বেশ কয়েক বছর আগের কথা। স্কুল ব্যাগ ঘাড়ে চাপিয়ে রাজকন্যার হাত ধরে মিরপুরের এমডিসি মডেল একাডেমির দিকে ধিরস্থিরভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। এটিই ছিলো এ স্কুলে তার অভিষেক পর্ব। জীবনের প্রথম স্কুল ব্যাগ কাঁধে চাপিয়েছি। প্রাইমারী পর্যায়ে রাজকুমারীর লেখাপড়ার দেখভাল মহারাণীই করতেন। তাই কখনো স্কুল ব্যাগের বোঝা বহনের সুযোগ পাইনি বা প্রয়োজন হয়নি। পায়ের ওপর পা দিয়ে নবাবীটা তখন ভালোই করেছি; একেবারে নবাব সিরাজের মত স্বাধীনভাবেই। কিন্তু মাধ্যমিকের শুরুতেই সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। নবাবীটা আর আগের মত নেই। অবশ্য আমাদের সময়ে স্কুল ব্যাগ কালেভদ্রেও চোখে পড়তো না। আমি স্কুলে যেতাম একটা রাবারের ঝুড়ি নিয়ে। এখনকার মত পরিচ্ছদের প্রাচুর্যও ছিলো না আমাদের। মাধ্যমিকে জুতার ব্যবহার খুব কমই দেখা যেতো। এসব কথা এখন আর কারো কাছেই বিশ্বাসযোগ্য নয় বরং কল্পকাহিনী বা নতুন প্রজন্মকে সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অশুভ অভিপ্রায় হিসাবেই বিবেচিত হয়। কারণ, ‘গুজরা হুয়া জামানা, আতা নাঁহি দোবারা’। এটিই বাস্তবতা।
স্কুলটা বাসা থেকে খুব দূরে নয়। তাই রিক্সায় চাপা বা কোন বাহনের প্রয়োজন হয় নি। ওকে নিয়ে হাটছিলাম বেশ ধীরস্থির ও শান্তভাবেই। পথিমধ্যে ‘আকলিমা জেনারেল হাসপাতাল প্রাঃ লিঃ’ লেখা একটা সাইনবোর্ড আমার চোখে পড়লো। তা রাজকুমারীর দৃষ্টিও এড়ায়নি। বেশ গভীরভাবেই তাকিয়ে ছিলো সাইনবোর্ডের দিকে। তার মুখে মৃদূ হাসি লক্ষ্য করলাম। মাথাটা নিচু করে আমার হাত শক্ত করে ধরেই স্কুলের দিকে যাত্রা শুরু করলো। রহস্যটা বেশ রহস্যাবৃতই থেকে গেলো আমার কাছে।
নিজেকে সম্রাট ভাবতেই বেশ স্বাচ্ছন্দবোধ করি। এতে কে কী ভাবলো তা বড় কথা নয় বরং এতে নিজেকে নিজেই যেমন সম্মানিত করা হয়, ঠিক তেমনি কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করাও সহায়ক হয়ে ওঠে। কারণ, আগের দিন আর নেই। তাই নিজের ঢোল নিজেই পেটাতে হয়। এর মাধ্যমে শুধু নিজেকেই সস্মানিত করা হয় না বরং একজনকে বা ক্ষেত্র বিশেষে কয়েকজন সম্রাজ্ঞীর আসনে অধিষ্ঠিত করা যায়। আন্ডা-বাচ্চারাও হয়ে ওঠে প্রিন্স; প্রিন্সেস। আর সবই যখন কল্পরাজ্যের স্বপ্নপুরীর উপাখ্যান, তাই একটু বাহুল্য তো দোষের কিছু নয়। ভোজনটা যখন স্বপ্নের তখন কম খাওয়ার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই।
আমার কোম্পানীতে তিন রাজকুমারের পর এক রাজকুমারীর আবির্ভাব ঘটেছে। যা ছিলো আমার কাছে খুবই আরাধ্য ও কাক্সিক্ষত। এর আগে একটা শুণ্যতাবোধ থেকে মহারাণীকে মাঝে মাঝে খোঁটা দিতে বা উত্তক্ত করতে কসুর করতাম না। কিন্তু তিনি রহস্যের হাসি হেসে সবকিছু উড়ে দিতেন। কারণ, কৈশোরের প্রারম্ভেই সম্রাজ্ঞী হয়ে ওঠা এখন রীতিমত সর্বংসহা। কোন কিছুতেই তাকে বিব্রত করা আমার পক্ষে সহজসাধ্য ছিলো না। যাহোক দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সে মহেন্দ্রক্ষণ হাজির হয়েছিলো। আমার সম্রাজ্যের অপূর্ণতা দূর হয়েছিলো নিমিষেই। যা আমার পুরো সম্রাজ্যকেই আলোকিত, বর্ণাঢ্য ও ছন্দময় করে তুলেছিলো। আগমনের দিক থেকে সর্বকনিষ্ঠ হলেও পাণ্ডিত্য, মুন্সিায়ানা ও বুদ্ধিচর্চার দিক থেকে বেশ সমৃদ্ধ মনে হয় আমার কাছে। মাঝে মাঝে ভাবতাম তার রূহটা হয়তো আমার আগেই পয়দা করা হয়েছে। আমি তার কাছে দুগ্ধজাত শিশু বৈ কিছু নয়। মাঝে মাঝে মহারাণীর কাছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে শুনেছি, আমি নাকি খুবই স্বল্পবুদ্ধির মানুষ; একেবারে সেকেলে। আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে আমি একেবারে ব-কলম। তাই আমাকে দিয়ে যুগের চাহিদা পুরুণ কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমি একটা স্মার্টফোন ব্যবহার করলেও এর সঠিক ব্যবহার নাকি জানি না; শুধুই কল দেওয়া-নেয়া ছাড়া। বিষয়টি নিয়ে তার অনুযোগের কোন শেষ নেই এখনো।
এ ফোন দিয়ে নাকি অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। আমি এসব কথার মাথামুণ্ড কিছুই বুঝি না। মাঝে মাঝে ভাবি, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি মোটা হলো কী করে ? অবশ্য এমন অভিজ্ঞতা আমার জন্য নতুন কিছু নয়। একদিন কোন বিষয়ের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে নানী ও মামার মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছিলো। মামা তো এক সময় কোন রাখঢাক না করেই বলেই ফেললেন, ‘তুমি এসব কী জানো। তোমার আর ক’দিন বয়স হয়েছে’? মামার কথায় নানী হেসে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ! তোমার চেয়েও কম’। না হেসে কোন উপায় ছিলো না কারো। অবশ্য প্রযুক্তি ও আইটি বিষয়ক যেকোন সমস্যার সমাধানে তার দারস্থই হতে হয় আমাকে। সবকিছুর সমাধান পেয়ে যাই অতিসহজেই; অবলীলায়। আমার লেখাজোখা নিয়ে মাঝে মাঝে কিছু টিপস দিয়ে আমাকে সমৃদ্ধ করার সাধ্যমত চেষ্টা করে। তখন আমার চেয়ে তার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে কোন সমস্যা হয় না। বাস্তবতাকে অস্বীকার করিই বা কী করে ? অবশ্য এখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছে। পুরোদস্তুর লেখিকা। বড় শিরোনামে লেখা ছাপা হয় বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায়।
অবশ্য আমার নিজের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রীতিমত ধাত সওয়া হয়ে গেছে। মহারাণীর কাছেও আমি একেবারে অচল ও অথর্ব মানুষ। দুনিয়াদারীর অযোগ্য, মাথায় কিছু নেই; একেবারে গোবরে পরিপূর্ণ। তার বিবেচনায় আমার বিংশ শতাব্দীতে জন্ম না হয়ে খ্রীস্টপূর্ব কোন এক সময়ে জন্ম হওয়া উচিত ও কাক্সিক্ষত ছিলো। আমি হেসেই উড়িয়ে দিই সবকিছু। কারণ, ‘নাকেস আকল’-এর সাথে যুদ্ধ-সংগ্রাম করা মোটেই নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক নয়; আত্মঘাতি হওয়ার সম্ভবনাই বেশি। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুনিয়াতে যত রাজা-বাদশার উত্থান-পতন ঘটেছে সবই মহারাণীদের অঙ্গলী হেলনেই। তাই ঝুঁকি নেয়া মোটেই সঙ্গত মনে করি না। কারণ, ইতিহাসে রাজা ও রাণীর মধ্যকার বিবাদ, অবিশ্বাসের পরিবেশ বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল অনেক শক্তিশালী রাজ্যের পতনের কারণ হয়েছে। রাজা-রাণীর বিবাদে যেসব রাজ্যের পতনের উদাহরণ পাওয়া যায়-
