

গত ৯ মে শনিবার প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন লন্ডন গেছেন। বলা হয়েছে যে, চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন গেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বলা হয় যে, তিনি ফলোআপের জন্য লন্ডন গেছেন। এর আগে শেখ হাসিনার আমলে হৃদপিণ্ডে বাইপাস সার্জারির জন্য তিনি সিঙ্গাপুর যান। সেখানে সফলভাবে তার বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হয়। তারপর দু’বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। এখন ফলোআপের জন্য লন্ডন যাওয়ার প্রয়োজন ছিলো বলে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় হার্ট স্পেশালিস্টরা মনে করেন না। বিবিসির একটি খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশে এখন বাইপাস সার্জারি বা ওপেন হার্ট সার্জারির সাকসেস রেট ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশ। বিবিসির বাংলা খবরে বলা হয় যে, ইংল্যান্ডেও বাইপাস সার্জারির সাকসেস রেট ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশ।

মালয়েশিয়ার ড. মাহাথীর মোহাম্মদ যখন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করেছিলেন তখন তার হৃদপিণ্ডে সমস্যা দেখা দেয়। তখন মালয়েশিয়াতে বাইপাস সার্জারির ব্যবস্থা ছিলো না। ডাক্তাররা তাকে বিদেশ যাওয়ার সুপারিশ করলে তিনি বলেন যে, প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি যদি বিদেশে চিকিৎসা করান তাহলে দেশের সাধারণ মানুষ কি করবে? তিনি নির্দেশ দেন, যতদ্রুত সম্ভব তার দেশে একটি হৃদরোগ হাসপাতাল অথবা সাধারণ হাসপাতালের একটি ইউনিট খোলা হোক এবং অতি দ্রুত বিদেশ থেকে বাইপাস সার্জারিসহ হৃদরোগের চিকিৎসার টেনিংয়ের জন্য কয়েকজন চিকিৎসককে বিদেশে পাঠানো হোক। তদনুযায়ী কয়েকজন ডাক্তারকে বিদেশে পাঠানো হয়। ঐ দিকে হৃদরোগ সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি এবং বাইপাস সার্জারির যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ঐসব ডাক্তার প্রয়োজনীয় টেনিং শেষ করে দেশে ফিরে আসেন। অতঃপর তারাই ড. মাহাথীর মোহাম্মদের সফল অপারেশন করেন।

জামায়াতে ইসলামীর আমীর ড. শফিকুর রহমান গত বছর ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি করেছেন। তিনি অপারেশন টেবিলে বলেন, বাংলাদেশেই তিনি অপারেশন করছেন এজন্য যে, হায়াত মউতের মালিক আল্লাহ। এছাড়া বাংলাদেশ এখন হৃদরোগ চিকিৎসায় বিশ্বমানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এছাড়া যে সার্জন তার অপারেশন করবেন সে ড. জাহাঙ্গীরের ওপর তার অগাধ আস্থা রয়েছে। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী, আমীরে জামায়াতের অপারেশন সফল হয়েছে এবং এখন তো তিনি নিয়মিত এখানে ওখানে বক্তৃতা করছেন এবং সাংগঠনিক কাজে সারা দেশে সফর করছেন।

প্রেসিডেন্ট চুপ্পুর লন্ডন সফর নিয়ে এতকথা এজন্য লিখলাম যে, প্রেসিডেন্ট চুপ্পু তো বাইপাস সার্জারির জন্য লন্ডন যাননি। সেখানে তিনি সিঙ্গাপুরের অপারেশনের ফলোআপ করতে গেছেন। ফলোআপ করতে গিয়ে তার হার্টে একটি স্টেন্টিং লাগানো হয়েছে বা রিং পরানো হয়েছে। আমাদের পরিবারের কথা বলি। আমার আপন দুই ভাইয়ের হার্টে ৩টি করে রিং পরানো হয়েছে এবং সেটা বাংলাদেশেই হয়েছে। এটির জন্য প্রেসিডেন্টকে লন্ডন যেতে হলো? তাও আবার একা নয়। সঙ্গে যদি শুধুমাত্র তার বেগম সাহেবা থাকতেন তাহলেও কোনো কথা ছিলো না। কিন্তু বেগম সাহেবাসহ তিনি সরকারি খরচে লন্ডনে গেছেন ২২ জনের এক বিরাট লট বহর নিয়ে। ঐ লট বহরে তার দুই নাতিও রয়েছে।

