রোগ নির্ণয়-নাকি বাণিজ্য? প্রশ্নটি আজ কেবল তাত্ত্বিক নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক নির্মম বাস্তবতা। চিকিৎসা কোনো পণ্য নয়, এটি মৌলিক অধিকার। এ অধিকার কারও দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয়ও নয়; জন্মগতভাবেই প্রতিটি মানুষের জন্য তা নিশ্চিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সামান্য অসুস্থতাতেই কেউ বিদেশের আধুনিক হাসপাতালে ছুটে যায়। আবার কেউ প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। এ যেন এক নীরব বিভাজন। অর্থ যার আছে, সেবা তার জন্য। যার নেই, তার জন্য চিকিৎসাও অনিশ্চিত। কী অদ্ভুদ আমার প্রিয় স্বদেশ! চিকিৎসার নামে সর্বত্র যেন এক রমরমা বাণিজ্য। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। যে পেশা মানবসেবার মহান আদর্শে গড়ে ওঠার কথা, সেটি এখন বাণিজ্যের হাতিয়ার। অথচ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় কত স্বপ্ন, কত অঙ্গীকার-রোগীর পাশে দাঁড়ানোই হবে জীবনের লক্ষ্য, অসহায় মানুষের সেবা হবে দায়িত্ব। কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষে বাস্তবতায় এসে সেই আদর্শের অনেকটাই যেন হারিয়ে যায়। অর্থলোভ অনেক ক্ষেত্রে মানবিকতাকে আড়াল করে ফেলে। রোগী হয়ে পড়ে জিম্মি। আর সেবার জায়গা দখল করে নেয় লেনদেনের হিসাব। প্রায়ই শোনা যায়-এ জায়গায় আসতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, অনেক পরিশ্রম করেছি। তাই বেশি ভিজিট নেয়াটা অন্যায় নয়। এ যুক্তি হয়তো আংশিক সত্য বহন করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় চিকিৎসা কি কেবল একটি পেশা, নাকি এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত রয়েছে নৈতিক দায়বদ্ধতা?

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা বা ডায়াগনস্টিক টেস্টের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে এই প্রক্রিয়াটি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। কিন্তু আমাদের দেশে রোগ নির্ণয়ের নামে অহেতুক টেস্ট চাপিয়ে দেয়ার ঘটনা ক্রমেই আলোচিত ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চিকিৎসকের কাছে গেলেই অধিকাংশ রোগীর হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় টেস্টের দীর্ঘ তালিকা। রোগীর আর্থিক অবস্থা কেমন, এসব পরীক্ষা করানোর সামর্থ্য তার আছে কিনা-সেদিকে অনেক সময় ন্যূনতম বিবেচনাও করা হয় না। বরং নির্দিষ্ট কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম উল্লেখ করে সেখান থেকেই পরীক্ষা করাতে বলা হয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ শারীরিক উপসর্গ ও ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই রোগ নির্ণয় সম্ভব। তবুও কেবল বাণিজ্যিক মুনাফার আশায় কিছু অসাধু চিকিৎসক রোগীদের ওপর দামী ও অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার চাপ সৃষ্টি করে। রোগ নির্ণয়ের নামে ‘টেস্ট-বাণিজ্য’ গড়ে উঠেছে, তা শুধু রোগীদের আর্থিকভাবে নিঃস্ব করছে না; বরং চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ককেও ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। চিকিৎসা সেবাকে শুধু ব্যবসা হিসেবে না দেখে সেবার মানসিকতায় পরিচালিত করা দরকার। যেন অহেতুক টেস্ট লেখার প্রবণতা কিছুটা হলেও বন্ধ হয়। এ জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা খাতে নৈতিকতার চর্চা জোরদার করা এবং হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অহেতুক টেস্ট এর পেছনে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কিছু অসাধু চিকিৎসক এবং দালালচক্রের কমিশন বাণিজ্য গভীরভাবে জড়িত।

এ পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে উন্নত দেশগুলোতে আধুনিক প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা খাত ধীরে ধীরে লাভজনক ব্যবসায় রূপ নিতে শুরু করে। তবে ১৯৬০ ও ৭০ এর দশকে বীমাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর পর অপ্রয়োজনীয় টেস্টের প্রবণতা বাড়তে থাকে। বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের দ্রুত বিস্তার ঘটে। The Medical Practice and Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, ১৯৮২ প্রণয়নের পর বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ক্লিনিকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এরপর থেকেই মূলত টেস্টকে ঘিরে ‘কমিশন বাণিজ্য’ ও বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে এ প্রবণতার হার অত্যন্ত প্রকট। এর ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীরা একদিকে আর্থিক চাপে পড়েন। অপরদিকে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া থেকে হন বঞ্চিত। একটি জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রে রোগ নির্ণয়ের নামে এ ধরনের অপচিকিৎসা ও বাণিজ্যিক শোষণ অব্যাহত থাকলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা মুখ থোবড়ে পড়বে। অতএব জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর নীতি গ্রহণ, কঠোর তদারকি এবং নৈতিক চিকিৎসা চর্চার প্রসার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