জেরুজালেম রাজ্য (Kingdom of Jerusalem : রাজা ও রাণী মেলিসেন্ডের অভ্যন্তরীণ শাসনক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব ক্রুসেডার রাজ্য হিসেবে জেরুজালেমের স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছিল।
চন্দ্রদ্বীপ রাজবংশ (বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ) : বাংলার দেববংশ ও দনুজমাধবের শেষ দিকের রাজারা অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং পরবর্তী সময়ে বাহ্যিক আক্রমণে বিলুপ্তির সম্মুখীন হন।
ভাওয়াল এস্টেট : যদিও এটি সরাসরি রাষ্ট্র ছিল না, কিন্তু ভাওয়ালের রাজা ও রাণীর পরিবারিক এবং পরবর্তী মেজরাণীর সাথে বিবাদের কাহিনী ভাওয়াল রাজবাড়ির পতনের অন্যতম কারণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
অ্যাংলো-স্যাক্সন ইংল্যান্ড : নবম শতাব্দীর শুরুতে ইংল্যান্ডে রাজা ও রাণীদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে অনেক ছোট রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটেছে।
সাধারণত রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ বিবাদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা উত্তরাধিকার নিয়ে ঝগড়া রাজ্যের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে, যা পরবর্তীকালে বহিঃশত্রুর আক্রমণের মাধ্যমে রাজ্যের পতনের পথ সুগম করে।
তারপরও আত্মপক্ষ সমর্থন করে মাঝে মাঝে বলেই ফেলি, ‘আমার বুদ্ধি বিক্রির উসিলায় পুরো সম্রাজ্যের অর্থনীতি সচল থাকে’। একথার কোন সদুত্তর পাই না। মৃদু হাসিতে মুখাবয়ব উজ্জল হয়ে ওঠে মহাসম্রাজ্ঞীর। তারপরও তো ছেড়ে কথা বলেন না বরং মাঝে মধ্যেই বলে বসেন, ‘দু’হরফ লেখাপড়া না শিখলে কপালে ভাতও জুটতো না’। মনে হয় আল্লাহ আমার রিজিকের ব্যবস্থা না করেই আসমান থেকে দুনিয়ায় টুপ করে সরাসরি ফেলে দিয়েছেন। দু’হরফ লেখাপড়া শেখার পর রিজিকের ব্যবস্থা। মজার ব্যাপার নয় কি ? যাক তারপরও সম্রাজ্ঞীর অমৃত বচন বলে কথা। উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করে কার সাধ্যি। তথাস্ত মনে করা ছাড়া তো উপাই তো দেখি না।
রাজা-রাণীর বিরোধ আত্মঘাতি এমন উপমা কোন কোন সময় পারিবারিক বিরোধ মিমাংসার জন্য খুবই সহায়ক হয়েছে আমার জীবনে। আমি কোন কোন ক্ষেত্রে এর সফল ব্যবহারও করেছি। একবার আমার এক নিকট প্রতিবেশী ‘বাবুল’ আমার কাছে বউ কর্তৃক প্রহৃত হওয়ার অভিযোগ কলেছিলো। এক মহাবীরের বীরত্বের উপাখ্যান বলে কথা। ক্ষতস্থান দেখিয়ে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলার পর আমার কাছে বিচার দাবি করে বসেছিলো। তার ধারণা আমি একরোখা মানুষ। তাই স্বামী পেটানোর মত গর্হিত কাজের একটা বিহীত করেই ছাড়াবো আমি। কিন্তু ক্ষতস্থান দেখে মনে হয়েছিলো প্রতিপক্ষ ‘রোকেয়া’ হয়তো আত্মরক্ষার জন্যই বাবুলের সাথে এমন আচরণ করেছে। কারণ, ভিকটিমের শরীরের কয়েকটা জায়গায় ছিলো খামচি কাটার দাগ, যা মেয়েদের অত্মরক্ষার অদ্বিতীয় অবলম্বন।
