পশ্চাদমুখী ও নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই জাতি হিসাবে আমাদের পথচলা মোটেই মসৃণ হচ্ছে না বরং যতই দিন যাচ্ছে এক অজানা অনিশ্চিয়তা আমাদেরকে তাড়া করে ফিরছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে বৈশ্বিক রাজনীতিতে যখন গুণগত পরিবর্তনের তাগিদ অনুভূত হচ্ছে; সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বিশ্বের অপরাপর জাতিরাষ্ট্র যখন অপ্রতিরোধ্য ও দুর্বার গতিতে অগ্রসরমান, তখন আমাদের পশ্চাদমুখীতা রীতিমত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একথা ঠিক যে, দেশের প্রচলিত নেতিবাচক রাজনীতি নানা কারণেই গণমুখী চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। বিশ্বের অপরাপর দেশগুলো যখন আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রাজনীতি, রাজনৈতিক মূল্যবোধ, শিক্ষাদীক্ষা, সমাজ-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষায় নিজেদের সর্বোচ্চ শ্রম, মেধা, প্রজ্ঞা, অধ্যবসায় ও অর্থবিত্ত সহ সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাকে নিয়োজিত করেছে, তখন আমাদের এসব ক্ষেত্রে উদাসীনতা সত্যিই উদ্বেগের। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। আর এ অশুভ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার আপাতত কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
আমরা এখন ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর আমরা মনে করেছিলাম আমাদের আর কোন অপ্রাপ্তি নেই। কিন্তু ফ্যাসিবাদী, স্বৈরতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক শাসন আমাদের দীর্ঘ সময় ভূগিয়েছে। ছাত্র-জনতার অভাবিত জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আমরা সে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণ লাভ করেছিলাম। কিন্তু আমাদের চরম দুর্ভাগ্য যে, সে অর্জন আমরা কোনভাবেই ধরে রাখতে পারছি না। স্বাধীনতা সহ আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক বড় বড় অর্জন থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পরিচর্যার অভাবে সেসব অর্জন এখন কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা অতীত গৌরব, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয় রীতিমত ভুলে যেতে বসেছি। সকল ক্ষেত্রে উদাসীনতা ও নির্লিপ্ততা আমাদেরকে রীতিমত পশ্চাদমুখী করেছে। এ ক্ষেত্রে আমরা রীতিমত ভূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছি। জনশ্রুতি আছে ভূতের পা নাকি পেছনে। তাই এ অশরীরি প্রাণীটি সব সময় পেছনেই চলে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আমাদের সকল কর্মযজ্ঞে পশ্চাদমুখী অশরীরি ভূতকেই অনুসরণ করতে শুরু করেছি। ফলে আমাদের জাতীয় জীবনের কোন অর্জনই টেকসই ও স্থায়ী হতে পারছে না। নেতিবাচক রাজনীতির অশুভ তরঙ্গে সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে। যা জাতি হিসাবে আমাদের জন্য মোটেই গর্বের নয় বরং আত্মপ্রতারণা ও অবিমিশ্রকারিতার নামান্তর।
মূলত, স্বার্থান্ধতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রীকতা আমাদের দেশের রাজনীতির রীতিমত কক্ষচ্যুতি ঘটেছে বেশ আগেই। এ কক্ষচ্যুত রাজনীতিকে নিজ কক্ষে ফেরাতে বারবার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামও নেহায়েত কম হয়নি। এজন্য বিসর্জন দিতে হয়েছে অনেক তরতাজা প্রাণ। সম্পদহানির ঘটনাও কম ঘটেনি। সাফল্যও এসেছে একের পর এক। কিন্তু আদর্শ ও লক্ষ্যহীন নেতিবাচক রাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আমরা এসব অর্জন ধরে রাখতে পারিনি বরং বারবার সীমাহীন ব্যর্থতাকেই আলিঙ্গন করতে হয়েছে। সাম্য, মানবিক মূল্যবোধ, অবাধ গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে আমরা এক রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করলেও রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই আমরা স্বাধীনতার সুফলগুলো পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি। যা আমাদের জাতিস্বত্তার ভিত্তিমূলকেই দুর্বল ও ভঙ্গুর করে তুলেছে।
মূলত, আমাদের জাতীয় জীবনে মাত্রাতিরিক্ত অবক্ষয় এর অন্যতম কারণ। রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে এ অবক্ষয় এখন রীতিমত প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মূলত, অবক্ষয়টা শুরু হয়েছে শীর্ষ পর্যায় তথা রাজনীতি থেকেই। মাছের পচন যেমন মাথা থেকে শুরু হয়, তেমনি আমাদের পচন শুরু হয়েছে সেখান থেকেই। তাই এ থেকে উত্তরণ মোটেই সহজসাধ্য হচ্ছে না বরং যতই দিন যাচ্ছে সঙ্কট আরো ঘনিভূত হচ্ছে। বারবার সম্ভবনা সৃষ্টি হলেও স্বার্থান্ধতার কারণে সে সুফল আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারছি না। যেহেতু রাজনীতিই প্রত্যেক দেশ ও জাতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের প্রধান অনুষঙ্গ রাজনৈতিকরাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় নিয়ন্ত্রণ করেন। তারাই তো জনগণের ভাগ্য নিয়ন্তা।