তারেক রহমানের সরকার অর্থনীতির বেহাল দশা দেখে কৃচ্ছ্র সাধনের জন্য দেশবাসীকে একাধিকবার নসিহত করেছেন। আর সাহাবুদ্দিনের বেলায়? বিবিসির সাবেক সংবাদদাতা এবং ড. ইউনূসের আমলে লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়োগপ্রাপ্ত (বর্তমানে সম্ভবত অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আকবর হোসেন এ সম্পর্কে একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টিং করেছেন। তার রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, একেকজনের বিমান ভাড়া গড়ে (যাতায়াত) যদি ২ লাখ টাকা হয় তাহলে ২২ জনের বিমান ভাড়া লেগেছে ৪৪ লাখ টাকা। তিনিসহ তার সফর সঙ্গীদের একাংশ যে হোটেলে থাকবেন তার নাম ‘হিল্টন অন পার্ক লেন’। সেখানে সর্বনিম্ন রুম ভাড়া দৈনিক ৩০০ পাউন্ডের কম নয়। এছাড়া তার সফর সঙ্গীদের একটি অংশ থাকবেন যে হোটেলে তার নাম, ‘বেড ফোর্ড লজ’। সেখানে যদি ৩ দিন থাকতে হয় তাহলে জনপ্রতি লাগবে ২২০ পাউন্ড। আকবর হোসেন হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, লন্ডনে তাদের ৯ দিনের এ সফরে কম করে হলেও ২ কোটি টাকা খরচ হবে। আকবর হোসেনের হিসাব মতে, এই ২ কোটি টাকা হলো মিনিমাম বা ন্যূনতম খরচ। ২ কোটি না হয়ে ২ কোটির অনেক বেশি হওয়ারই সম্ভাবনা প্রবল। কারণ হিল্টন অন পার্ক লেনে তিনি থাকলেও চিকিৎসা নেবেন কেমব্রিজে। আর সেটি বিনা পয়সায় নয়। তাকে পেমেন্ট করতে হবে। আর যে খরচটি হচ্ছে সেটি কিন্তু টাকায় নয়, পাউন্ডে পরিশোধ করতে হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে যে, এ যে বিদেশে আমাদের রেমিটেন্স যোদ্ধারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বিদেশী মুদ্রা অর্জন করছেন সেগুলি কি এ রকম চিকিৎসা বিলাসে খরচের জন্য ব্যবহৃত হবে? এ ব্যাপারে সরকারের একটি বক্তব্য থাকা প্রয়োজন। সে বক্তব্য দেওয়ার সময় মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথীর মোহাম্মদ এবং আমীরে জামায়াত ড. শফিকুর রহমানের উদাহরণও বিবেচনায় আনতে হবে।

এখন যাচ্ছি মূল আলোচনায়। জাতীয় সংসদের সদ্য সমাপ্ত অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের জন্য আইনমন্ত্রী ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এ ১৭ সদস্যের মধ্যে ১২ জন হবেন সরকারদলীয় সদস্য এবং অবশিষ্ট ৫ জন হবেন বিরোধী দল থেকে। আইনমন্ত্রী বিরোধী দলের ৫ জন সদস্যের নাম দাখিলের জন্য বিরোধী দলের নেতার প্রতি আহ্বান জানান। গত ২৯ এপ্রিল উত্থাপিত এ প্রস্তাবের ব্যাপারে আমীরে জামায়াত বলেন যে, তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কোনো নাম দিতে পারছেন না। বিষয়টি নিয়ে তাকে ভাবতে হবে এবং শরীক দলগুলোর সাথে আলোচনা করতে হবে।

