বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই বিতর্ক আরও স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। একদিকে তাকে ‘বিশ্বকবি’, ‘জাতির প্রেরণা’ এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে-রবীন্দ্রনাথ কি শুধুই একজন সাহিত্যিক, নাকি তাকে ঘিরে বহুদিন ধরেই একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করা হয়েছে? বিএনপির সাম্প্রতিক রবীন্দ্রপ্রীতি সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। যে দল একসময় নিজেদের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারক হিসেবে উপস্থাপন করত, তারাই এখন রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে রাজনৈতিক ভাষায় ব্যবহার করছে। এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতার বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক বলয়ের প্রভাব এবং মিডিয়াকেন্দ্রিক জনমতের হিসাব। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে মুসলমান সমাজ, জাতীয়তাবাদ, ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং বাঙালির আত্মপরিচয় নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে রবীন্দ্রনাথ এখন আর শুধু সাহিত্যচর্চার বিষয় নন। তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ: সাহিত্য, রাজনীতি ও বাঙালির মানসিক বিভাজন : রবীন্দ্রনাথ কি শুধুই একজন কবি, নাকি বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক ধরনের প্রতীক? তাকে ঘিরে যে ‘আবেগ’, তা কি সাহিত্যিক মূল্যায়নের জায়গা থেকে এসেছে, নাকি রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে নির্মিত হয়েছে? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষার সবচেয়ে প্রভাবশালী সাহিত্যিকদের একজন। তার ভাষা, সংগীত, কাব্য, গল্প, উপন্যাস-সব মিলিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, তাকে ঘিরে বাঙালি সমাজে এক ধরনের ‘পবিত্রতার রাজনীতি’ গড়ে উঠেছে। সেখানে রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করা মানেই যেন জাতিসত্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। কী ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী মানসিকতা।

বিশ্বসাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক অসংখ্য। কিন্তু বাংলা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘বিশ্বকবি’ উপাধি প্রায় একচেটিয়াভাবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেই স্থায়ী হয়ে গেছে।

দুনিয়াতে প্রতিবছর একজন করে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ঠাকুর পেয়েছিলেন ১১৩ বছর আগে। ১১৩ বছর ধরে আরো ১১৩ জন সাহিত্যিক বোধহয় নোবেল পেয়েছেন। সেই হিসাবে কিন্তু দুনিয়াতে ‘বিশ্ব কবি বা সাহিত্যিক’ থাকার কথা ১১৪ জন। ‘বাঙালি’ পলিটিকাল ভার্সন যারা বানিয়েছেন তাদের হিসেবে ‘শেষ বিশ্বকবি’ হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মানে হলো ঠাকুরের পরে বাকি যে ১১৩ জন নোবেল পাওয়া কবি-সাহিত্যিক আছেন উনারা সবাই ‘লোকাল কবি’,‘বিশ্বকবি’ না।

আসলে রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যিকের চেয়ে সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবেই বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত রাজনীতিতে রবীন্দ্রনাথ এক ধরনের ‘আইডেন্টিটি মার্কার’ হয়ে ওঠেন। কে রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন, কে গাইছেন না-তা দিয়েও রাজনৈতিক অবস্থান বিচার করা হয়। এই প্রবণতা সাহিত্যের চেয়ে সংস্কৃতির রাজনৈতিক ব্যবহারের দিকটাকেই বেশি স্পষ্ট করে। সবাই জানে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছেন, ঢাকাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। দুটি বিষয়ই ছিল এই পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এর বিরোধিতা করে মূলত মুসলমানদের বিপক্ষে তার সরব উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। এটিই সত্য, এটিই বাস্তবতা। এটিকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আরেকটি বড় বিতর্ক মুসলমান সমাজকে ঘিরে তার দৃষ্টিভঙ্গি। তার লেখায় ‘যবন’, ‘ম্লেচ্ছ’, ‘মুসলমান’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার আজকের তরুণ পাঠকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতেই পারে। তার সাহিত্যেও মুসলিম চরিত্রের উপস্থাপন নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশেষত ঊনিশ ও বিংশ শতকের বঙ্গীয় হিন্দু নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে রচিত অনেক সাহিত্যেই মুসলমানদের ‘অন্য’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, বঙ্কিমচন্দ্রসহ বহু লেখকের রচনায় এই প্রবণতা ছিল।

