সরদার ফরিদ আহমদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবার উত্তপ্ত। সংঘর্ষ। হামলা। গুজব। পাল্টা গুজব। কিন্তু এটি কেবল ক্যাম্পাসের ঘটনা নয়। এটি ক্ষমতার রাজনীতি। এটি নিয়ন্ত্রণের লড়াই। ঘটনার শুরু একটি ভুয়া স্ক্রিনশট দিয়ে। একটি অচেনা প্রোফাইল। নাম-অরণ্য আবির। প্রোফাইল নতুন। তথ্য নেই। ছবি নেই। কিন্তু প্রভাব আছে। একটি বিকৃত স্ক্রিনশট ছড়ানো হলো। একজন ছাত্রনেতাকে টার্গেট করা হলো। দাবি করা হলো-তিনি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।
ফ্যাক্টচেক বলল-সব মিথ্যা। স্ক্রিনশট এডিট করা। অন্য আইডির পোস্ট বিকৃত করে ছড়ানো হয়েছে। এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। হয়নি। গুজবকে অস্ত্র বানানো হলো।
উস্কানি ছড়ানো হলো। প্রতিশোধের ভাষা ব্যবহার হলো। তারপর হামলা। শাহবাগ থানার ভেতরে হামলা। ডাকসু প্রতিনিধিদের ওপর হামলা। সাংবাদিকদের ওপর হামলা। সব পুলিশের সামনে। এটি বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি প্যাটার্ন। গুজব এখন রাজনৈতিক প্রযুক্তি। মব এখন রাজনৈতিক টুল। হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন, ‘যখন মিথ্যা নিয়মে পরিণত হয়, তখন সত্য নিজেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।’ আজকের পরিস্থিতি সেই কথারই প্রতিফলন।
ঘটনার একটি বড় দিক-নিয়ন্ত্রণহীনতা। ছাত্রদলের শীর্ষ নেতা থামাতে চেষ্টা করেছেন। ভিডিওতে দেখা গেছে তিনি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তবু হামলা থামেনি। এর মানে কী?
প্রথমত, সংগঠনের ভেতরে বিভক্তি। দ্বিতীয়ত, বাহিরের শক্তির অনুপ্রবেশ। কে হামলা করেছে? তারা কি সত্যিই ছাত্রদল? নাকি ‘মব’-যারা যে কোনো পতাকা ব্যবহার করে? এই প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনীতি তখনই বিপজ্জনক হয়, যখন সংগঠন তার নিজস্ব শক্তিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ম্যাক্স ওয়েবার বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্র মানে বৈধ সহিংসতার একচেটিয়া অধিকার।’ কিন্তু এখন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে অ-রাষ্ট্রীয় হাতে। এটি রাষ্ট্রের জন্য সতর্ক সংকেত।
সাংবাদিক কেন টার্গেট : আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-সাংবাদিকদের ওপর হামলা কেন এ হামলা? সাংবাদিক তো প্রতিপক্ষ নয়। তারা পর্যবেক্ষক। তাহলে কেন? কারণ, এই সংঘাত পরিকল্পিত। এটি অরাজকতা। অরাজকতা যুক্তি মানে না। এটি কেবল ভয় তৈরি করে। জর্জ ওরওয়েল লিখেছিলেন, ‘সত্য বলা বিপ্লবী কাজ হয়ে দাঁড়ায়।’ আজ সেই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে গণতন্ত্রও নিরাপদ নয়।
বর্তমানে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ‘গুপ্ত’ শব্দটি মাঠে ছাড়া হয়েছে। এই শব্দ দিয়ে একে অপরকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ফল কী? বিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে। দল ভাঙছে।
সন্দেহ বাড়ছে। রাজনীতি তখনই দুর্বল হয়, যখন ভেতরের আস্থা ভেঙে পড়ে। নিক্কোলো মাকিয়াভেল্লি সতর্ক করেছিলেন,‘ভয়ের ওপর রাজনীতি দাঁড়াতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস ছাড়া তা টিকে না।’
এই পরিস্থিতি নতুন নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর নজির আছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই ‘৯৩ সিনড্রোম’ বলছেন। অর্থাৎ-একটি রাজনৈতিক শক্তিকে বিচ্ছিন্ন করা। তার মিত্রদের দূরে ঠেলে দেওয়া। তারপর তাকে দুর্বল করে ফেলা। ১৯৯২ সালে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন। তারপর রাজনৈতিক উত্তেজনা। জোটে ফাটল। সংসদ বর্জন। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হারানো। এই ধারাবাহিকতা কি আবার ফিরে আসছে? আজও একই ধরনের কৌশল দেখা যাচ্ছে। ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে। ক্যাম্পাস এখন সেই পরীক্ষাগার।
শুধু ক্যাম্পাস নয়। প্রশাসনেও পরিবর্তন। রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্ব বাড়ছে। সাবেক ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টদের প্রাধান্য। অরাজনৈতিক বা নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের বাদ দেয়া। এটি প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। একই সঙ্গে ‘গুপ্ত খেদাও’ ধরনের অভিযান চলছে। যার ফলে সরকারি কাঠামোর ভেতরে অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। স্যামুয়েল পি হান্টিংটন বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে অস্থিরতা অনিবার্য।’ আজ সেটিই দৃশ্যমান।
