আসিফ আরসালান
পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ দেশী ও বিদেশী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগণকে চমকে দিয়েছে। প্রথম চমকটি ছিলো রাজ্যটির ৪৯ বছরের ইতিহাসে এটিই হলো দ্বিতীয়বার সরকার পরিবর্তন। প্রথম পরিবর্তন ঘটেছিলো জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন ভারতের সিপিএম বা কমিউনিস্ট পার্টি ৩৪ বছর পর তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর নিকট পরাস্ত হয়। এরপর মমতা ব্যানার্জী ৩টি মেয়াদে ১৫ বছর রাজ্য শাসন করেন।
বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার নির্বাচনে ২০১৬ সালে মাত্র ২টি আসন পায়। কিন্তু তার পরের বার অর্থাৎ ২০২১ সালে তারা উল্লম্ফন গতিতে ২টি আসন থেকে একেবারে ৭৭টি আসন দখল করে। আর এবারের নির্বাচন তো আরো চমকপ্রদ। ২০২১ সালের ৭৭টি আসন থেকে এবার তারা পেয়েছে ২০৬টি আসন। এর ফলে তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলো এবং সরকার গঠনের জন্য তাদেরকে আর কারো সাহায্য নিতে হবে না।
বস্তুত বিজেপির উত্থানটাই সারা ভারতজুড়ে চমকের পর চমক। ১৯৮৪ সালে এ দলটি লোকসভার নির্বাচনে পায় মাত্র ২টি আসন। এর পরবর্তী নির্বাচন সমূহে বিজেপির উত্থান ঘটে ধীর স্থির ভাবে। ১৯৮৯ সালে ৮৫টি আসন, ১৯৯১ সালে ১২০টি আসন, ১৯৯৬ সালে ১৬১টি আসন, ১৯৯৮ এবং ১৯৯৯ সালে পায় ১৮২টি আসন। ২০১৯ সালে বিজেপি এক লাফে ৩০৩টি আসন এবং ২০২৪ সালে ২৪০টি আসন পায়।
আদর্শগতভাবে এবং বাংলাদেশের আঞ্চলিক স্বার্থের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিজেপির সাথে বাংলাদেশের মানুষের অনেক বিরোধ আছে। কিন্তু একটি কথা স্বীকার করতেই হবে এ দলটি হতদ্যোম হয় না। তারা সংগঠনের ওপর খুব বেশি জোর দেয়। তাদের প্যারেন্ট সংগঠন আরএসএস (রাষ্ট্রীং স্বয়ং সেবক সংঘ) বিগত ১০০ বছর হলো Slow and steadily তাদের আদর্শ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
তাদের আদর্শে কোনো রকম অস্পষ্টতা নেই। রাজনৈতিকভাবে তারা কঠোরভাবে অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর ধর্মীয়ভাবে ৮০ শতাংশ হিন্দুর দেশে হিন্দুত্ব অর্থাৎ হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে গড়তে চায়। তাদের এ ধর্মীয় আদর্শবাদী রাষ্ট্রটি হবে রাম রাজত্ব। তাদের ভগবান রামের আদর্শ অনুযায়ী সেই রাষ্ট্রটি চলবে।
বিজেপি তাদের আদর্শের সাথে কম্প্রোমাইজ করেনি। বিজেপি বিগত ৭৮ বছরে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মনে প্রাণে এবং রাজনৈতিকভাবে হিন্দুত্বে বিশ্বাস করে। তাই আজ দেখা যায় যে, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলসহ ভারতের ৩১টি রাজ্যের মধ্যে বিজেপি এখন ২১টি রাজ্যে ক্ষমতাসীন। একমাত্র তামিল নাড়ু ছাড়া তারা ভারতের আর সমস্ত বড় প্রদেশে ক্ষমতাসীন।
এখানে আমার কাছে ভাবতে অবাক লাগে যে, বাংলাদেশে সংখ্যা লঘুদের সংখ্যা মাত্র ৮ শতাংশ। আর ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের সংখ্যা ২০ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে মুসলমানদের সংখ্যা ৯২ শতাংশ (সর্বশেষ আদমশুমারি মোতাবেক) হওয়া সত্ত্বেও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো পবিত্র ইসলাম এবং আমাদের রাব্বুল আল আমিনের কথা বলতে আমরা কুণ্ঠিত। এ জায়গাতে বাংলাদেশের মুসলমানরা বিশেষ করে জামায়াতসহ কয়েকটি ইসলামী দল ছাড়া আর সমস্ত বড় বড় দল ইসলাম সম্পর্কে চরম হীনমন্যতায় ভোগে। তবে সুখের বিষয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রচণ্ড দমননীতির মাঝেও তাদের ইসলামী আদর্শ প্রচার করে যাচ্ছে এবং ভোট ট্যাম্পারিং হওয়া সত্ত্বেও গত নির্বাচনে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আড়াই মাসের মধ্যেই যেসব অপরাজনীতি শুরু করেছে, আশা করা যায়, যদি জামায়াত কনসিসটেন্টলি কাজ করে যায় আগামী নির্বাচন (যদি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়) তাহলে দেশের অলৌকিক কিছু ঘটেও যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এ বিপুল বিজয় বাংলাদেশের জন্য অনেক ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশের সীমান্তের চার ধারে রয়েছে ভারতের ৫টি রাজ্য এবং মিয়ানমার। এ ৫টি রাজ্য হলো, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং মেঘালয়। মিজোরাম এবং মেঘালয় ছোট রাজ্য এবং তাদের জনসংখ্যাও কম। তাছাড়া সেগুলো হিন্দু রাজ্যও নয়। বাংলাদেশের অভিন্ন সীমান্তবর্তী ২টি রাজ্যে এপর্যন্ত বিজেপির শাসন ছিলো। কিন্তু সেদিনের নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গও বিজেপির শাসনে অধীনে চলে গেলো। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ৩টি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বিজেপির শাসন প্রতিষ্ঠিত হলো। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এ বিজয় খুব বড় রকমের অশুভ সংকেত। এ লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে ততদিনে শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
শুভেন্দু অধিকারী অস্থিমজ্জায় আওয়ামী পন্থী। নির্বাচনী প্রচারণায় শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশ সম্পর্কে যা বলেছেন সেটার ভিডিও ক্লিপ এখন নেট দুনিয়ায় অবাধে বিচরণ করছে। তিনি বলেছেন, “আমরা শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রটেকশন দিয়েছি। আমরা দালাইলামাকে আশ্রয় দিয়েছি। শেখ হাসিনা এখনো বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা অবশ্যই বাংলাদেশে যাবেন। এবং তাকে স্যালুট করে বাংলাদেশকে গ্রহণ করতে হবে।”
মমতা ব্যানার্জী হেরে গেছেন, বিজেপি জিতে গেছে, এসম্পর্কে আমাদের কারো কিছু বলার ছিলো না। কারণ এটি একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ভারতের ৩১টি রাজ্য রয়েছে। তাদের ওখানে তো রেগুলার ইলেকশন হচ্ছে। সেগুলো নিয়ে বাংলাদেশে আমরা কোনো দিন মাথা ঘামাইনি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আসার পর আমাদেরকে মাথা ঘামাতেই হচ্ছে এবং সেটি হবে আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থে।
দেখুন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীর রাগ কেমন চন্ডালের মতো। তিনি বলেছেন, ইসরাইল যেভাবে গাজাবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে, বাংলাদেশীদের সেভাবে শিক্ষা দেওয়া উচিত। শুভেন্দু বাবুর এর আগের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী তিনি বিশ্বাস করেন- বাংলাদেশকে এখন চালাচ্ছে পাকিস্তান। কেন্দ্রের বিজেপি শাসকদের আশকারায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম নিধন ও নিপীড়নের মধ্যেও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ও নিকট প্রতিবেশী বাংলা ভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ধর্মীয় উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেননি। সংখ্যালঘু মুসলমানদের একরকম আগলে রেখেছিলেন তিনি।
শুভেন্দুর নেতৃত্বে প্রতিনিয়ত পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় ও বাংলাদেশ নিয়ে উসকানি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ মিশনে বারবার হামলা করা হয়েছে। হুমকি-হুঙ্কার দিয়ে উত্তাপ ছড়ানো হয়েছে। আর এবারের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির যে আরো অবনতি ঘটবে না, তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে দিল্লির অনুগত সরকারের পতনের পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধীদলীয় ও বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী যে আগ্রাসী ও চরম উসকানিমূলক ভূমিকা নিয়েছিলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর তার আংশিক জারি রাখলেও দু’দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শুভেন্দু তার দলের হিন্দুত্ববাদী আদর্শ অনুসরণ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতি কাজে লাগিয়ে সীমান্তে ব্যাপক মাত্রার অস্থিরতা তৈরি করতে পারেন, এমন আশঙ্কা করছেন বিভিন্ন মহল। বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভিত্তিহীন প্রোপাগাণ্ডা চালিয়ে ড. ইউনূস সরকারকে প্রায় ফেলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল শুভেন্দুরা। পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়াগুলো বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচারে উলঙ্গভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেও মমতা সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকায় দুদেশের সম্পর্কে বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এবার মমতা ব্যানার্জী হেরে গেলেন কেনো? অত্যন্ত সহজ সরল মামুলি উত্তর হবে, জনগণ ভোট দেয়নি তাই হেরেছেন। কিন্তু না, মমতা ব্যানার্জীকে হারিয়ে সেখানে বিজেপির দখল প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতের অত্যন্ত শক্তিশালী লবি সমূহ বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করছিলো। পশ্চিমবঙ্গে একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন যে, একমাত্র ভারতের বিমান বাহিনী ছাড়া আর সমস্ত শক্তির ভর কেন্দ্র মমতার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঐতিহ্যগতভাবে প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার তৃণমূল কংগ্রেসের বড় শক্তির জায়গা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। এবারের নির্বাচনে ২৯৩টি আসনের মধ্যে ৫৪টিকে মুসলিম অধ্যুষিত আসন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের সময় বিবিসির একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, কথিত ‘বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের’ নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশে সংশোধন কার্যক্রম চালানো হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয় সে অনুযায়ী, চূড়ান্তভাবে বাদপড়া ৬০ লাখ এবং বিবেচনাধীনসহ সাকূল্যে বাদ পড়েন প্রায় এক কোটি ভোটার। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব যেসব আসনে বেশি পড়েছে এমন আসন ৯৪টি। সেদিনের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, সংশোধনের আগে, অর্থাৎ ২০২১ সালের নির্বাচনে এসব অঞ্চলে মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাপ্ত আসন ছিল ৭২টি। এবার পেয়েছে মাত্র ৩০টি। বিপরীতে গত নির্বাচনের ২২টির বিপরীতে বিজেপি এবার পেয়েছে ৬৩টি। ভোটার তালিকা থেকে যে ৬৮ লক্ষ মুসলিমকে বাদ দেওয়া হয়েছে সেটিই বিজেপির আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মমতার আসন সংখ্যা হ্রাসের কারণ, তাতে সন্দেহ নেই।
শুভেন্দু অধিকারী যতই হিংস্র হোন না কেনো, বাংলাদেশের জনগণ তার এ হিংসার জবাব দিতে জানে। বৃহস্পতিবার রাত্রে যখন এ লেখাটি লিখছি তখনও বিএনপি সরকার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। অবশ্য এটা তারা ঠিকই করেছে। কারণ বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশ সম্পর্কে কী অবস্থান গ্রহণ করে সেটি জানার এবং দেখার পরেই তারা হয়তো তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবেন। কিন্তু শুভেন্দুর আস্ফালন আমরা ড. ইউনূসের আমলে দেখেছি। আমাদের একাধিক জেলায় তারা বিজেপির মিছিল নিয়ে এসেছিলো এবং হুমকি দিয়েছিলো যে, তারা বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকবে। অজুহাতটি কী? অজুহাতটি হলো, বাংলাদেশে নাকি হিন্দুদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে। এ অভিযোগ তাদের অনেক পুরাতন। একমাত্র আওয়ামী লীগ যখন পাওয়ারে থাকে তখনই তারা শুধুমাত্র এ অভিযোগ তোলে না। কিন্তু যখন আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকে তখন তারা এ হিন্দু নির্যাতন বলে বিশ্বব্যাপী শোরগোল তোলার চেষ্টা করে। অবশ্য তারা প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে।
আমরা আগেই বলেছি যে, বিএনপি সরকার এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীত্বের গদিতে বসে শুভেন্দু অধিকারীরা যদি এ ধরণের আস্ফালন করতেই থাকেন তাহলে বাংলাদেশ, বিশেষ করে তার জনগণ ছেড়ে দেওয়ার বান্দা নন। তাই পশ্চিম বঙ্গের নতুন সরকারকে বাংলাদেশকে নিয়ে আরো সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।
Email:[email protected]