প্রতিবারের মতো চলতি অর্থবছরেও ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হবে এটা মোটামুটি পূর্ব থেকেই ধারণা করা গিয়েছিল। তবে ব্যর্থতা যে এতটা গভীর হবে তা অনুমান করা যায়নি। বাংলাদেশে একটি রীতি হচ্ছে প্রতিবছর এনবিআর’র জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। বছরান্তে এনবিআর তার অর্জনে ব্যর্থ হয়। কিন্তু এ ব্যর্থতার দায়ভার দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকেই বহন করতে হয় না। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই এই ব্যর্থতার বোঝা বহন করতে হয়। রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার জন্য দায়ী হচ্ছেন যারা প্রতিবছরের ব্যর্থতার পরও পরবর্তী বছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেন। কারণ তারা দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। এ জন্য তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী হচ্ছেন এনবিআরের সেই সব কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা রাজস্ব আদায়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। রাজস্ব^ আদায়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি সঠিকভাবে তাদের কর্তব্য সম্পাদন করতেন তাহলে প্রতিবছর প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যর্থতার দায়ভার বহন করতে হতো না।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) এর পরামর্শে এনবিআরে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির এক শ্রেণীর কর্মকর্তা আন্দোলন শুরু করে। ফলে বেশ কিছুদিন এনবিআরের কার্যক্রম বলতে গেলে অচল হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ যখন আন্দোলনকারী কয়েকজন নেতাকে রাজধানীর বাইরে বদলি করেন এবং তাদের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক অনুসন্ধানের উদ্যোগ গ্রহণ করে তখন তারা আন্দোলন বন্ধ করে দেয়। সে সময় প্রকাশিত খবর থেকে জানা গিয়েছিল আন্দোলনকারিদের কেউ কেউ নাকি ব্যক্তিগতভাবে এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ক্ষমা চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের এ হেন আচরণ কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সরকারি চাকরিবিধি মোতাবেক, কোন কর্মকর্তা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে পারেন না। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমনকি কর্মকর্তাগণ কর্তৃপক্ষের নিকট সংঘবদ্ধভাবে কোন দাবি জানাতে পারেন না। তারা কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধ করতে পারেন মাত্র। আন্দোলনে কারণে এনবিআরের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কারণে চলতি অর্থবছরে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের এ ব্যর্থতার দায়ভার এখন সরকারকেই বহন করতে হবে।
অর্থবছরের (২০২৫-২০২৬) প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) এনবিআর যে রাজস্ব আদায় করেছে তার পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা কম। রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে এটি একটি রেকর্ড। কারণ অতীতে আর কখনোই রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এত বিপুল পরিমাণ ঘাটতি সৃষ্টি হয়নি। গত অর্থবছরের (২০২৪-২০২৫) পুরো সময়ে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বার পুরো অর্থবছরে যে পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি হয়েছিল এবার ৯ মাসেই তা অতিক্রম করে গেছে। চলতি অর্থবছরের নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এপ্রিল, মে এবং জুন মাসে গড়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে। আইএমএফ আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বাংলাদেশের অনুরোধের প্রেক্ষিতে ৪শ’ ৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে। মোট ৬ কিস্তিতে এই ঋণের অর্থ ছাড়করণের কথা। সংস্থাটির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ঋণের আগামী কিস্তি ছাড় পাবার জন্য আলোচনা করছে। কিন্তু আইএমএফ এখনো ঋণের আগামী কিস্তি ছাড়করণের ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়নি। তারা বলছে, ঋণের আগামী কিস্তি পেতে হলে সরকারকে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে।
উল্লেখ্য, আইএমএফ’র একটি শর্ত ছিল এনবিআরকে দু’ ভাগে ভাগ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানো। কিন্তু এনবিআর সেই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এনবিআর আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) এবং আয়কর এ তিন খাতের কোনটিতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকার মধ্যে এনবিআর আদায় করেছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। বর্ণিত সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে আয়কর খাতে। ৯ মাসে আয়কর খাতে ঘাটতি হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। আমদানি খাতে ঘাটতি হয়েছে ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। আর মূল্য সংযোজন কর খাতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ে অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে কোনো বছরই কাক্সিক্ষত মাত্রায় রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। বর্তমানে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৭ শতাংশের নিচে। অথচ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও অন্তত ১২ শতাংশ হওয়া উচিৎ। এনবিআরের মতিউর রহমান ছাগল কাণ্ডে বিতর্কিত হবার আগ পর্যন্ত আমরা এনজিআরের এক শ্রেণীর কর্মকর্তার চরিত্র সম্পর্কে জানতে পারিনি। মতিউর রহমান আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এনবিআরে চাকরি করলে কিভাবে অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়া যায়। এনবিআরে মতিউর রহমানদের সংখ্যা কম নয়। এদের ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন দ্বারা ভালোভাবে অনুসন্ধান চালানো যেতে পারে। আর যারা আন্দোলনের নামে এনবিআরের কার্যক্রমকে অচল করে দিয়েছিলেন সেই সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনো কোন দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কেন নেয়া হচ্ছে না?
এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতার কারণে দেশের কর ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হতে শুরু করেছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা যদি রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারেন তাহলে তাদের কেন শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে না? নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এখন নানা ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণভাবে অর্থ সংগ্রহ করা না গেলে সরকারকে বাধ্য হয়ে বিদেশী সূত্র থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ২০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছেপেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই টাকা সরকার ঋণ নিয়ে উন্নয়ন কাজ করবে বলে বলা হয়েছে। তবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, নতুন নোট ছেপে ঋণ নিলে বাজারে অর্থ প্রবাহ বেড়ে যাবে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। সরকার সেই পথে যাবে না। ভালো কথা।
সরকার যদি নতুন টাকা ছেপে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ না করে তাহলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থাকবে না। প্রশ্ন হলো, তাহলে এত পরিমাণ নতুন টাকা কি কারণে ছাপা হলো? সরকারের যদি আর্থিক সঙ্কট না থাকে তাহলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ নেবার কথা কেন ভাবা হচ্ছে?
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাপনা মোটেও আধুনিক এবং বাস্তবধর্মী নয়। উচ্চ হারে কর ধার্য করার পরিবর্তে তুলনামূলক কম হারে কর ধার্য করে আদায় ব্যবস্থাকে জোরদার করতে হবে। এছাড়া যাদের আয় বেশি তাদের উপর তুলনামূলক বেশি হারে কর ধার্য করা প্রয়োজন। সম্প্রতি রাজধানীতে আয়োজিত একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের সেমিনারে বলা হয়েছে, উচ্চ আয়ে কর বৃদ্ধি করা হলে অর্থ পাচারের ঝুঁকি বাড়বে। তাদের এ বক্তব্য মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ যারা বেশি আয় করবেন তাদের কর প্রদানের সামর্থ্যও বেশি থাকবে। তারা যদি বেশি হারে কর না দেন তাহলে করা বেশি হারে কর প্রদান করবেন? দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদন কেন্দ্র অপ্রতিষ্ঠান খাতে রয়েছে। এগুলো জরুরি ভিত্তিতে কর জালের আওতায় আনা প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে ১ কোটির বেশি টিআইএনধারী থাকলেও তাদের অর্ধেকই রিটার্ন দাখিল করেন না। এনবিআরের চেয়ারম্যান বলেছেন, বর্তমানে অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমান অর্থ বছরে এ পর্যন্ত ৪৪ লাখ রিটার্ন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৪১ লাখ রিটার্ন জমা পড়েছে অনলাইনে। যারা টিআইএনধারী কিন্তু বছরান্তে রিটার্ন দাখিল করেন না তাদের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এনবিআর একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে যারা চাকরি করেন তারা অত্যন্ত দায়িত্বশীল হবেন এটাই কাম্য। কিন্তু এনবিআরের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা আছেন যারা রাষ্ট্রের ক্ষতি করে হলেও নিজেদের আর্থিক সুবিধা অর্জনে ব্যস্ত। যেসব কর্মকর্তা আন্দোলনের নামে রাজস্ব আদায় বিঘ্নিত করেছেন তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা যেতে পারে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে এনবিআরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন তাদের অবশ্যই ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আন্দোলনের নামে যারা রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছে তাদের আইনের আওতায় এনে এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন কাজ করার দুঃসাহস দেখাতে না পারে।
আগামীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এনবিআরকে আরো সচেতন হতে হবে। উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বছরান্তে ব্যর্থ হওয়ার মধ্যে কোন কৃতিত্ব নেই। বরং তুলনামূলক কম এবং বাস্তবধর্মী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তা অর্জনের মধ্যে কৃতিত্ব আছে। এনবিআরে যারা কর্মরত আছেন তাদের প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে। যারা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হবেন তাদের কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়ে শাস্তিও আওতায় আনতে হবে।
রাজস্ব আদায় যদি বাড়নো না যায় তাহলে কোনোভাবেই বিদেশী ঋণ নির্ভরতা কাটানো যাবে না। একটি দেশ দীর্ঘদিন বৈদেশিক ঋণ নির্ভর হয়ে বাঁচতে পারে না। নেপালের মতো দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ২৩ শতাংশের মতো। আর বাংলাদেশে এটা ৭ শতাংশের নিচে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। যেকোনো মূল্যেই হোক আমাদের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে।