মুন্সী আবু আহনাফ

নাগরিকদের “গুম” বা বলপূর্বক নিখোঁজ (Enforced Disappearance) করার সংস্কৃতি আধুনিক ইতিহাসে রাজনৈতিক নিপীড়নের একটি কৌশল হিসেবে পরিচিত। জাতিসংঘের Working Group on Enforced or Involuntary Disappearances ১৯৮০ সালে গঠিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ডাটাবেজ তৈরি করছে। তাদের ২০২৪-২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তারা ১১৪টি দেশের সরকারের কাছে প্রায় ৬১,৬২৬টি গুমের ঘটনা পাঠিয়েছে। বর্তমানে সংস্থাটির কাছে প্রায় ৪৮,৬১৯টি মামলা সক্রিয় রয়েছে, যার সমাধান বা হদিস এখনো মেলেনি, তবে ভয়ংকর তথ্য হলো প্রকৃত গুমের ঘটনা আরও অনেক বেশি। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর তথ্য মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ গুম বা নিখোঁজের শিকার হয় (কয়েক দশকে) ইরাকে, প্রায় ১০ লাখ। তারপরে আছে সিরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও মেক্সিকোতে ১ লাখ করে নাগরিক গুমের শিকার হয়। আধুনিক যুগে রাষ্ট্রীয়ভাবে নাগরিকদের গুম করার প্রথম বড় মাপের উদাহরণ ধরা হয় ১৯৪১ সালে নাৎসি জার্মানির অ্যাডলফ হিটলারের জারি করা “নাইট অ্যান্ড ফগ” (Nacht und Nebel) ডিক্রিকে। দখলকৃত দেশগুলোতে যারা নাৎসি বাহিনীর বিরোধিতা করত, তাদের রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো। নাৎসি জার্মানির সেই কুখ্যাত ডিক্রি নিয়ে লেখা (Night and Fog) বইটি, যা আধুনিক গুমের ইতিহাসের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। ১৯৬০ এবং ৭০-এর দশকে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে, বিশেষ করে গুয়াতেমালা, আর্জেন্টিনা এবং চিলিতে এই চর্চা এক চরম রূপ ধারণ করে। তবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সুসংগঠিতভাবে এটি ব্যবহারের শুরু করে ইতিহাসের কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট ও জুলাই গণহত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামী শেখ হাসিনার শাসনকালে।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিস্ট ও গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন ও নির্বাচিত সরকারের অধীনে এই প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ যেভাবে নেয়া হয়েছে, তা আরও জোরদার করার কথা ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিগত ১৫ বছরে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো তদন্ত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘গুম তদন্ত কমিশন’ গঠন করে ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ কমিশন প্রায় ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের অভিযোগ গ্রহণ করেছে এবং প্রাথমিক তদন্তে অন্তত ২৮৭ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘকাল আলোচিত ‘আয়নাঘর’ বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোপন আটককেন্দ্র থেকে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী মুক্তি পেয়েছেন, যারা বছরের পর বছর সেখানে নিখোঁজ ছিলেন। ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ ‘গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন’ (CED)-এ স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে, যা একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। ২০২৫ সালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছে, যাতে গুমকে একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যদিও বর্তমান বিএনপির সরকার এই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত না করে বাতিল করে দেয়। স্বাভাবিক ভাবেই এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকরা কি রাইট টু লাইফের গ্যারান্টি পাবে নাকি আবারও গুম ফিরে আসবে। বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হয়। খালেদ আবু এল ফাদল ইসলামিক লিগ্যাল স্কলারদের মধ্যে সবচেয়ে সুপিরিচিত পণ্ডিতদের একজন। তিনি তার বিখ্যাত বই “Reasoning with God: Reclaiming ShariÕah in the Modern Age” এ মানবাধিকারের আলাপে “রাইট টু লাইফ” কে ইসলামের একটা মৌলিক কেন্দ্রীয় প্রশ্ন আকারে হাজির করেছেন। রাইট টু লাইফ স্রেফ বায়োলজিক্যালি সার্ভাইভালের এর বিষয় না। এটিকে তিনি একটি বিস্তৃত মরাল অর্ডারের সাথে কানেক্ট করে আলাপ করেছেন যে, এই মরাল অর্ডার ক্রুয়েল্টি বা নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এবং স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-ই গড়ে তোলে না, বরং একই সাথে খোদার নামে হিউম্যান সাফারিংকে যে অবমূল্যায়ন করা হয়, সেটার বিরুদ্ধে একটা শক্ত রিফিউজাল।

ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) এমপির লেখা ‘‘আয়নাঘরের সাক্ষী : গুম জীবনের আট বছর’’ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আজমী-এর লেখা ‘‘বিভীষিকাময় আয়নাঘর : ফ্যাসিবাদের গোপন কারাগারে ২৯০৮ দিন’’ বই দুটি ব্যাপক আলোচিত। ফ্যাসিস্ট হাসিনার ভয়ংকর আয়নাঘরের চিত্র ফুটে উঠেছে। অথচ গত ৯ এপ্রিল ‘‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ-২০২৫’’, জাতীয় সংসদে বাতিল করে বিএনপির সরকার। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছিল, বিরোধীদলের আপত্তি নাকচ করে তা বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ।

ইসলামী শরিয়াহ আইনে মানবাধিকার এবং ‘গুম’ বা ‘নিখোঁজ’ (ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় যাকে ‘আল-মাফকুদ’ বলা হয়) সংক্রান্ত অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও কঠোর নীতিমালা রয়েছে। ইসলাম মানুষের জীবন, সম্পদ এবং ব্যক্তিগত মর্যাদাকে পবিত্র ঘোষণা করেছে। মানবাধিকার ও গুম বিষয়ে ইসলামী আইনের বিবরণ নিচে দেয়া হলো: ১. জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা (মাকাসিদ আশ-শরিয়াহ) রক্ষা করার কথা বলেছে ইসলাম। ইসলামী আইনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো পাঁচটি বিষয় রক্ষা করা, যার প্রথমটিই হলো ‘জীবন রক্ষা’। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল।” (সূরা মায়েদা, আয়াত-৩২)। গুমের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা ধুলিসাৎ করা হয়। ইসলামে বিনা বিচারে আটক বা নির্যাতন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বিদায় হজে¦র ভাষণে বলেছিলেন, “তোমাদের জান, মাল এবং ইজ্জত আজকের এ দিনের মতোই পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়।” ২. ইসলামী আইনে গুমের সংজ্ঞা ও বিচার (আল-মাফকুদ) বিষয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা আছে। ইসলামী ফিকহশাস্ত্রে গুম বা নিখোঁজ ব্যক্তিকে ‘মাফকুদ’ (The Missing Person) বলা হয়। এ বিষয়ে শরিয়াহর অবস্থান হলো: যদি রাষ্ট্র বা কোনো গোষ্ঠী কাউকে অন্যায়ভাবে তুলে নিয়ে যায় এবং তার হদিস না দেয়, তবে ইসলামী আইনে একে ‘জুলুম’ এবং ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ (পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি) হিসেবে গণ্য করা হয়। ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে দীর্ঘকাল আটকে রাখা বা গুম করা ‘তাজির’ (শাস্তিযোগ্য) অপরাধ। শাসক বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এর জন্য আল্লাহর কাছে এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। ৩. নিখোঁজ ব্যক্তির অধিকার ও আইনি বিধান নিশ্চিত করা শাসকের দায়িত্ব। যদি কোনো ব্যক্তি গুম বা নিখোঁজ হয়, তবে ইসলামী আইন (ফিকহ) তার জন্য বিশেষ সুরক্ষা দেয়। যেমন: যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া যায়, ততক্ষণ তাকে আইনিভাবে ‘জীবিত’ হিসেবে গণ্য করা হয়। একে বলা হয় ‘ইস্তিসহাব’ (Presumption of Continuity)। নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তি অন্য কেউ ভোগ করতে পারবে না বা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা যাবে না যতক্ষণ তার মৃত্যু প্রমাণিত হয়। নিখোঁজ ব্যক্তির স্ত্রীর অধিকার রক্ষায় ফকিহগণ (যেমন ইমাম মালেক রা.) নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (সাধারণত ৪ বছর) অপেক্ষার বিধান দিয়েছেন, যাতে ভুক্তভোগী পরিবারটি অনিশ্চয়তার শিকার না হয়। ৪. রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও ‘হাক্কুল ইবাদ’ (বান্দার হক) বা নাগরিক অধিকার রক্ষা করা সরকার প্রধানের দায়িত্ব। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের নিরাপত্তা দেয়া শাসকের প্রধান দায়িত্ব।

পরিশেষে, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। তবে বাংলাদেশে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘গুম’ বা ‘বিচারবহির্ভূত অন্তর্ধান’ একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ব্যক্তির আর কোনো হদিস না পাওয়া বা দীর্ঘ সময় পর লাশ উদ্ধার হওয়ার ঘটনাগুলো জনমনে গভীর ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। গত দেড় দশকে বাংলাদেশে গুমের সংস্কৃতি যেভাবে শিকড় গেড়েছে, তা কেবল আইনি কাঠামোর লঙ্ঘন নয়, বরং মৌলিক মানবিক মর্যাদার ওপর এক চরম আঘাত। আর এ অবস্থা থেকে মুক্তি চায় দেশের সাধারণ মানুষ এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন চায় তারা।

লেখক : সাংবাদিক