গত ১৪ মে বৃহস্পতিবার ইংরেজি ডেইলি স্টারের প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান সংবাদে বলা হয়েছে যে, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি সরকারের প্রস্তাবিত কমিটিতে কোনো সদস্য বা নাম পাঠাবে না। কারণ তারা এ ধরনের কমিটি গঠনকেই মৌলিকভাবে বিরোধিতা করেন। যারা জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট ধারণ করেন তারা মনে করেন যে, জামায়াত এবং এনসিপির এই সিদ্ধান্ত সঠিক। কারণ এই সংবিধান সংস্কারের জন্যই ৯টি মাস ঐকমত্য কমিশন ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সাথে ম্যারাথন বৈঠক করেছে। সেই বৈঠক শেষে ৮৪টি প্রস্তাব সম্বলিত জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এর পর প্রশ্ন ওঠে, জুলাই সনদ তো স্বাক্ষরিত হলো। কিন্তু এটি বাস্তবায়িত হবে কিভাবে? অন্যকথায় এ সনদ সাংবিধানিক ভিত্তি পাবে কিভাবে? অর্থাৎ এ সনদ সংবিধানের অংশ কিভাবে হবে? এ পয়েন্ট নিয়ে ড. ইউনূসের তরফ থেকে ঐকমত্য কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ড. আলী রীয়াজ আবার রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করেন। একই সাথে তিনি অন্তত ৫ জন সংবিধান বিশেষজ্ঞের সাথে অন্তত ৫ দফা বৈঠক করেন। এসব আলোচনা এবং বৈঠকের ফলশ্রুতিতে সংবিধান সংস্কার (বাস্তবায়ন আদেশ) ২০২৫ নামের একটি প্রেসিডেনসিয়াল অর্ডার জারি হয়। ঐ প্রেসিডেনসিয়াল অর্ডার একটি অধ্যাদেশ আকারে জারি হয়। প্রেসিডেন্টের এই অধ্যাদেশ তথা অর্ডারে বলা হয় যে, ১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন হবে সেখানে ২টি ব্যালট পেপার থাকবে। একটি হবে সংসদ সদস্য নির্বাচনের ব্যালট পেপার। আর একটি হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচনের ব্যালট পেপার। যারাই সংসদের সদস্য হবেন তারাই আবার সংস্কার পরিষদেরও সদস্য হবেন। তবে ২টি সংস্থার (সংসদ এবং সংস্কার পরিষদ) সদস্য হওয়ার জন্য বিজয়ীদেরকে ২টি শপথ নিতে হবে।

এ প্রেসিডেনসিয়াল অর্ডারে সম্মতি দেয় বিএনপি। সেই মোতাবেক নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটটি হয় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের ওপর।

জুলাই সনদে রয়েছে ৮৪টি প্রস্তাবনা। এর মধ্যে বিএনপি ২৩টি প্রস্তাবনায় নোট অব ডিসেন্ট দেয় বা আপত্তি জানায়। পক্ষান্তরে গণভোটে ৪৭টি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। এই ৪৭টি প্রস্তাবনায় কোনো নোট অব ডিসেন্ট ছিলো না। প্রেসিডেনসিয়াল অর্ডারেই নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই যে ৪৭টি প্রস্তাবনা গণভোটে দেওয়া হয় সেটিতে বিএনপি সম্মতি দেয়। এমনকি নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রধান তারেক রহমান জনগণকে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। গণভোটে ৭০ শতাংশ ভোটার ঐ ৪৭টি প্রস্তাবের পক্ষে হ্যাঁ ভোট দেন।

যেহেতু জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সংবিধানের ঐ ৪৭টি সংশোধনীর পক্ষে হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন তাই সংবিধান সংস্কারের জন্য আর আলাদা করে সংসদীয় কমিটি গঠনের কোনো প্রয়োজন নেই। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন যে, সরকার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। এখানে রয়েছে একটি শুভঙ্করের ফাঁক। জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন হলে ঐ ৮৪টি প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হয়, যার মধ্যে রয়েছে বিএনপির ২৩টি নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি। পক্ষান্তরে জনগণ বিএনপির ঐ নোট অব ডিসেন্ট প্রত্যাখ্যান করে ঐ ৪৭ দফাকে ভোট দিয়েছেন।

সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের যে প্রস্তাব বিএনপি সংসদে দিয়েছে সেটি সোজাসুজি গণভোটকে প্রত্যাখ্যান করার প্রস্তাব। জনগণের দল, জনগণের খাদেম হিসাবে জামায়াত গণরায়কে অবহেলা বা প্রত্যাখ্যান করার ধৃষ্টতা রাখে না। তাই আইনিভাবে এবং নৈতিকভাবে-উভয়ভাবে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির এই সিদ্ধান্ত সঠিক এবং গণরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের নিদর্শন। বিএনপি শুধুমাত্র গণভোটকেই অবজ্ঞা করেনি, তারা জুলাই বিপ্লবকেও অতি সুকৌশলে কার্পেটের তলে ঠেলে দিচ্ছে।

বিএনপির এই প্রস্তাব ষড়যন্ত্রমূলক। জামায়াত এবং এনসিপি এই ষড়যন্ত্রের অংশীজন হতে পারে না।

Email:[email protected]