রামদা-কিরিচ, চাপাতি কয়েকজনের হাতে। আবার অন্য একজনের ডান হাতে বাঁকানো ধারালো দেশীয় অস্ত্র। তার বাঁ হাতে সাদা রঙের কাপড় মোড়ানো। চেহারায় রুদ্রমূর্তি। সঙ্গে বেশ কয়েকজন মারমুখী হয়ে তেড়ে যাচ্ছে। কারও মাথায় হেলমেট, আবার কারও পরনে লুঙ্গি। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে এমন কয়েকজনকে দেখা গেছে। ভিডিও ফুটেজ- স্থিরচিত্র এবং সরাসরি দেখে স্থানীয়রা এদেরকে ক্ষমতাসীন দল ছাত্রদলের নেতা বলে চিহ্নিত করেছেন। প্রশ্ন হলো- সাধারণ দৃষ্টিতে অস্ত্রধারী এসব যুবককে কি শিক্ষার্থী বলা যায়? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্ত্র হাতে ত্রাস সৃষ্টি করে সহপাঠিদের ওপর হামলা চালানো শিক্ষার্থীর কাজ হতে পারে? শিক্ষার্থীর হাতে কি অস্ত্র থাকতে পারে? দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ত্রাসের চর্চা দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসলেও ২৪-এর বিপ্লবের পর ছাত্ররাজনীতি আবার পুরানো ধারায় ফিরে যাবে এমন প্রত্যাশা কারো ছিল বলে মনে হয় না।
ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার পতনের পর মনে করা হয়েছিল হয়তো এই রেজম আর ফিরে আসবে না। শিক্ষাঙ্গনে থাকবে লেখাপাড়ার সুন্দর পরিবেশ। সাধারণ মানুষ তার মেধাবী সন্তানকে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদ্যাপিঠে পাঠিয়ে ঘরে নিশ্চিন্তে থাকবেন। শিক্ষাঙ্গনে আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হবে না। নোংরা রাজনীতিমুক্ত থাকবে শিক্ষাঙ্গন। যেমনটা চেয়েছিলেন দেশের মানুষ। কিন্তু ছাত্র-রাজনীতি এদেশে এমনভাবে কলুষিত হয়েছে যে এখান থেকে ভালো কিছু আশা করাই অনুচিত। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জালিম শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রজনতার আন্দোলন যুগে যুগে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন জাগে-স্বাধীনতার ৫৫ বছরে জাতি হিসেবে আমরা কতটা পরিশীলিতি হতে পেরেছি। কেননা আমাদের মতো ভুলোমনা জাতি দ্রুত পশ্চাতে ফিরতে পছন্দ করে। গর্ত থেকে টেনে উঠানোর পর আবারও চোরাবালির দিকে পা বাড়ায়। আর তা নাহলে এত অল্পসময়ই পুরানো পথে হাঁটা শুরু করে কি করে?
গত দুই মাসে বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে-ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। ক্যাম্পাস, হল দখলের জন্য একটি ছাত্র সংগঠন পুরানো চর্চায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিরীহ ছাত্রদের ওপর। উদ্দেশ্য নিজেদের আধিপত্য বিস্তার। ক্যাম্পাসে-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু নিজেদের দলই থাকবে। ত্রাস সৃষ্টি করে অন্য ছাত্র সংগঠন বা নিরীহ ছাত্রদের বিতাড়িত করাই তাদের কাজ। অন্য সংগঠনের নেতাকর্মীদের হল থেকে বিতাড়িত করে দখলবাণিজ্য করাই উদ্দেশ্য। এসব যারা করছে গণমাধ্যমে তাদের পরিচয় উঠে এসেছে। দেশের গণমাধ্যম পুরো চিত্র তুলে ধরতে না পারলেও ত্রাস যারা করছে তাদের অপকর্ম কোনো না কোনোভাবে মানুষের সামনে চলে আসছে। সোস্যাল মিডিয়ায় তাদের চেহারা উন্মোচিত হয়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কলেজে যে ঘটনা ঘটলো এর দায় কে নিবে? কি কারণে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে প্রকাশ্যে হামলা চালিয়ে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের রক্তাক্ত করা হলো? যে ঘটনা নিয়ে এই রক্তপাত হলো এর দায় কি করে সরকরার এড়িয়ে যাবে? শিবির সিটি কলেজে কলুষিত ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাস্পাস চেয়েছিল। একটি ছাত্র সংগঠনের নিজস্ব চিন্তা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ চেয়ে গ্রাফিতি করতেই পারে; এটা গণতান্ত্রিক অধিকার। তাদের মত প্রকাশ করার অধিকার রয়েছে। ছাত্রশিবিরের গ্রাফিতিতে লেখা ছিল-‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। ছাত্রলীগ তো সরকারিভাবেই নিষিদ্ধ। কিন্তু বিপত্তি ঘটিয়েছে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল। কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতা-কর্মী গিয়ে গ্রাফিতি থেকে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে সেখানে ‘গুপ্ত’ শব্দটি লিখে দেওয়া হয়। তা হলে গ্রাফিতি থেকে ছাত্র শব্দটি মুছে যে শব্দটি লেখা হলো এ গর্হিত কাজটি করে ছাত্রদলের উস্কানি দেয়ার উদ্দেশ্য কি? সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দুই সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। সেদিন সকাল থেকেই বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। দুপুর ১২টার দিকে শিবির শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করলে মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয় ছাত্রদল। একপর্যায়ে ছাত্রদল প্রথমে শিবিরের ওপর হামলা চালায়। সরকারি সিটি কলেজের উপাধ্যক্ষ জসীম উদ্দিন বলেছেন, গ্রাফিতির লেখা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ডাকা হয়। পরে কলেজের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। দুপুরের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। পরে বিকেল চারটার দিকে নগরের নিউমার্কেট মোড় থেকে শিবিরের মিছিল কলেজের দিকে এলে সিটি কলেজের সামনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা হামলা করে। এতে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়। ছাত্রদলের হামলায় আহতদের মধ্যে আশরাফ হোসেন নামের এক শিবির কর্মীর পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন করে দেয় ছাত্রদলের সশস্ত্র নেতা-কর্মীরা।