রোগ নির্ণয়ের নামে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার নির্দেশনা দেয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে কমিশন ভিত্তিক বাণিজ্য। গরীব অসহায় রোগীরা এ বাণিজ্যের খরিদ্দার। অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার রোগীদের কাছ থেকে নেয়া বিলের একটি বড় অংশ চিকিৎসক কিংবা মধ্যস্থতাকারীদের কমিশন হিসেবে প্রদান করে থাকে। এটা ওপেন সিক্রেট। এ অনৈতিক চর্চার বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি দুদক স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান দুর্নীতির ১১টি উৎস চিহ্নিত করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেছিল এবং তা প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশ প্রদান করেছিল। ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল অনেক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রোগী পাঠানোর বিনিময়ে চিকিৎসকদের বড় অংকের কমিশন দেয়, যা কোনো কোন ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এর ফলে চিকিৎসকদের একটি অংশ রোগীদের অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিতে উৎসাহিত হন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো-সরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক ও কর্মচারীর সঙ্গে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের মধ্যে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বা আতাঁতের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। কিন্তু সিন্ডিকেট বাণিজ্য বিতাড়িত হয়নি। সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার ফি তুলনামুলক কম হলেও বেসরকারি পর্যায়ে তা কয়েকগুণ বেশি। তাছাড়া অনেক সরকারি হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো অচল অবস্থায় পড়ে থাকে কিংবা দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে ব্যবহার করা যায় না। ফলে এক্সরে, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই মেশিন থাকা সত্ত্বেও রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হন। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নেয় দালালচক্র। তারা রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যায়, যেখানে একই পরীক্ষা ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি দামে করানো হয়।

বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষার ফি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও তা বাস্তবে কার্যকর হয়নি। অথচ রোগীদের স্বার্থ বিবেচনায় সরকার যদি সরকারি ল্যাবগুলোকে ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করতো তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও খরচ কিছুটা হলেও কমে আসত। কম খরচে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর সুযোগ পেত। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো একই পরীক্ষার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ফি আদায় করছে-কোথাও কম, কোথাও অস্বাভাবিক বেশি। এই বৈষম্যের যৌক্তিক কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। যদিও সরকার নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান তা মানছে না। আর যাদের ওপর তদারকির দায়িত্ব ন্যস্ত, তাদের কার্যকর ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। ফলে এই খাতে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীনতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যব্যয়ের হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এর তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৭ সালে চিকিৎসা ব্যয়ের ৫৫.৯ শতাংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হতো। বর্তমানে সে হার বেড়ে প্রায় ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে এই হার ৬৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছিল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ব্যক্তিগত ব্যয়ের একটি বড় অংশই চলে যায় রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনস্টিক পরীক্ষায়। বিআইডিএস (BIDS) এর ২০২৪ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ২৭.৫২ শতাংশ খরচ হয় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে, আর ওষুধ কেনায় ব্যয় হয় প্রায় ৫৪.৪ শতাংশ। ফলাফল হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে- যাকে অর্থনীতিবিদরা ‘মেডিকেল পভার্টি ট্র্যাপ’ বলে অভিহিত করেন।

টেস্টের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা বাণিজ্য রোধে সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য একটি সর্বোচ্চ মূল্যসীমা নির্ধারণ করে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা প্রয়োজন। অনিবন্ধিত বা মানহীন ল্যাবরেটরির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নীতিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির বিধান থাকা দরকার। এ ছাড়া ব্যবস্থাপতে ওষুধের জেনেরিক নাম উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা এবং চিকিৎসকদের ব্র্যান্ড নির্ভরতা কমিয়ে মূল জেনেরিক নাম লেখায় উৎসাহিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রোগীর পূর্ববর্তী পরীক্ষার রিপোর্ট ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্যবীমা চালুর পাশাপাশি কার্যকর ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে একই পরীক্ষায় অপ্রয়োজনীয় টেস্টের পুনরাবৃত্তি অনেকাংশে কমে আসবে। বিশ্বের অনেক দেশ স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় কমিয়ে তা সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে সক্ষম হয়েছে। ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও চীন তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিচিত। ইউরোপের মধ্যে নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও পর্তুগাল সাশ্রয়ী ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবার উদাহরণ।

মালয়েশিয়ার সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই সরকার বহন করে। নেদারল্যান্ডসে দক্ষ স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থার কারণে ব্যক্তিগত ব্যয় সীমিত। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়- সঠিক নীতি, সুশাসন ও জবাবদিহি থাকলে স্বাস্থ্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে। চিকিৎসা কখনো পণ্য হতে পারে না; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। রোগ নির্ণয়ের নামে কমিশন ভিত্তিক টেস্ট বাণিজ্য কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়। এটি জনস্বাস্থ্যের জনও গভীর হুমকি। এখন প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নৈতিক চিকিৎসা চর্চা এবং জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা। অন্যথায় ‘সেবা’ শব্দটি কাগজে থাকবে, বাস্তবে টিকে থাকবে কেবল বাণিজ্য।

লেখক: আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক