৪র্থ ও শেষ কিস্তি
গত তিন সপ্তাহ ধরে আমরা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধান নিয়ে আলোচনা করে আসছি। আমি আলোচনার যতই গভীরে যাচ্ছি ততই বিমুগ্ধ হয়ে পড়ছি। অনেকগুলো মুসলিম দেশের সংবিধান আমি পড়ার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর আদলে প্রণীত ইসলামী সংবিধান বলতে একমাত্র ইরানী সংবিধানই এরই পদবাচ্য বলে আমার মনে হয়। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত দিকনির্দেশনা খোলাফায়ে রাশেদীনের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত এবং মুসলিম মিল্লাতের ইমাম ও ফকীহদের ইজমা-কেয়াসকে পাথেয় হিসেবে গণ্য করলে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ইরানের সংধিানকে ইসলামী উপাদানে সমৃদ্ধ একটি সংবিধান বলতে আমার দ্বিধা নেই। এ প্রেক্ষিতে আমাদের অর্থাৎ ৯২ শতাংশ মুসলমানের বাসভূমি বাংলাদেশের আলেম-উলেমা, রাজনৈতিক দলসমূহের নেতাকর্মী এবং রাজনৈতিক গবেষকদের অনেক কিছু শেখার আছে বলে মনে হয়। আমরা অনেকেই বিরোধিতার খাতিরে যেমন বিরোধিতা করি, আবার না জেনেও বিরোধিতা করি, যা পবিত্র কুরআনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে (লাতাকফু মা লাইসা লাকা বিহি এলম)।
এখন আবার ইরানী সংবিধানের চতুর্থ অধ্যায়ের অর্থনৈতিক চ্যাপ্টারে ফিরে যেতে চাই।
ইরান বিশাল একটি দেশ, আয়তন ১৬,৪৮,১৯৫ বর্গকিলোমিটার, বাংলাদেশের তুলনায় ১১ গুণের বেশি বড়; আমাদের আয়তন ১,৪৭,৫৬০ বর্গকিলোমিটার মাত্র। পাহাড়-পর্বত, সমতল ভূমি, মালভূমি, লবণসমৃদ্ধ মরুভূমি, বনভূমি ও উপত্যকা, নদীনালা, হ্রদ, সমুদ্র নিয়ে বি”িত্র তার গঠন। এগুলো তার সম্পদও। এ সম্পদকে রক্ষা করা এবং টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে (Sustainable use) জনকল্যাণ নিশ্চিত করার যাবতীয় বিধান ইরানী সংবিধানে সংযোজন করা হয়েছে। এর ৪৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে জনস্বার্থে ব্যবহারের জন্য সকল সরকারি সম্পদ ও সম্পত্তি বিশেষ করে ঝিল অথবা পরিত্যক্ত ও অব্যবহারযোগ্য জমি, গচ্ছিত খনিজ সম্পদ, সমুদ্র, হ্রদ, নদীসহ যাবতীয় জলপথ, পর্বত, উপত্যকা, বনভূমি, জলাভূমি, খোলামেলা চারণভূমি, উইল বলে প্রাপ্ত ও বর্তমানে উত্তরাধিকারবিহীন সম্পত্তি, দখলমুক্ত সম্পত্তি, প্রভৃতি ইরান সরকারের ওপর ন্যস্ত থাকবে। উপরোক্ত সম্পত্তিসমূহের প্রত্যেকটি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে। ৪৬নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার বৈধ ব্যবসা ও শ্রমের সুফল ভোগের অধিকারী ও মালিক এবং কোনো অজুহাত দেখিয়ে তাদের এই অধিকার ও মালিকানা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। ৩৭নং অনুচ্ছেদে ব্যক্তিমালিকানার অধীনে বৈধভাবে অর্জিত সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করেছেন এবং এ ধরনের মালিকানাকে সম্মান করতে বলা হয়েছে।
৪৮নং অনুচ্ছেদে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, সরকারি রাজস্বের ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বণ্টন ও পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রদেশ ও অঞ্চলসমূহের মধ্যে যাতে বৈষম্য সৃষ্টি না হয় তার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
৪৯নং অনুচ্ছেদে সুদের ব্যবসা, জবরদখল, ঘুষ-রিবাওয়াত, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মদের ব্যবসা ও জুয়া, সরকারি চুক্তি ও লেনদেন, অবৈধ চুক্তি, খাস জমি বিক্রি, অনৈতিক পেশা যেমন বেশ্যাবৃত্তি প্রভৃতির মাধ্যমে অর্জিত ও প্রাপ্ত সকল অর্থ ও সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পাারবেন; তবে এই বিধানটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকারকে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ইসলামী আইনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নিরপেক্ষতা অবলম্বন, তদন্ত অনুষ্ঠান ও সাক্ষ্যপ্রমাণ প্রাপ্তির ভিত্তিতেই এ বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে কোনো নিরপরাধ লোক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ৫০নং