বর্তমান সরকারের সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। কিন্তু ভোটের চিত্র ভিন্ন। ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে সরকার। এর মধ্যে একটি অংশ আওয়ামী লীগ থেকে এসেছে। সংখ্যাটা কম করে হলেও ২০ শতাংশ। বিএনপির থাকলো ২৯ শতাংশ। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোটের প্রাপ্ত ভোট ৩৯ শতাংশ। এটি নির্দেশ করে- সরকারি দলের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে গেছে ছাত্রদল ও শিবিরের কার কেমন অবস্থা? সবকটিতে বিজয়ী হয়েছে শিবির। এর অর্থ একটাই তরুণদের কাছে ছাত্রদল নয়, শিবিরই বেশি জনপ্রিয়। ছাত্রদল পিছিয়ে। ছাত্রশিবির এগিয়ে। এর মানে-তরুণদের মনোভাব বদলেছে। এই বাস্তবতায় সংঘাত বাড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ।
দেশ এখন অর্থনৈতিক চাপে। জ্বালানি সংকট। বিদ্যুৎ সমস্যা। মূল্যস্ফীতি। মানুষের কষ্ট বাড়ছে। এমন সময়ে সংঘাত কেন? চারটি সম্ভাব্য কারণ- ১. জনদৃষ্টি সরানো, ২. ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ, ৩. ভয় তৈরি, ৪. মিডিয়াকে ব্যস্ত রাখা। মূল ইস্যু আড়াল করা। নোয়াম চমস্কি বলেছিলেন, ‘ক্ষমতা সবসময় বর্ণনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।’ আজ সেই লড়াই চলছে-বর্ণনার ওপর।
এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটেছে। পানিসম্পদ মন্ত্রী ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সংসদে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন- বর্তমান ছাত্ররাজনীতি তরুণ প্রজন্ম পছন্দ করছে না। তিনি সতর্ক করেছেন- অস্ত্রের রাজনীতি ফিরছে। চাপাতি, রামদা, হকিস্টিকের সংস্কৃতি। তার বক্তব্যের মূল বার্তা স্পষ্ট- ছাত্ররাজনীতি এখন সংকটে। এটি শুধু ক্যাম্পাসের সমস্যা নয়। এটি জাতীয় ইস্যু। এই আহ্বানকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। কারণ সংসদই হলো রাজনৈতিক সমাধানের জায়গা।
বর্তমানে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ‘হত্যাযোগ্য’ ডিসকোর্স তৈরি করার চেষ্টা চলছে। এটি ভয়বহ ও বিপজ্জনক প্রবণতা। আরো উদ্বেগজনক বিষয়- একটি নতুন ভাষা তৈরি হচ্ছে। কিছু গোষ্ঠীকে ‘অবাঞ্ছিত’, ‘বিতাড়নযোগ্য’ বলা হচ্ছে। ‘নির্মূলের’ ডাক দেওয়া হচ্ছে। এটি শুধু রাজনৈতিক ভাষা নয়। এটি সহিংসতার পূর্বাভাস। কার্ল শ্মিট বলেছিলেন, ‘রাজনীতি তখনই বিপজ্জনক হয়, যখন প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখা হয়।’ বাংলাদেশ এখন সেই সীমারেখায় দাঁড়িয়ে। ইতিহাসে এমন ভাষা সবসময় ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে। জুলাই বিপ্লব তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এসবের জন্য দায় কার? প্রশ্নটি সরাসরি। প্রথমত, সরকার। আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, ছাত্রদল। তাদের নিজেদের সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রযন্ত্র। নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।
এই সংঘাতের পেছনে কি তৃতীয় পক্ষ আছে? এই প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গুজবের ধরন। উস্কানির ভাষা। সময়ের মিল। সব মিলিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। ইতিহাস বলে-বিভাজন তৈরি করে লাভ নেওয়া নতুন কিছু নয়। সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন-এই আচরণ কি ফ্যাসিস্ট প্রবণতার লক্ষণ? চারটি লক্ষণ স্পষ্ট-১. ভিন্নমত দমন, ২. গুজবকে অস্ত্র করা, ৩. সহিংসতা ও ৪. মিডিয়াকে টার্গেট করা। এই চারটি মিললে সতর্ক হতে হয়। ফ্যাসিস্ট বেনিতো মুসোলিনির রাজনীতিতে এই বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট ছিল।
ইতিহাস শেখায়-এই পথে গেলে শেষ ভালো হয় না। সামনে পথ কী? সমাধান কী? প্রথমত, সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা। শুধু বক্তব্য নয়, নীতিনির্ধারণ। দ্বিতীয়ত, ছাত্ররাজনীতির সংস্কার। অস্ত্রমুক্ত ক্যাম্পাস। তৃতীয়ত, গুজববিরোধী শক্তিশালী ব্যবস্থা। চতুর্থত, স্বচ্ছ তদন্ত। দোষীদের শাস্তি। পঞ্চমত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা।
বাংলাদেশ এখন একটি সন্ধিক্ষণে। একদিকে সংঘাত। অন্যদিকে সংস্কারের সম্ভাবনা। ছাত্ররাজনীতি এই দেশের ইতিহাসের অংশ। এটি পরিবর্তনের শক্তি। কিন্তু সেটি যদি সহিংসতায় ডুবে যায়- তাহলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। অ্যরিস্টোটল বলেছিলেন, ‘মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী। কিন্তু সেই রাজনীতি যদি নৈতিকতা হারায়- তাহলে সেটি ধ্বংস ডেকে আনে। সময় এখনও আছে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গুজব না সত্য? সহিংসতা না সংলাপ? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে-বাংলাদেশ কোন পথে যাবে।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।