সাহিত্য শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়। অনেক সময়ই এটি রাজনৈতিক অস্ত্রও হয়ে ওঠে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে অনেক সময়েই কোনো জাতি বা গোষ্ঠীকে ঘৃণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার প্রাথমিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই প্রক্রিয়াই ‘Othering’ বা ‘অপরীকরণ’-যেখানে একটি গোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে ‘অপর’, ‘অবমানব’ বা ‘হুমকি’ হিসেবে নির্মাণ করা হয়। বাঙলা সাহিত্যে এই প্রবণতা স্পষ্ট। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথেরা মুসলমান চরিত্রগুলোকে নেতিবাচক, ডাকাত, জারজ, দখলকারী, ভিনদেশী, পশ্চাৎপদ বা ‘ঊন-মানুষ’ রূপে উপস্থাপন করেছে।

উপন্যাসের আড়ালে যে বয়ান নির্মিত হয়েছিল-যেখানে মুসলমান এবং মুসলমান শাসনকে ‘অন্ধকার যুগ’ এবং জাত-পাত, সতীদাহ করা, অতীত সময়কে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়-এটা নিছক সাহিত্যিক কল্পনা ছিল না; বরং একটি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। এই বয়ানের ভাষা, রূপক, চরিত্রায়ণ-সবই সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উসকে দিয়েছে এবং আরএসএসের উগ্র হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের মতাদর্শিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

আজকের পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানকে এই সাহিত্যিক ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের লেখায় যে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের বীজ রোপিত হয়েছিল, সেটাই রাজনৈতিক হিন্দুবাদের জন্য উর্বর মাটি তৈরি করেছে। আধুনিক উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকড় নিহিত রয়েছে সেই সাহিত্যচর্চার মধ্যেই, যা ‘অপরীকরণ’-এর সাংস্কৃতিক কাঠামোকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। সেদিক দিয়ে এটা বলা যায়, আজকের পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতে উগ্রবাদী বিজেপির জয়-জয়কার বঙ্কিম, রবীন্দ্রের সাহিত্যচর্চার বাই-প্রোডাক্ট।

সমস্যা হলো, কিছু লোক রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তুলে ফেলেছে। ফলে তার সাহিত্য নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কেউ তার মুসলমান বিষয়ক বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বা ‘সংস্কৃতিবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যেমন উদার মানবতাবাদ ছিল, তেমনি তার লেখায় সময়ের সামাজিক পক্ষপাতও ছিল। কিছু লেখায় মুসলমানদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যও করেছেন। একজন মানুষ বা সাহিত্যিককে সম্পূর্ণ দেবতা বানিয়ে ফেললে সত্য আড়াল হয়ে যায়।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সাহিত্যকে প্রায়ই মতাদর্শিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ বা শিবাজীচর্চাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে, তেমনি বাংলাদেশেও রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাজনীতি তৈরি হয়েছে। এই দুই বাস্তবতাই সত্য। সাহিত্য কোনো যান্ত্রিক রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো নয়। একই লেখককে ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ভিন্নভাবে ব্যবহার করতে পারে। রবীন্দ্রনাথকে ভারতীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদও ব্যবহার করেছে। সুতরাং সাহিত্যকে একরৈখিক রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় বন্দি করা বিপজ্জনক। রবীন্দ্রনাথকে ‘সংস্কৃতির মাজার’ বানিয়ে রাখতে চায় অনেকেই। আর এদেরকে ভারতপ্রেমী হিসেবেই সবাই জানে।