অনুচ্ছেদে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধ পরিবেশের সংরক্ষণ ও দূষণমুক্ত বাসভূমিকর নিশ্চয়তা প্রদান সরকারের দায়িত্ব। যে সমস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত পরিবেশ দূষণের সাথে সম্পৃক্ত এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রাণীমণ্ডলের ক্ষতি সাধন করে সেসব কর্মকাণ্ড ইসলামী প্রজাতন্ত্রে নিষিদ্ধ থাকবে। ৫১নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূতভাবে কোনো প্রকার করারোপ করা যাবে না এবং কেউ কারুর কাছ থেকে চাঁদার নামে কোনো অর্থ আদায় করবেন না। কর অব্যাহতি ও কর হ্রাসের সিদ্ধান্ত সরকারের বৈধ কর্তৃপক্ষই গ্রহণ করবেন। ৫২নং অনুচ্ছেদে বার্ষিকবাজেট তৈরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলোচনা ও অনুমোদনের জন্য ইসলামী পরামর্শ পরিষদ বা শূরা পারিষদের কাছে পেশ করার দায়িত্ব সরকারের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। ৫৩নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকার কর্তৃক প্রাপ্ত ও গৃহিত সকল অর্থ কেন্দ্রীয় বায়তুলমালে (ট্রেজারি) জমা হবে এবং অনুমোদিত বরাদ্দের ভিত্তিতে বণ্টন করা হবে। ইসলামী শূরা, কাউন্সিলের অধীনে একটি ন্যাশনাল একাউন্টিং এজেন্সি থাকবে এবং তেহরান ও প্রাদেশিক রাজধানীসমূহে বিধিসম্মতভাবে তার কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
৫৫নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারের সকল মন্ত্রণালয়, দফতর, অধিদফতর, প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির যাবতীয় হিসাব ও লেনদেন যথাযথ আইন অনুসরণ করে পরিচালিত হয়েছে কিনা, ব্যয়ের পরিমাণ বরাদ্দের তুলনায় বেশি কিনা অথবা যথাযথ খাতে তা ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা অডিট করে দেখার দায়িত্ব ন্যাশনাল একাউন্টিং এজেন্সির। লেনদেন পরিচালনা ও হিসাব সংরক্ষণ অনুসৃত ও আন্তর্জাতিক মান সংরক্ষণ, ভুলভ্রান্তি চিহ্নিতকরণ, দুর্নীতি ও অপচয় নির্ণয় ও তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রভৃতি বিষয়ে এই এজেন্সি শূরা কাউন্সিলের নিকট তাদের মন্তব্য ও সুপারিশ পেশ করবে। তাদের রিপোর্ট ও তার আলোকে সরকার কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থাবলীর বছরওয়ারী অবস্থান জনগণের অবগতির জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
ইরানী সংবিধানের পঞ্চম পরিচ্ছেদে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় সূচিত হয়েছে। এটি সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত। এতে বলা হয়েছে, মানুষসহ সমগ্র মখলুকাত আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন এবং তার মলিক আল্লাহ, সার্বভৌমত্ব আল্লাহর। আল্লাহ তার সামগ্রিক সার্বভৌমত্বের অধীনে মানুষকে কিছু ক্ষমতা ও অধিকার প্রদান করেছেন যা তারা তার প্রতি জবাবদিহিতা সাপেক্ষে প্রয়োগ করতে সক্ষম। সংবিধানের ৫৭নং অনুচ্ছেদে এ প্রয়োগ প্রক্রিয়াকে সংজ্ঞায়িত করে দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্রে সরকারের ক্ষমতা আইনসভা ও বিচারবিভাগের ওপর ন্যাস্ত থাকবে এবং ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি বিলায়েত আল আমর ও উম্মাহর নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে তা প্রয়োগ করা হবে।
৫৮নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত শূরা কাউন্সিলের মাধ্যমে আইন সভার কার্যাবলী পরিচারিত হবে। শূরা কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদিত যাবতীয় আইন ও বিধি বিধান বাস্তবায়নের জন্য নির্বাহী ও বিচারবিভাগের নিকট প্রেরণ করা হবে। অনুচ্ছেদ ৫৯ অনুযায়ী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়সমূহ আইনসভার মাধ্যমে সরাসরি ও গণভোটে জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। জনগণের মতামত নেয়া সংক্রান্ত এ ধরনের প্রস্তাব ইসলামী শূরা কাউন্সিলের দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের ভিত্তিতে পাস হতে হবে। ইসলামী শরীয়ার মানদণ্ডের ভিত্তিতে গঠিত আদালতে বিচারবিভাগীয় সকল মামলার নিষ্পত্তি হতে হবে। এক্ষেত্রে বিচারবিভাগ নির্বাহী বিভাগের সকল প্রভাবমুক্ত থাকবে।
সংবিধানের ষষ্ঠ অধ্যায়ে ইসলামী শূরা পরিষদের গঠন প্রণালীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ৬২ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, জনগণের সরাসরি ও গোপন ব্যালটে এ পরিষদ গঠিত হবে। নির্বাচনের ধরন, ভোটার ও প্রার্থীদের যোগ্যতা প্রভৃতি আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে। ৬৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, এ পরিষদের মেয়াদ হবে চার বছর এবং মেয়াদপূর্তির আগেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে দেশ কখনো শূরা পরিষদ বিহীন না থাকে। এতে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি নির্বাচনের কথাও বলা হয়েছে। জোরাষ্ট্রিয়ান ও ইহুদীরা প্রত্যেকে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন, এসেরিয়ান ও ক্যালডিয়ান খৃস্টানরা যৌথভাবে একজন এবং উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের আর্মেনিয়ান খৃস্টানরাও প্রত্যেকে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবেন। এ পরিষদ তাদের বিধি বিধান অনুযায়ী স্পীকার নির্বাচন ও অন্যান্য কাজ সম্পাদন করবেন।
ইসলামিক কনসালটেটিভ এসেমব্লির সদস্যরা তাদের প্রথম অধিবেশনেই নিম্নোক্তভাবে শপথ বাক্য পাঠ করবেন :
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম। পবিত্র কুরআন সামনে রেখে আমি সর্বশক্তিমানা আল্লাহর নামে তাকে হাজির নাজির জেনে শপথ করছি যে, আমি অক্ষরে অক্ষরে ইরানীয় ইসলামী বিপ্লবের পবিত্রতা রক্ষা করবো, তার স্পিরিট ও মর্যাদার পাহারাদার হবো, তার সাফল্য ধরে রাখবো এবং আরো প্রসারিত ও বিকশিত করতে বদ্ধপরিকর থাকবো। জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে দেশের স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা রক্ষায় সর্বদা নিয়োজিত রাখবো এবং একজন আমানতদার হিসাবে (ট্রাস্টি) জনগণের, দেশের ও মানবতার স্বার্থকে পাহারায় রত থাকবো। দেশের সংবিধানকে রক্ষা করবো এবং কথা ও কাজে সামঞ্জস্য রাখবো। সর্বদা দেশের ও ইসলামের স্বার্থকে সম্মান করবো।’ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ সামনে রেখে শপথনামা পাঠ করবেন।
ইরানের সংবিধানের মোট ৯২টি অনুচ্ছেদ আছে। ৯১ নং অনুচ্ছেদে শূরা পরিষদ কর্তৃক পাসকৃত যাবতীয় আইন ও বিধি বিধান ইসলামী অনুশাসন ও বিধি বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা পরীক্ষা নিরীক্ষার উদ্দেশ্যে একটি অভিভাবক পরিষদ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এ পরিষদের গঠন প্রণালী নিম্নরূপ হবে :
সুপ্রীম লিডার কর্তৃক মনোনীত ছয়জন ‘আদিল ফুকাহা’ যারা বর্তমান বিশ্ব সমস্যা ও চাহিদা এবং ইসলামী সমাধান সংক্রান্ত জ্ঞানে সমৃদ্ধ হবেন।
বিচার বিভাগের প্রধান কর্তৃক মনোনীত ছয়জন আইনজ্ঞ (জুরিস্ট) যারা ইসলামী শূরা কাউন্সিল কর্তৃকও নির্বাচিত হবেন এবং ইসলামের ফৌজদারী, দেওয়ানী, পারিবারিক, সামাজিক, বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অধিকারী হবেন।
অভিভাবক পরিষদের মেয়াদ ৯২নং অনুচ্ছেদে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ছয় বছর মেয়াদি এ পরিষদ অর্ধেক অর্থাৎ তিন বছর পার করার পর লটারির ভিত্তিতে অর্ধেক সদস্য অবসর নিবেন এবং তাদের স্থলে নতুন সদস্য নির্বাচিত হবেন।
ইরানী সংবিধান একটি অনন্য ইসলামী সংবিধান হিসেবে মুসলিম দেশগুলোর সামনে একটি দৃষ্টান্ত বলে আমি মনে করি। এখানে শিয়া সুন্নীর কথা নেই, আছে কুরআন সুন্নাহর আইন বাস্তবায়নের কথা। বিদায় হজে¦ রাসূল (সা.) বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের কাছে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি, একটি আল্লাহর কুরআন আরেকটি আমার সুন্নাহ। তোমরা যদি এগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন না হও, আঁকড়ে ধরে থাকো তা হলো দুনিয়ার কোনও শক্তি তোমাদের ধ্বংস করতে পারবে না।’ (সমাপ্ত)