পতিত ফ্যাসিবাদী আমলে একদেশদর্শী পররাষ্ট্রনীতিই ছিলো রাষ্ট্রের মূলনীতি। শুধুমাত্র ভারত তোষণ করতে গিয়ে আওয়ামী বাকশালীরা দেশকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করে ফেলেছিলো। এমনকি তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেনি বরং মার্কিন মন্ত্রীসহ কূটনীতিকদের অসম্মান করতে কসুর করেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো। যা বহির্বিশ্বে আমাদের সম্মানহানি ঘটিয়েছিলো।
তবে জুলাই বিপ্লব এবং নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর সে অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। সরকার সবার সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিমান চলাচল এবং ভূরাজনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন এক সুদৃঢ় অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়াতে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ স্বাক্ষরিত হয়েছে; যা মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার সহজ হতে সহজতর করছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের রপ্তানি বজায় এবং শুল্কের মাত্রা সহনীয় রাখতে উভয় পক্ষ কাজ করছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বিমান বহরের জন্য মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে এয়ারক্রাফট কেনা এবং লিজ নেওয়ার প্রক্রিয়া দু’দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও জোরালো করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবন, জ্বালানি খাত এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে পারস্পরিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দু’দেশের সহযোগিতা নিয়মিতভাবে বাড়ছে। যা খুবই ইতিবাচক বলেই মনে করছেন বোদ্ধামহল।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে চিঠি লিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শিগগিরই সরাসরি বৈঠকের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এটাকে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ইতিবাচক মোড়ের আভাস বলে মনে করা হচ্ছে। বিগত শেখ হাসিনার সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মারাত্মক খারাপ হয়েছিলো। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের এলিট বাহিনী র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের বোয়িং এয়ারক্রাফট কেনার সিদ্ধান্তে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। যা উভয় দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারক্রাফট নির্মাতা বোয়িং থেকে বাংলাদেশ ১৪টি এয়ারক্রাফট ক্রয় করার লক্ষ্যে গত এপ্রিলে একটি চুক্তি সই করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বোয়িং। এ চুক্তি মোতাবেক ১৪টি এয়ারক্রাফটের মূল্য দাঁড়াবে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর সম্প্রতি বাংলাদেশ-সম্পর্কিত এক বার্তায় বাংলাদেশে বোয়িং বিক্রি করতে সমর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলেও গোর মন্তব্য করেন। মার্কিন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক এই সহকারী সচিব ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও বোয়িং এয়ারক্রাফট বিক্রি করার কথাও বলেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ গোর একই সঙ্গে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন।
মূলত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী। তাই ব্যবসাবাণিজ্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ প্রবল। বাংলাদেশে বোয়িং এয়ারক্রাফট বিক্রি করতে পেরে তিনি অত্যন্ত খুশি। সামরিক বিশেষজ্ঞরাও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং এয়ারক্রাফট কেনার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করছেন। তারা বলছেন, সব সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান একজন সেলসম্যান হিসেবে তাঁর দেশের পণ্য বিক্রি করে থাকেন। ট্রাম্পও তার ব্যতিক্রম নন। তবে বিমানের জন্য বোয়িংয়ের এয়ারক্রাফট প্রয়োজন আছে। বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি এয়ারক্রাফট রয়েছে। তার মধ্যে ১৪টি বোয়িং। গত এপ্রিলে চুক্তি করার ফলে আরও ১৪টি বোয়িং ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সাল নাগাদ যুক্ত হবে। বাংলাদেশে এয়ার ট্রাফিক যেভাবে বাড়ছে তাতে বিমানের বহরে নতুন এয়ারক্রাফট যুক্ত করা খুবই যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। কারণ নতুন এয়ারক্রাফট যখন যুক্ত হবে তখন পুরোনো অনেক এয়ারক্রাফট অচল হয়ে যাবে। এখন নতুন করে আরও ১১টি বোয়িং এয়ারক্রাফট কেনার আলোচনা চলছে। এগুলো বহরে যুক্ত হতে ২০৪০ সাল নাগাদ সময় লাগবে। তখন নতুন বোয়িং ২৫টিতে উন্নীত হবে। বিমান এয়ারবাস থেকে কিছু এয়ারক্রাফট লিজ নিতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কারণে চীন কিংবা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা হবে না বলেই কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। তাঁদের মতে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে চীন থেকে জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান ক্রয় করবে বাংলাদেশ। চীনও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং ক্রয় করে থাকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফর করবেন। ওই সময়ে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারে করণীয় ঠিক করবেন। ফলে ভারসাম্য বজায় থাকবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের জোরদার সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়াও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি করার এটা একটা উপযুক্ত সময়। সম্পর্ক ভালো থাকার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের ওপর মাত্রাতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেনি। বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক একটি সহনীয় মাত্রা। এ ছাড়া বাণিজ্য, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা দিনদিন বাড়ছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে শিগগিরই বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, বোয়িং বাংলাদেশকে হতাশ করবে না এবং তিনি বিষয়টি ভুলবেন না। ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটের কথা উল্লেখ করে তার নেতৃত্বে দেশের ‘খুব উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ দেখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। চিঠিতে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উষ্ণ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসাও জানান তিনি। বৈঠক প্রসঙ্গে-ট্রাম্প বলেন, তিনি তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছেন। এ চিঠিকে কেবল সৌজন্যবার্তা হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে বোয়িং ক্রয়, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য কাঠামো, রোহিঙ্গা সঙ্কট, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব-সবকিছুকে একসাথে বিবেচনা করলে ট্রাম্পের বার্তাটি ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের একটি নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত দিতে পারে।