তার অভিযোগ শোনার পর আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘তুমি কী আগে তাকে মেরেছো’? বাবুল একথার সরাসরি কোন জবাব না দিয়ে রোকেয়ার বিরুদ্ধে লাগামহীন অভিযোগ করা শুরু করলো। আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, লড়াইয়ের সূচনা সে-ই আগে করেছিলো। হয়তো আষাঢ় মাসের ঝড়বৃষ্টি থেকে অত্মরক্ষা করতেই বেগম রোকেয়া তার শাখাওয়াত হোসেনের শরীরে খামচি দিয়ে বসেছিলো।
আমি তাকে পাশে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, ‘রাণীর সাথে এমন আচরণ মোটেই সঙ্গত হয়নি বরং তুমি মারাত্মক অন্যায় করে ফেলেছো। কারণ, রাণীর সাথে বিবাদে জড়ানো মোটেই নিরাপদ নয় বরং রীতিমত আত্মঘাতি। ইতিহাসে যত রাজা-বাদশার পতন হয়েছে সব রাণীর সাথে বিবাদ-বিসংবাদের কারণেই’। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ‘অন্যদের অবস্থাও তোমার চেয়ে আরো বেশি খারাপ। তুমি তো আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছো। আমরা তো মান-সম্মানের ভয়ে কারো কাছে অভিযোগও নিয়ে যেতে পরি না। সবকিছু নীরবে-নিভৃতে হজম করতে হয়’। শেষে তাকে সতর্ক করেই বললাম, যেকোন ভাবেই হোক তার সাথে একটা মিমাংসা হওয়ার দরকার। তাছাড়া তোমার জেলের ঘানি টানতেই জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। প্রয়োজনে কান ধরে ওঠবস করতে হলেও।
বাবুল চলে যাওয়ার সাথে সাথেই অভিযোগ নিয়ে এসেছিলো রোকেয়া। পুরো শরীরেই এলোপাথারী আঘাতের চিহ্ন। আমি তার কথাগুলো শুনেও না শোনার ভান করে কঠোরভাবেই বললাম, ‘স্বামী পিটিয়েছো ? তোমার সাহস তো কম না। বাবুর তোমাকে এখনো রেখেছে ? আমার বউ হলে তো এতোক্ষণ যমুনায় ভাসিয়ে দিতাম’। হয়তো আমার প্রয়োগ করা এন্টিবায়োটিক ঠিকমতই ক্রিয়াশীল হয়েছিলো। বিকেলেই তাদের মধ্যে সখ্যতা লক্ষ্য করেছিলাম; একেবারে কপোত-কপোতির আদলে।
যাহোক রাজকুমারীর মৃদু হাসির মর্মভেদ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সে চেষ্টাও করিনি আমি। সবকিছুর মর্মভেদ করাও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, কোন বিষয়ের ব্যাখ্যা এক বা একক হয় না; বরং প্রায় ক্ষেত্রেই ভিন্নতর হয়ে থাকে। মানুষের চিন্তা-চেতনা, বোধ-বিশ্বাস, আবেগ-অনুভূতি, মেধা-প্রজ্ঞা-অভিজ্ঞান অনুযায়ী ভিন্নতর হতে পারে। আবার ব্যাখ্যার নামে অপব্যাখ্যাও কম হয় না। এমনটি হলে তা হয়ে ওঠে বাস্তবতার সাথে সাঘর্ষিক। অনেক সময় ইগোও বাস্তবতা উপলব্ধি করতে প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। আর এটি তো মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যা ব্যক্তি, পারিবার ও সামাজিক ক্ষেত্রে সৃষ্টি করতে পারে নৈরাজ্য। সৃষ্টি হয় নানাবিধ ফিৎনা-ফাসাদ। শুরু হয় পরষ্পরের মধ্যে হানাহানি ও বিবাদ বিসংবাদ। সামান্য ভুল বোঝাবোঝির কারণে সৃষ্টি হয় যোজন যোজন দূরত্ব।