তাই সুখী, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠনে রাজনীতিকেই সবার আগে অবক্ষয়মুক্ত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কিন্তু এ মহতি কাজে আঞ্জাম দেয়া যাদের দায়িত্ব তারাই যদি অবক্ষয়ের গড্ডালিক প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেন, তাহলে আমাদের আর দাঁড়ানোর কোন জায়গা থাকে না। আমাদের দেশের রাজনীতি নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এসব ক্ষেত্রে একশ্রেণির রাজনীতিকরাই প্রধানত দায়ি। কারণ, যারা দেশ, জাতি এবং আর্ত-মানবতার কল্যাণে রাজনীতি করেন বলে দাবি করেন, তারা দেশে একটা অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারেন না, জাতি হিসাবে আমাদের এরচেয়ে বড় হতাশা ও লজ্জার আর কী হতে পারে ? আর নির্বাচনের মত একটি অতি সংবেদনশীল বিষয়ে তারা ব্যর্থ হলে সুশাসন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা কতখানি সফল হবে তা তো বলায় বাহুল্য। একথা ঠিক যে, স্বাধীনতার পর যারাই ক্ষমতায় এসেছেন তারা কেউই এ মুদ্রাদোষ থেকে মুক্ত ছিলেন না বা থাকতে পারেন নি। সকল সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনের অনিয়ম ও ভোট চুরির অভিযোগ কমবেশী প্রমাণ রয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা হেলিকপ্টার প্রযুক্তির ব্যবহার করেছিলো। অথচ তারাই ছিলো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের দাবিদার। আর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা এসেছে দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই।
১৯৭৫ সালে রক্তাক্ত পটপরিবর্তনের পর আমরা আশায় বুক বাঁধলেও প্রাপ্তিটা প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। যদিও সে সময়টা মন্দের ভালো হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্র, সাম্য, আইনের শাসন ও মানবিক মূল্যবোধ বলতে যা বোঝায় তা ছিলো বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাধীনতার পর যারাই ক্ষমতায় এসেছেন তারা জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন ও সুশাসনের কথা বলেছেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, তারা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করে নিয়েছেন। দেশ, জাতি ও জনগণ তাদের কাছে খুবই গৌণ ছিলো। স্মরণ করা দরকার যে, ১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন ক্ষমতার পালাবদল হয়েছিলো দুর্নীতি, দুঃশাসন ও লাগামহীন অপরাধ প্রবণতাকে অজুহাত বানিয়ে। অথচ যারা একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার মাধ্যমে এ অপকর্ম করেছিলেন তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মোটেই ইতবাচক ছিলো না বরং অবৈধ ক্ষমতালিপ্সা ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতেই এসব করা হয়েছিলো। কারণ, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর তারা নিজেরাই এসব অপকর্মে করিৎকর্মা হয়ে উঠেছিলো। জাতিকে উপহার দিয়েছিলো দুর্নীতি, দুঃশাসন ও স্বৈরতন্ত্র।
একথা কারো অজানা নয় যে, নানা কথামালার ফুলঝুরির মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করে দীর্ঘ নয় বছর ধরেই চলেছিলো অপশাসন-দুঃশাসন। তারা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে পুরোপুরো ধ্বংস করে দিয়ে দেশকে পরোক্ষভাবে ব্যক্তিতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলো। পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছিলো সুবিধাভোগী শ্রেণি। যারা অগণতান্ত্রিক সরকারের মোসাহেবী করে নিজেদের আখের গুছিয়েছিলো। দেশ পরিণত হয়েছে লুটপাট, লাগামহীন দুর্নীতি, অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে। দেশে আইনের শাসনের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসন। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে রীতিমত প্রসহসন ও তামাশায় পরিণত করা হয়েছিলো। সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখতে নিয়মিত বিরতিতে নির্বাচন হয়েছিলো ঠিকই কিন্তু সেসব নির্বাচনের জনগণের অংশগ্রহণ বা জনমতের কোন প্রতিফলন ছিলো না। ফলে গণতন্ত্র রীতিমত তামাশাতন্ত্রে পরিণত হয়েছিলো। দেশের মানুষ যখন রাজনৈতিক সরকারের ওপর পুরোপুরি আস্থা হারিয়েছিলো এবং রাজনৈতিক সরকার ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করেছিলো তখনই দাবি ওঠেছিলো অরাজনৈতিক নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকারের।
রাজনৈতিক সরকার চৌর্যবৃত্তি ও স্বেচ্ছাচারিতা এতোটাই সীমালঙ্ঘন করেছিলো যে, তাদের ওপর দেশের মানুষ আর কোন ভাবেই আস্থা রাখতে পারছিলো না। ফলে ভবিষ্যতে নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকারের ফর্মূলা প্রণয়ন করা হয়েছিলো। যা বিশ্ব ইতিহাসে নজীরবিহীন হলেও রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই তা আমাদের দেশের রীতিমত অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলো।
