মো: রাশেদুল হাসান আমিন
গুম আর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে যে নতুন আইনগুলো তৈরি হচ্ছে, তার একটা জায়গায় এসে আমি বারবার আটকে যাই। প্রশ্নটা খুব সহজ— কেউ যদি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গুম হন, তাহলে সে অভিযোগ তদন্ত করবে কে? উত্তরটা যত সহজ মনে হচ্ছে, আইনের ভাষা পড়লে দেখা যায় বাস্তবে ততটা সহজ নয়।
সংসদে উত্থাপিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এর ১৪(৩) ধারায় যা বলা হয়েছে তার সারমর্ম হলো— পরিবার যদি কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ করে, অভিযুক্ত বাহিনী নিজে নিজের সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে না; সেক্ষেত্রে তদন্তের দায়িত্ব যাবে অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের হাতে। শুনতে ভালো লাগে— অভিযুক্ত বাহিনী নিজে নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করবে না, প্রয়োজনে ভিন্ন বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী দল তা করবে। কিন্তু এটা বাস্তবে কতটা কার্যকর সুরক্ষা, সে প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। কারণ কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রায়ই স্পষ্ট থাকে না ঠিক কোন বাহিনী জড়িত— অনেক সময় একটি বাহিনী আরেকটির পরিচয় ব্যবহার করে, কিংবা কোনো পরিচয়ই দেয় না। যখন অভিযুক্ত কারা তা-ই অস্পষ্ট, তখন ‘অন্য বাহিনী তদন্ত করবে’ এই সুরক্ষা কার্যকর হয় কীভাবে? দ্বিতীয়ত, বাস্তবে বাহিনীগুলো একে অপরের সঙ্গে যৌথ অভিযান চালায়, বন্দী হস্তান্তর করে। ফলে এক বাহিনীর বদলে আরেকটাকে তদন্তের ভার দেওয়াটা আসলে স্বাধীন তদন্ত নয়— এটা একরকম কাগুজে সমাধান।
এ আশঙ্কাটা এখন আর নিছক অনুমান নয়। খসড়া নিয়ে কাজ করা একাধিক পক্ষ থেকেই একই সুরে আপত্তি উঠেছে। একটি স্বনামধন্য দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা সংস্থা সরাসরি বলেছে, আইনের এ ধারায় অভিযুক্ত বাহিনীকে নিজ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত থেকে বিরত রাখা হলেও অন্য শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের হাতে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ থেকে যাচ্ছে, অথচ অতীতে অধিকাংশ গুমের ঘটনায় একাধিক শৃঙ্খলা, পুলিশ, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার যৌথ সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি মানবাধিকার সংগঠনও একই ধারা নিয়ে আপত্তি তুলে বলেছে, গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না রেখে তা স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা উচিত এবং সেটি আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বিরোধী দলের একজন সদস্য একই ধারা নিয়ে আপত্তি তুলে বলেন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ বেশি পেতেন, কিন্তু বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হলে ভুক্তভোগীর অধিকার ক্ষুন্ণ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়— এই আপত্তির জেরে বৈঠক থেকে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউটও করেন। খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরপরই একটি রাজনৈতিক দলও এই ধারাকে ‘গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে বলেছিল, গুমের অভিযোগ করতে হলে থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে হবে, আর সেই অভিযোগ তদন্ত করবে পুলিশ নিজেই। এতগুলো ভিন্ন পক্ষের একই বিন্দুতে আপত্তি তোলাটাই বলে দেয়, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন সমালোচনা নয়— এটা আইনের ভাষাতেই থাকা একটা বাস্তব ফাঁক, যাকে একজন বিশ্লেষক যথার্থই ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলে অভিহিত করেছেন। শুনতে কড়া সুরক্ষা মনে হলেও বাস্তবে এটি ভুক্তভোগীর হাতে তেমন কিছুই তুলে দেয় না।
মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রেও একই প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন নিজে গিয়ে তদন্ত করতে পারবে না। তাকে অপেক্ষা করতে হবে অভিযুক্ত বাহিনীর নিজস্ব প্রতিবেদনের জন্য। সে প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হলেও কমিশনের হাতে তেমন কিছু করার নেই— আবার সে একই বাহিনীর কাছে সুপারিশ পাঠানো ছাড়া। এটা আসলে নতুন কিছু নয়। পুরোনো আইনেও এই একই সীমাবদ্ধতা ছিল। মাঝখানে চব্বিশের পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে কমিশনকে সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা দিয়েছিল, কিন্তু সেই ব্যবস্থা সংসদে পাস হওয়ার আগেই বাতিল হয়ে যায়, আর পুরোনো আইন আবার ফিরে আসে।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও একই রকম শঙ্কা আছে। কমিশনের চেয়ারম্যান-কমিশনার বাছাইয়ের কমিটিতে সরকারের প্রতিনিধিদের সংখ্যা এমনভাবে রাখা হয়েছে যে নয়জনের কমিটিতে পাঁচজনই থাকবেন সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। ফলে সরকারের অপছন্দের কেউ এ পদে বসার সুযোগ কার্যত থাকছে না। আগে যেখানে বিচার বিভাগ, সাংবাদিক সমাজ কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধির মতো নানা পক্ষের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছিল, সেই বৈচিত্র্য এখন প্রায় নেই বললেই চলে।
