॥ মুন্সী আবু আহনাফ ॥

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক কখন “বন্ধুত্বপূর্ণ” এবং কখন “আধিপত্যমূলক” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু কূটনৈতিক ভাষা নয়, বরং বাস্তব তথ্য ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকাতে হবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই ভূমিকার কৃতজ্ঞতার আড়ালে গত পাঁচ দশকে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে; তা কি সত্যিকারের সমতাভিত্তিক বন্ধুত্ব, নাকি একটি সুকৌশলী আধিপত্যের কাঠামো? এটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। এরমধ্যেদিয়ে পদ্মা-যমুনা দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে যার হিসেব মিলানো কঠিন। ইতালীয় দার্শনিক ও মাক্সবাদী লেখক আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর প্রিজন নোটবুক গ্রন্থে যাকে “Hegemony” বা আধিপত্য বলেছেন; সেটি শুধু সামরিক বলপ্রয়োগে নয়, বরং অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও কূটনীতির মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিশ্লেষণে এই তত্ত্বটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

এক. পানি আধিপত্যের সবচেয়ে পুরনো অস্ত্র ফারাক্কার অভিশাপ থেকে বাংলাদেশের মানুষ গত ৫০ বছরেও মুক্ত হতে পারেনি। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল। ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করল। বলা হয়েছিল, এটি কলকাতা বন্দর রক্ষার জন্য। কিন্তু পঞ্চাশ বছরে যা হয়েছে তা ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরিহাসগুলোর একটি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে; ফারাক্কার কারণে পদ্মার গড় প্রবাহ শুষ্ক মৌসুমে ৬০-৭০ শতাংশ কমে গেছে। উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলায় মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১৯৯৬ সালে গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল; কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন বলছে, চুক্তি অনুযায়ী পানি বাংলাদেশ পাচ্ছে না। এটি শুধু একটি পানিচুক্তির ব্যর্থতা নয়; এটি একটি দেশের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নকে প্রতিবেশীর ইচ্ছার কাছে জিম্মি করে রাখার গল্প।

দুই. তিস্তার পানি বন্টন ৫০ বছরের প্রতিশ্রুতি, যা আজও শূন্য অর্জনের খাতায় রয়েছে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। চার দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে ২০২৪ সালে চুক্তি হবে হবে বলে আলোর মুখ দেখেও দেখলো না। শেষ পর্যন্ত চুক্তি হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার চুক্তি আটকে দিয়েছেন। এবং কেন্দ্রীয় সরকার তাঁর কাছে জিম্মি হয়ে থেকেছে অথবা থাকতে চেয়েছে। অধ্যাপক রেহমান সোবহান তাঁর “Divided at Departure: Bangladesh, India and the Quest for Common Ground” গ্রন্থে লিখেছেন, পানি সমস্যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত অসাম্যের প্রতীক। তিস্তার পানি আটকে রাখার ফলে উত্তরবঙ্গের কৃষি ধ্বংস হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ কৃষক পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকায় আসছেন। এই মানবিক বিপর্যয়ের দায় কার? সেটা নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

তিন. সীমান্ত হত্যা ভারতের বন্ধুত্বের নামে রক্তাক্ত হাত। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী BSF-এর বুলেট বাংলাদেশের হৃদয় বারবার ভেদ করছে আর রক্তাক্ত করছে। Human Rights Watch-এর তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী BSF প্রায় ১১০০ বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে। Ain o Salish Kendra (ASK)-এর হিসাবে শুধু ২০২৩ সালেই সীমান্তে ২৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এই মানুষগুলো বেশিরভাগই ছিলেন গরিব সীমান্তবাসী, যারা গরু আনতে গিয়ে, পণ্য পারাপার করতে গিয়ে গুলি খেয়ে মরেছেন। প্রশ্ন হলো, একজন সন্দেহভাজন চোরাচালানকারীকে কি বিনা বিচারে গুলি করে মারার অধিকার কারো আছে? আন্তর্জাতিক আইনে এই হত্যাকাণ্ড বিচারবহির্ভূত বর্বর হত্যা। কিন্তু ঢাকা থেকে কোনো শক্তিশালী প্রতিবাদ কি কখনো দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছেছে? Dr. Imtiaz Ahmed তাঁর “India-Bangladesh Relations: Challenges and Opportunities” গ্রন্থে বলেছেন, সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশের জনমনে ভারতবিরোধী মনোভাবের সবচেয়ে বড় কারণ।

চার. ভারতীয় অর্থনৈতিক আধিপত্য আর একতরফা বাণিজ্যের ঘাটতির ফাঁদে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩-২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করে প্রায় ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য। বিপরীতে ভারতে রপ্তানি মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের কম। অর্থাৎ বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল ঘাটতির পেছনে রয়েছে ভারতের অশুল্ক বাধা (Non-Tariff Barriers)। বাংলাদেশি পণ্য ভারতে ঢুকতে গেলে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়ে। অধ্যাপক আবু আহমেদ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, ভারত SAFTA চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে ৪৮০টি পণ্যে কার্যকর বাধা রেখেছে।

পাঁচ. ট্রানজিট ও করিডোরের রাজনীতি কৌশলে ভারত বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য পরিবহন করছে। পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনকালে এই ট্রানজিট সুবিধা ভারতের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক। যা ভারত গত ১৬ বছর প্রশ্নহীন ভাবে এই বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশ কি যথেষ্ট ট্রানজিট ফি পাচ্ছে? এই ট্রানজিটের পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত ক্ষতির ক্ষতিপূরণ কে দেবে? CPD (Centre for Policy Dialogue)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ভারত ট্রানজিট থেকে যা সুবিধা পাচ্ছে, বাংলাদেশ তার তুলনামূলক ন্যায্য অংশ পাচ্ছে না।

ছয়. বাংলাদেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ভারতের অদৃশ্য হাতের খেলা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভারতের পছন্দের রাজনৈতিক দলগুলোই ক্ষমতায় আসে এটা বাংলাদেশের সাধারণ জনমনে একটি কমন ধারণা। Subir Bhaumik তাঁর “Troubled Periphery: Crisis of India’s North East” গ্রন্থে’ এবং Ges Srinath Raghavan তাঁর “১৯৭১: A Global History of the Creation of Bangladesh” গ্রন্থে দেখিয়েছেন ভারত সবসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজের পছন্দের পক্ষ নিয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পরও ভারত তৎকালীন সরকারকে সমর্থন দিয়েছে যখন পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনী অনিয়মের সমালোচনা করেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারতের কাছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র নয়, “Friendly Government” বা অনুগত সরকার বেশি গুরুত্বপূর্ণ। C. Raja Mohan তাঁর “Samudra Manthan: Sino-Indian Rivalry in the Indo-Pacific” গ্রন্থে স্বীকার করেছেন ভারতের দক্ষিণ এশিয়া নীতি মূলত চীনবিরোধী কৌশলের অংশ এবং বাংলাদেশ সেই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি।

গোয়েন্দা তৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের অদৃশ্য হস্তক্ষেপ যে বিষয়টি গত ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট আমলে বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা কঠিন কিন্তু এটি বাংলাদেশের জনমানসে একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাহানগীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শিক্ষিত নাগরিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করে।

সাত. ভারতীয় মিডিয়ার আগ্রাসন বাংলাদেশের সামাজিক স্থীতিশীলতার জন্য একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ভারতীয় চ্যানেল। বাংলাদেশি চ্যানেলগুলো নিজেদের দর্শক হারাচ্ছে। Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission (BTRC)-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ভারতীয় চ্যানেলের দর্শক বাংলাদেশি চ্যানেলের দর্শকের তুলনায় বহু ক্ষেত্রে বেশি। আন্তোনিও গ্রামসির ভাষায় বলতে গেলে, এটি হলো “Soft Hegemony” বা নরম আধিপত্য। মানুষ জানতেও পারে না কখন তার রুচি, পছন্দ এবং মূল্যবোধ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। ড. আনিসুজ্জামান তাঁর বিভিন্ন লেখায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষায় আমরা কতটা সফল?

আট. পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ চট্টগ্রাম বন্দর ও অন্যান্য নদীবন্দর দিয়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছে গত ১৬ বছর। ভারত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য রাজস্ব আনছে। কিন্তু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন করছেন এই বন্দর ব্যবহারের কৌশলগত মাত্রা কতটুকু বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বাংলাদেশ কি চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে?

পরিশেষে, বাংলাদেশের করণীয় -সমতা আর ভুল বোঝাবুঝি দূর করা। এই বিশ্লেষণ ভারতবিরোধিতার আহ্বান নয়। ভারত একটি বাস্তবতা, আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী। তার সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে। কিন্তু সম্পর্ক হতে হবে সমতার ভিত্তিতে, কৃতজ্ঞতার দাসত্বের ভিত্তিতে নয়। বাংলাদেশকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং আসিয়ান দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করতে হবে। কোনো একটি দেশের উপর নির্ভরশীলতা জাতীয় স্বার্থের জন্য বিপজ্জনক। Dr. Debapriya Bhattacharya বলেছেন, বাংলাদেশের কূটনীতি হতে হবে “Multi-vector” বা বহুমুখী। তিস্তা চুক্তি না হলে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানিসম্পদ আইন-এর আশ্রয় নিতে হবে। কূটনৈতিক ভদ্রতার আড়ালে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া যাবে না। প্রতিটি সীমান্ত হত্যায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরব হতে হবে। Human Rights Watch I Amnesty International-এর সাথে সমন্বয় করে ভারতের উপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে হবে। তাই ভারতের সাথে সম্পর্কে আমাদের অবস্থান হবে, কৃতজ্ঞ কিন্তু মর্যাদাসম্পন্ন। বন্ধুত্বপূর্ণ কিন্তু আত্মনির্ভরশীল। সহযোগিতামুখী কিন্তু সমতাভিত্তিক। আমাদের ১৭ কোটি মানুষের স্বার্থ, আমাদের পানির অধিকার, আমাদের সীমান্তের নিরাপত্তা, এগুলো আলোচনার টেবিলে তুলে ধরার সাহস আমাদের থাকতে হবে।