আমাদের সমাজের বড় সমস্যা হলো, আমরা ব্যক্তি পূজা খুব দ্রুত শুরু করি। তারপর সেই ব্যক্তিকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করি। রবীন্দ্রনাথও সেই ভাগ্য এড়াতে পারেননি। ফলে সাহিত্যচর্চা কম হয়েছে, প্রতীকচর্চা বেশি হয়েছে। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথকে জীবন্ত করে তুলতে হলে তাকে বিতর্কের বাইরে নয়, বরং বিতর্কের ভেতরেই আনতে হবে। কারণ জীবন্ত সাহিত্য সবসময় প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। যে সাহিত্য প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না, তা শেষ পর্যন্ত কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথকে যদি সত্যিই বড় সাহিত্যিক হিসেবে মূল্যায়ন করতে হয়, তাহলে তাকে সমালোচনার স্বাধীনতার মধ্যেই রাখতে হবে। সেটাই একজন লেখকের প্রতি প্রকৃত সম্মান। কিন্তু কথিত রবীন্দ্রপ্রেমীরা এটা মানতেই নারাজ। কোনো সমালোচনা করা যাবে না। এটি আসলে উগ্রতা এবং অন্ধত্ব। আরো বলা যায় এক ধরনের রাজনৈতিক আনুগত্য।

রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের সাম্প্রতিক আয়োজনকে শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভাবলে ভুল হবে। এটি মূলত সাংস্কৃতিক কূটনীতির আড়ালে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি পুরোনো কৌশল। ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বলয় তৈরি করে। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে সেই প্রচেষ্টা চলছে। রবীন্দ্রনাথ, বাউল, ভাষা-সবকিছুকেই ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানের অংশ বানানো হয়েছে।

ঢাকার অনুষ্ঠানে ঠাকুরবাড়ির নারী, রবীন্দ্রনাথের নারী চরিত্র, গান, নৃত্য, সাজসজ্জা-সব মিলিয়ে এক ধরনের আবেগঘন সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন একটি বিদেশি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশন এত গভীরভাবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রবেশ করবে? কেন বারবার ‘অভিন্ন সংস্কৃতি’র নামে বাংলাদেশকে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বলয়ের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে? বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, মুসলিম সমাজচেতনা এবং জাতীয় পরিচয় আছে। সেটিকে দুর্বল করে ‘দুই বাংলার এক সংস্কৃতি’ ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা রাজনৈতিকভাবেই দেখতে হবে। সাংস্কৃতিক বিনিময় স্বাভাবিক। কিন্তু সাংস্কৃতিক আধিপত্য গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের সংস্কৃতি কোনো দেশের সফট পাওয়ার প্রকল্পের উপনিবেশ হতে পারে না।

বিএনপির রবীন্দ্রনাথ: সংস্কৃতি, সংকেত নাকি ভোটের অঙ্ক : বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতীক খুব গুরুত্বপূর্ণ। কখনো ভাষা। কখনো মুক্তিযুদ্ধ। কখনো ধর্ম। কখনো সংস্কৃতি। এই প্রতীকগুলো দিয়েই রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান তৈরি করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে যে প্রতীকটি দৃশ্যমান হয়েছে, সেটি হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একসময় যে বিএনপিকে ‘রবীন্দ্রবিমুখ’ বা অন্তত ‘রবীন্দ্র-নিরপেক্ষ’ দল হিসেবে দেখা হতো, আজ সেই দলই রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে প্রকাশ্য উচ্ছ্বাস দেখাচ্ছে। জন্মবার্ষিকীতে বিবৃতি, অনুষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট, নেতাদের আবেগঘন বক্তব্য। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে-হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন?