আরেকটা বিষয় বিশেষভাবে ভাবায়— ঊর্ধ্বতনের নির্দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে সেটা দায়মুক্তির কারণ হতে পারবে না, এমন একটা বিধান আগে ছিল। এখন সেটা বাদ পড়েছে। এটা ছোট একটা বাক্য মনে হলেও এর প্রভাব বিশাল, কারণ বাস্তবে দেখা গেছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের অনেকেই আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেন— ‘আমাকে তো ওপর থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।’ সে অজুহাত দেওয়ার সুযোগ আবার তৈরি হচ্ছে বলেই মনে হয়। একইভাবে, আগে গোপন আটককেন্দ্র পরিদর্শনের জন্য কমিশনের কোনো পূর্ব-অনুমতি লাগত না, এখন তা করতে হলে ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন’ প্রয়োজন হবে। যে বন্দিশালা এখনো নথিভুক্তই নয়, সেখানে যাওয়ার জন্য সেই একই কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাওয়াটা কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য এ সমালোচনা মানা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, নতুন আইন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, গুমের শিকার মানুষ এখন সরাসরি আদালতে যেতে পারবেন, আর মানবাধিকার কমিশনও চাইলে স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারবে— শুধু আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের বিষয়টি মাথায় রেখেই কিছু নির্দিষ্ট শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যুক্তি হিসেবে এটাও বলা হচ্ছে, আগের অস্থায়ী আইনে তদন্তের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না, একই সংস্থা তদন্তকারী ও মামলার পক্ষ— দুই ভূমিকাতেই থাকতে পারত, এমনকি অন্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থাও ছিল। এসব সমস্যা সমাধান করেই নতুন খসড়া তৈরি হয়েছে বলে সরকারের দাবি।
তবে শাস্তির বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখলে ব্যাপারটা আরেকটু জটিল মনে হয়। একদিকে গুমের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছে, যা শুনতে খুব কঠোর মনে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে ন্যূনতম শাস্তি কমানো হয়েছে, আর ‘মিথ্যা বা হয়রানিমূলক’ অভিযোগের জন্য পাঁচ বছর পর্যন্ত সাজার বিধান জুড়ে দেওয়া হয়েছে। একদিকে বড় শাস্তির প্রচার, অন্যদিকে অভিযোগকারীর জন্য পাল্টা ঝুঁকি— এই দুটো মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বাস্তবে যিনি ভুক্তভোগী, তাঁর জন্য অভিযোগ করাটাই আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ভাবুন তো— যাঁর স্বজন হারিয়ে গেছে, তদন্ত শেষে অভিযোগ ‘মিথ্যা’ প্রমাণিত হলে তাঁকেই পাঁচ বছর পর্যন্ত জেলে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।
তদন্তের দায়িত্ব মূলত পুলিশের হাতেই থেকে যাচ্ছে, অথচ গত এক দশকের গুমের অভিযোগ শুধু পুলিশের বিরুদ্ধেই ছিল না— একাধিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত যদি সেসব সংস্থারই কেউ হন, তাহলে তদন্ত কীভাবে সেই সংস্থার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে, সে বিষয়ে আইনে স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা নেই। তদন্তকারী কর্মকর্তার বদলি ঠেকানো বা নথিতে অবাধ প্রবেশাধিকারের মতো সুরক্ষাগুলোও অনুপস্থিত।
পুরো বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটা হলো— সরকার বদলালে বিচার হবে, এমন আশ্বাসে ভরসা রাখা যায় না। ইতিহাস অবশ্য দেখিয়েছে, সরকার বদলালে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতিও ভেঙে পড়তে পারে, আবার সরকার অপরিবর্তিত থাকা অবস্থাতেও কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ কারণে বিচার এগিয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতির কারণে প্রমাণ নষ্ট করা হলেও তদন্তে আসল সত্য বেরিয়ে আসার নজিরও আছে। কিন্তু এ ধরনের অনিশ্চিত ভরসার ওপর ভর করে আইনের কাঠামোতেই সুরক্ষা না রাখাটা বিপজ্জনক। বিশেষ করে যাঁরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন তাঁরা হলেন জুনিয়র কর্মকর্তারা— যাঁরা ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই এমন পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েন, যার দায় পরে তাঁদেরই একা বহন করতে হয়।
অন্য অনেক দেশে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন এলে বিশেষ গোপনীয় আদালতের ব্যবস্থা রাখা হয়, কিন্তু তদন্তের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয় না। আমাদের এখানে যেন উল্টো পথে হাঁটা হচ্ছে— গোপনীয়তার নামে তদন্তের সুযোগটাই সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে। এতে না ভুক্তভোগী পরিবার সুরক্ষা পাচ্ছে, না বাহিনীর সাধারণ কর্মকর্তারা প্রকৃত অর্থে নিরাপদ থাকছেন। কারণ সাময়িক প্রাতিষ্ঠানিক আশ্বাস কোনো আইনি নিশ্চয়তা নয়।
তিনটি খসড়া আইনই এখনো সংসদীয় চূড়ান্ত পর্যালোচনার অপেক্ষায়। এ সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যেসব ফাঁক নিয়ে একাধিক পক্ষ প্রশ্ন তুলেছে— স্বাধীন তদন্তক্ষমতা, আটককেন্দ্র পরিদর্শনের সুযোগ, ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ-সংক্রান্ত দায়মুক্তির প্রশ্ন— এগুলো সংশোধনের সুযোগ এখনো ফুরিয়ে যায়নি। প্রশ্নটা তাই আইনের ভাষায় কতটা কঠোরতা দেখানো হলো তা নয়, বরং বাস্তবে কার হাতে তদন্তের চাবি থাকছে সেটাই। আর সে চাবি যদি অভিযুক্তের হাতেই থেকে যায়, তাহলে আইনের পাতায় যত কড়া শাস্তির কথাই লেখা থাকুক, তার বাস্তব মূল্য খুব বেশি থাকে না।
লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।