চট্টগ্রামে সরকারি সিটি কলেজে সংঘর্ষের ঘটনায় ছাত্রদলকে দায়ী করেছেন ডাকসু ভিপি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক আবু সাদিক কায়েম। তিনি বলেছেন, এটা পরিষ্কার, ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা এই হামলার সঙ্গে জড়িত। কলেজ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। এতে একজন শিক্ষার্থী গুরুতরভাবে আহত হন এবং তার পায়ের গোড়ালিতে মারাত্মক আঘাত লাগে। আবু সাদিক কায়েম অভিযোগ করেন, ঘটনার শুরুতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর হামলা করা হয়। পরে যখন একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছিল, তখন সেখানে আবারও বহিরাগত ব্যক্তিদের নিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ আক্রমণ চালানো হয়। সংঘর্ষ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছু ক্ষেত্রে নি®্ক্িরয় ছিল। বহিরাগত ব্যক্তিদের অস্ত্রসহ ক্যাম্পাসে প্রবেশ এবং হামলা চালানোর বিষয়টি আগেই প্রতিহত করা উচিত ছিল। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সঙ্গে দেখা করেন আবু সাদিক কায়েম। নগরের লালদীঘি এলাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে তিনি পুলিশ কমিশনারের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন। এতে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য ছয় দফা দাবি জানানো হয়েছে। এসব দাবির মধ্যে আছে-হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা রোধে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। ছাত্রশিবিরের এ নেতা জানান, সাম্প্রতিক হামলায় তাদের অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িত ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও বহিরাগতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে তারা পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বলেন, আমরা দেশের প্রতিটি ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ চাই। ক্যাম্পাসে বহিরাগত সন্ত্রাসী এনে হকিস্টিক, চাপাতি ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
এদিকে এ ঘটনার পরও শিবিরের উদ্দেশে উষ্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছে ছাত্রদল। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেছেন, আগামী কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন হাজারবার, প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি লেখনীতে আমরা শিবিরিকে গুপ্ত বলেই ডাকব।’ তবে একসময় যে ছাত্রদলই গুপ্ত ছিল, ফ্যাসিবাদের সাড়ে ১৫ বছরে যাদের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি গলা বাড়িয়ে তাদের এমন বক্তব্য হাস্যকর বলেই মনে করছেন দেশের সাধারণ নাগরিকরা। অনেকেই বলছেন- যে ছাত্রদল গত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে একটি মিছিল করতে পারেনি রাজপথে, তাদের মুখে এমন বক্তব্য বাগাড়ম্বর ছাড়া কিছুই নয়। যারা তাদের নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী (মরহুম) খালেদা জিয়ার বাড়ির সামনে থেকে একটি বালুর ট্রাক সরাতে এগিয়ে আসেনি, তাদের নেত্রীকে বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেয়ার পরও প্রতিবাদ করতে পারেনি, খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করে বিচারের নামে প্রহসন করে জেলে আটকে রেখে নির্যাতন করলেও প্রতিাবদে একটি মিছিল করতে পারেনি, সেই ছাত্রদল কোন মুখে এখন বড় বড় কথা বলে? চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও এই ছাত্রদলকে রাজপথে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও রাজপথে তারা ছিল কিনা প্রশ্ন রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদলের নেতাকর্মী রাজপথে থাকলেও তারা ছিল অনেকটা গুপ্ত। যারা নিজেদের পরিচয় দিয়ে অভ্যুত্থান চলাকালে আন্দোলন করতে ভয় পেয়েছে তারা অন্য যে কোনো ছাত্র সংগঠনকে গুপ্ত বলে কি করে।
এর আগে ছাত্রদলের নেতারাই আক্ষেপ করে বলেছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত ১৫ বছরে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারেনি। তাদের মতে, এই সময়ে তারা অনেকটা ‘গুপ্ত’ বা ঝটিকা মিছিলের রাজনীতি করতে বাধ্য হয়েছিল এবং তাদের ওপর ব্যাপক হামলা-মামলা চালানো হয়েছিল। গত দেড় দশকে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করতে পারেনি। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী তৎপরতা ও হামলা-মামলার কারণে তারা হলে থাকতে পারেনি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে মিশে রাজনীতি করতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসময় প্রকাশ্যে দাঁড়াতে না পেরে তারা ক্যাম্পাসের আশপাশে বা রাতের অন্ধকারে অল্প সময়ের মধ্যে দু’একটি ঝটিকা মিছিল করতে পেরেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর ছাত্রদল পতিজ্ঞা করেছিল-এখন ভীতি দূর করে নতুন ধারার রাজনীতি প্রবর্তন করতে চায় দলটি। যেখানে দখলদারিত্ব বা হামলা থাকবে না। তাদের এসব বক্তব্যের সাথে জাতি একমত; কারণ এটিই ছিল বিগত সময়ের বাস্তব চিত্র। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, অল্প সময়েই এই ছাত্রসংগঠনটির পুরানো চরিত্র জাতির সামনে চলে এসেছে। অতীত ভুলে গেছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের ছাত্র সংগঠন বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগকেই সঙ্গে নিয়ে এখন মাঠে তৎপর হচ্ছে। ছাত্রদলের এই কর্মকাণ্ড তাদেরকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা দেখার অপেক্ষায়।
লেখক : সাংবাদিক