এটি কি সাহিত্যিক অনুরাগ? নাকি রাজনৈতিক কৌশল? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনীতিতে কোনো প্রতীকই নিরীহ থাকে না। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি নন, তিনি একটি অবস্থান। একটি শ্রেণিচিহ্ন। একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত, এনজিও-নির্ভর বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও মূলধারার মিডিয়ার বড় অংশের কাছে রবীন্দ্রনাথ এক ধরনের ‘আদর্শিক বৈধতা’ বহন করেন। ফলে কোনো রাজনৈতিক দল যখন রবীন্দ্রনাথকে জোর দিয়ে সামনে আনে, তখন সেটি কেবল সাহিত্যচর্চা থাকে না। সেটি রাজনৈতিক বার্তায় পরিণত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে। কেউ বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ অস্তিত্বে মিশে আছেন। কেউ বলেছেন, তিনি জাতির প্রেরণা। কেউ রবীন্দ্রনাথের কৃষি ভাবনার অনুসরণের কথা বলেছেন। আরেক নেতা বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জনগণ দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছে। অনেকেই বলছেন বিএনপি নেতারা এইসব কি আবোল-তাবোল বলছেন। বক্তব্য আবোল-তাবোল- তবে বিষয়টি দলীয় পরিকল্পনার অংশ। বিএনপি দলীয়ভাবে রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী উদযাপন করেছে গুরুত্ব দিয়ে। প্রশ্ন হলো-এই উচ্ছ্বাস কি হঠাৎ জন্ম নেওয়া সাংস্কৃতিক উপলব্ধি? নাকি এটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ?

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। বিএনপি কি মনে করছে দীর্ঘদিন ধরে ‘ডান দিকে ঝোঁকা’ তকমা বহন করা ঠিক নয়। দলটি কি মনে করছে, কেবল ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় স্থায়ী হওয়া কঠিন। মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বয়ান তৈরির ক্ষমতাও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়া আওয়ামী ঘরানার এবং রবীন্দ্রপ্রেমিক। বিএনপি কি এইসব মিডিয়ার আনুগত্য পেতে রবীন্দ্রমুখী হয়ে উঠছে। দেখে মনে হচ্ছে, বিএনপি হয়তো নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চাইছে-একটি ‘সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য’ জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে।

এখানে রবীন্দ্রনাথ একটি কার্যকর প্রতীক। কারণ রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বাংলাদেশে বহু বছর ধরে একটি সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি হয়েছে। ছায়ানট, উদীচী, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী এবং মিডিয়ার বড় একটি অংশ এই বলয়ের কেন্দ্র। বিএনপির ভেতরে হয়তো ধারণা তৈরি হয়েছে, এই বলয়ের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে বরং তাদের আস্থায় আনা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। এই কৌশলের পেছনে বাস্তব যুক্তি আছে। বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে মিডিয়া-নির্ভর জনমত এখন বড় ফ্যাক্টর। আন্তর্জাতিক মহলও ‘সাংস্কৃতিক উদারতা’কে রাজনৈতিক বৈধতার অংশ হিসেবে দেখে। ফলে রবীন্দ্রনাথকে সামনে আনা মানে কেবল কবিকে স্মরণ করা নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলকে সংকেত দেওয়া-‘আমরা বদলেছি।’

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তন কতটা বাস্তব? আর কতটা কৌশলগত? কারণ বিএনপির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল ভিন্ন এক সামাজিক বাস্তবতায়। দলটি দীর্ঘদিন নিজেদের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সেখানে ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সমালোচনা ছিল। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বনাম ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ছিল বড় রাজনৈতিক বিতর্ক। সেই জায়গা থেকে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দলের সমর্থকদের কাছে অস্বস্তির কারণ হওয়াই স্বাভাবিক। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন হলো ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। রবীন্দ্রনাথের হলো ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। তাহলে রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ধারণ করলে বিএনপির ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর বিএনপির নেতাদের কি জানা আছে?