এ বিষয়ে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনা নিয়ে রচিত ফজলু বয়াতির একটা গানের কথা উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যায়। ‘সরকারি ডাক্তার খানা গরীব গেলে ওষুধ পায় না... হাগা হলে সাদা বড়ি, পেট বিষালে সাদা বড়ি, জ¦র আসিলে সাদা বড়ি, নিমোনিয়ার সাদা বড়ি, মেহ হলে সাদা বড়ি, শরীর দুর্বলার সাদা বড়ি, পায়খানাতে সাদা বড়ি; খাইলে হাগা বেশি হয়-আর কী আমরা দেখবো দুনিয়ায়, মুখে আল্লাহ-রাসূল বলো ভাই; আর কি আমরা দেখবো দুনিয়ায়’।
জ্ঞান, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার বিচারে এ গানের কথাগুলোর নানাবিধ ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এর নানাবিধ কারণও রয়েছে। আমাদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসা প্রার্থীদের জন্য মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। আবার দুর্নীতি তো রয়েছেই। আর ফজলু বয়াতির ভাষায় সকল রোগের একই ওষুধ বিষয়টির ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এমনও হতে পারে যে, ওষুধটি সব রোগের জন্য সমানভাবে ক্রিয়াশীল। যেহেতু আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাই হয়তো বিকল্প হিসাবে এমন ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, যা সকল রোগের জন্যই কিছুটা হলেও উপসমকারী। আর ওষুধের রং একই হওয়াও একই কার্যকারিতার (Functionality) পরিচয় বহন করে না বরং একই রঙয়ের ওষুধের ভিন্ন কার্যকারিতার নানাবিধ ‘ট্রেড ন্যাম’ থাকতে পারে। যা ফজলু বয়াতির উপলব্ধির কথা নয়।
প্রথম দিন স্কুল শেষে বেশ উৎফুল্ল হয়েই বাড়ি ফিরেছিলো রাজকুমারী। মুখে কিছু না বললেও তেমনটিই মনে হয়েছিলো আমার কাছে। পথিমধ্যে ফুরফুরে মেজাজই লক্ষ্য করা গেছে। বাসায় ফেরার পর প্রথম দিনের স্কুলের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছিলো মহারাণীর কাছে। সে অবলীলায় আত্মস্বীকৃত দিয়ে বলেছিলো, ‘দাদি তো কোন খারাপ কথা বলেন নি। আকলিমা তো মানুষের নাম। রাস্তায় আকলিমা নামে হাসপাতাল, স্কুলে এক ম্যাডামের নামও আকলিমা’।
আমি তার কথার মাথামুণ্ড কিছুই বুঝতে পারলাম না। হয়তো মহারাণী কিছুটা উপলব্ধি করেছিলেন। পরে জানলাম, যে কারণেই হোক মা তাকে একদিন ‘আকলিমা’ বলে সম্ভোধন করেছিলেন। বিষয়টি রাজকুমারীর পছন্দ হয় নি বরং এটি শক্ত গালি মনে করেছিলো। রাগে, ক্ষোভে ও অভিমানে সে নাকি মা’র সাথে দীর্ঘদিন ঠিকমত কথাবার্তাও বলতো না।
মূলত, আকলিমা ছিলেন নানির খালাতো বোনের মেয়ে আমার এক খালা। শেষ জীবনে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতেন। মা হয়তো মজা করে ‘আকলিমা’ বলে সম্ভোধন করায় রাজকুমারী অভিমান করে বসেছিলো। কিন্তু এখন... ...!
www.syedmasud.com