ট্রাম্পের চিঠিতে বোয়িংয়ের প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ‘বোয়িং তোমাকে হতাশ করবে না, এবং আমি ভুলব না’-এ বক্তব্যের মধ্যে বাণিজ্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য বোয়িং কেনা নিছক রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার বহর সম্প্রসারণের বিষয় নয়। এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, মার্কিন পণ্য কেনা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ককে আরো ভারসাম্যপূর্ণ করার প্রশ্নও জড়িত। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অর্থনৈতিক নীতিতে বিদেশী অংশীদারদের কাছ থেকে মার্কিন পণ্য কেনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। ফলে বাংলাদেশের বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের কাছে একটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক সঙ্কেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত চিঠিতে বিষয়টির উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, সিদ্ধান্তটি তার নজরেও এসেছে।
তারেক রহমানের সাথে ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি হলো দু’দেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্য সমঝোতা। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে সই করে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশী পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনে। একই সাথে নির্দিষ্ট কিছু বাংলাদেশী পণ্যকে শূন্য শতাংশ শুল্কসুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও অন্যান্য ইনপুট ব্যবহার করে নির্দিষ্ট পরিমাণ তৈরি পোশাকের জন্য শূন্য শুল্কের ব্যবস্থার কথা বলা হয়।
চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে এবং বিভিন্ন অশুল্ক বাধা কমাতে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, কৃষিপণ্য, আইসিটি পণ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমদানি-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ সহজ করার বিষয় রয়েছে। অর্থাৎ, দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু তৈরি পোশাক রফতানি বা সাহায্যনির্ভর সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমেই ‘পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের’ কাঠামোয় প্রবেশ করছে।
এখানেই রয়েছে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের ওপর নতুন সেকশন ৩০১ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও টেক্সটাইল ইনপুট আমদানির সাথে সম্পর্কিত শুল্কমুক্ত কোটাব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক উন্নত হলেও বাংলাদেশের রফতানিকারকদের সামনে শুল্ক ও বাজার-সুবিধার অনিশ্চয়তা পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিশেষ করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত তৈরি পোশাক। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে শুল্ক, কাঁচামাল, শ্রমমান, কমপ্লায়েন্স এবং উৎপাদন ব্যয়-সবকিছুতেই নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় তারেক-ট্রাম্প বৈঠক হলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে মার্কিন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল শুল্কসুবিধা। ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ একই সাথে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য তৈরি করে চলছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সাথে ঢাকার নতুন কৌশলগত যোগাযোগ ওয়াশিংটনের নজরের বাইরে থাকার কথা নয়। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের মূলনীতি হওয়া উচিত-কোনো একক শক্তির বলয়ে না গিয়ে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বহুমাত্রিক কূটনীতি। রোহিঙ্গা সঙ্কটও তারেক-ট্রাম্প সম্ভাব্য বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হতে পারে। বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে এ সঙ্কট বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর আরো বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তাই ওয়াশিংটনের কাছে বাংলাদেশের প্রত্যাশা শুধু ত্রাণসহায়তা নয়; মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমান সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থের পাশাপাশি গণতন্ত্র, নির্বাচন, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয়ও গুরুত্ব পাবে। ওয়াশিংটন সাধারণত অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারের প্রশ্নকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে ঢাকার জন্যও প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানো। ট্রাম্পের চিঠিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা এবং ব্যক্তিগতভাবে বৈঠকের আগ্রহ নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হওয়া উচিত-এ ব্যক্তিগত উষ্ণতাকে কিভাবে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থে রূপান্তর করা যায়।
বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনকে একটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক বার্তা দিয়েছে। এখন এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে চাইতে হবে আরো স্থিতিশীল মার্কিন বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্বালানি সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সঙ্কটে কার্যকর মার্কিন ভূমিকা। একই সাথে ঢাকাকে সতর্ক থাকতে হবে-যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠতা যেন ভারত বা চীনের সাথে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক শক্তি মূলত তার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানেই।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের চিঠি একটি সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলে দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। বোয়িং ক্রয় থেকে বাণিজ্য চুক্তি, শুল্কনীতি থেকে রোহিঙ্গা সঙ্কট, ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান- সবকিছু মিলিয়ে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলগত। তারেক রহমান-ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠক তাই কেবল দু’নেতার সৌজন্য সাক্ষাৎ হবে না; এটি বাংলাদেশের পরবর্তী বৈদেশিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও হতে পারে।
সার্বিক দিক পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে বর্তমান সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। কারো সাথে বৈরিতা নয় বরং সবার সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে সম্মানজনক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের দিকেই এগুচ্ছে সরকার। সে ধারাবাহিকতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের উষ্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ বিশাল কর্মযক্ষ সফলতার সাথে সম্পাদন করতে হলে সরকারকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নজর দিতে হবে। জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের সাথে যে দুরত্ব তৈরি হয়েছে তা নিরসন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। জাতীয় রাজনীতিকে অস্থির রেখে সরকার কোনভাবেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবে ততই দেশ ও জাতির কল্যাণ।
www.syedmasud.com