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বড় অংশ ধর্মীয় ও রক্ষণশীল সামাজিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তাদের কাছে সংস্কৃতির প্রশ্নটি শুধু নান্দনিক নয়; পরিচয়েরও বিষয়। তারা অনেকেই মনে করেন, দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট এলিট শ্রেণির আধিপত্য রয়েছে, যারা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও জীবনযাপনকে অবজ্ঞা করে। বিএনপি যদি সেই শ্রেণির মন জয়ের জন্য অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে নিজেদের মূল সমর্থকভিত্তির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। ইতিমধ্যে সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলেও অনেকে মনে করছেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপির ভোট ও জনসমর্থনের প্রশ্নে যে আলোচনা উঠেছে, সেখানে এই সাংস্কৃতিক অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। কারণ রাজনীতিতে প্রতীক বদলালে ভোটারের মানসিকতাও প্রভাবিত হয়।

বিএনপিও হয়তো ভাবছে, শুধু ধর্মীয় আবেগ বা ভারতবিরোধী অবস্থান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতি টিকিয়ে রাখা কঠিন। ফলে তারা সংস্কৃতির নতুন ভাষা খুঁজছে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক সমস্যা আছে। বাংলাদেশে সংস্কৃতিকে প্রায়ই রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা হয়। কে রবীন্দ্রসংগীত গায়, কে গায় না-তা দিয়েও রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করা হয়। একদল রবীন্দ্রনাথকে ‘জাতির বিবেক’ বানিয়ে ফেলেছে। আরেকদল তাকে ‘ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতীক’ হিসেবে দেখে। ফলে সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বাভাবিক আলোচনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। মানুষ কি সত্যিই বিশ্বাস করবে, বিএনপির এই রবীন্দ্রপ্রেম গভীর সাংস্কৃতিক উপলব্ধি থেকে এসেছে? নাকি এটি কেবল ক্ষমতার অঙ্ক? কারণ রাজনীতিতে হঠাৎ পরিবর্তন মানুষ সহজে বিশ্বাস করে না। বিশেষ করে যখন সেই পরিবর্তন দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হয়। আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে যে সাংস্কৃতিক বলয় আছে, সেটি নিজেও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নয়। বহু সাংস্কৃতিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বিএনপি যদি মনে করে শুধু রবীন্দ্রনাথকে সামনে আনলেই তারা সেই বলয়ের পূর্ণ সমর্থন পাবে, সেটি অতিরিক্ত সরল হিসাবও হতে পারে। কারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আনুগত্য শুধু প্রতীক দিয়ে বদলায় না। ইতিহাস, বিশ্বাস, সম্পর্ক-সবকিছু মিলেই তা তৈরি হয়।

তবে বিএনপির এই পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় বাস্তবতাও সামনে এনেছে। সেটি হলো-সংস্কৃতি এখন আর কেবল সংস্কৃতি নেই। এটি সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতির অংশ। কবিতা, গান, সাহিত্য, উৎসব-সবই এখন রাজনৈতিক সংকেত বহন করে। ফলে বিএনপির হঠাৎ চাগিয়ে ওঠা রবীন্দ্রপ্রেম নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সেটি আসলে কবিকে ঘিরে নয়; বরং রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে।

বাংলাদেশ কি এমন একটি রাষ্ট্র হবে, যেখানে সংস্কৃতি একটি নির্দিষ্ট এলিট শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে থাকবে? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র হবে, যেখানে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ও সমানভাবে সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি পাবে? এই প্রশ্ন এখন আরও জোরালোভাবে সামনে আসছে। বিএনপির নতুন রবীন্দ্রপ্রীতি সেই প্রশ্নকেই নতুন করে উসকে দিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতে প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতীকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। মানুষ শেষ পর্যন্ত দেখে-কোন দল তাদের বিশ্বাস, জীবনযাপন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারছে। শুধু কবির ছবি সামনে রাখলেই সেই সংযোগ তৈরি হয় না। কারণ সাহিত্য দিয়ে আবেগ তৈরি করা যায়, কিন্তু রাজনীতি টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপর।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।