তবে জনগণের এ যৌক্তিক দাবি ক্ষমতাসীনরা কোন ভাবেই মেনে নেয় নি বরং তারা নানাবিধ কূটতর্কের মাধ্যমে তা বরাবরই উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছে। এ বিষয়ে গণদাবি জোরালো হলে এক্ষেত্রে তারা সংবিধানের দোহাই দিতে কসুর করেনি। সংবিধানে কেয়ারটেকার সরকারের বিধান নেই দাবি করা হলেও ভোট চুরি কোন সংবিধানে আছে এর কোন সদুত্তর ক্ষমতাসীনদের কাছে পাওয়া যায়নি। মূলত, নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা টিকে রাখার জন্য সব সময়ই ক্ষমতাসীন জনগণের নাকের ডগায় সংবিধানের মূলা ঝুলিয়েছে। তারা জোর করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু দুর্বার গণআন্দোলনের তোপে তাদের শেষ রক্ষা হয়নি বরং ১৯৯০ সালে তাদের লজ্জাজনক পতন হয়েছে। তখন অরাজনৈতিক কেয়ারটেকার সরকার গঠনে সংবিধান কোনভাবেই প্রতিবন্ধক হয়নি।
স্বৈরাচারি এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে একটি কেয়ারটেকার সরকারের অধীনেই স্মরণকালের অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। জামায়াতের সহায়তায় ক্ষমতা স্বাদ গ্রহণ করেছিলো দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি। মনে করা হয়েছিলো যে, দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ফিরে এসেছে। দেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে গণতান্ত্র। কিন্তু হতাশা ও দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছাড়েনি। কেয়ারটেকার সরকারের মাধ্যমে যাদের পুনর্জন্ম হয়েছিলো, ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা আত্মপরিচয় ভুলে গিয়ে গণতন্ত্র ও অবাধ নির্বাচনের রক্ষকবজ কেয়ারটকার সরকার পদ্ধতিকেই অস্বীকার করে বসেছিলো। তারা তাদের অধীনে উপনির্বাচনগুলোকে ভোট কারচুপির উম্মুক্ত মহড়া প্রদর্শন করেছিলো। আর মাগুরা উপনির্বাচনের মাধ্যমে এর ষোলকলা পূর্ণ করা হয়েছিলো। তাই কেয়ারটেকার সরকারের দাবি আদায়ের জন্য জনগণকে নতুন করে রাজপথে নামতে হয়েছিলো। দুর্বার গণআন্দোলনের মাধ্যমে তদানীন্তন সরকার দাবি মানতে বাধ্য হলেও এ জন্য আমাদেরকে অনেক ত্যাগ ও কুরবানী করতে হয়েছে। কিন্তু এ ত্যাগের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার সাংবিধানিক ভিত্তি পেয়েছিলো। ফলে মনে করা হয়েছিলো দেশের গণতন্ত্রের ভাগ্যাকাশ থেকে কালো মেঘ স্থায়ী কেটে গেছে। কিন্তু একশ্রেণির রাজনীতিকের আদর্শিক দেওলিয়াত্ব, ফ্যাসিবাদী ও মাফিয়তান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই আমাদের সে অর্জনও রীতিমত কালিমায্ক্তু হয়েছে। এবার যারা কেয়াটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলো, তারাও আত্মপরিচয় ভুলে গিয়ে রীতিমত আত্মঘাতি খেলায় মেতে উঠেছিলো। ২০০৮ সালে পাতানো ও সমঝোতার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দেশে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিলো।
আর এভাবেই সূচনা হয়েছিলো দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের অপশাসন-দুঃশাসনের। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে রীতিমত নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিলো। ২০১৪ সালের নির্বাচন হয়েছিলো একদলীয় তামাশা ও ভাঁওতাবাজীর নির্বাচন। কথিত সে নির্বাচনে সংসদে বিনাভোটেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলো। ২০১৮ সালের নির্বাচন ছিলো ‘নৈশকালীন’। আর ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিলো ‘আমি’ ও ‘ডামী’ নির্বাচন। এমনই ছিলো মূলত ফ্যাসিবাদী গণতন্ত্র। কিন্তু এবার ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন এদেশের ছাত্র-জনতা। তারাই জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ ও মাফিয়াতন্ত্রীদের পতন ঘটিয়ে জাতিকে দ্বিতীয় বারের মত স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। আমরা সাময়িকভাবে হাফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম।
জুলাই বিপ্লবের পর ফ্যাসিবাদের ধ্বংস করা রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার রাষ্ট্র ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়ে আপন কক্ষে ফিরিয়ে নেওয়ার রাষ্ট্র সংস্কারের তাগিদ অনুভূত হচ্ছিল বিভিন্ন মহল থেকেই। আর সে তাগিদ থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছিলো কতিপয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার কমিশন। আর এসব সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাকে আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি দিতে প্রণীত হয়েছিলো জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদ। আর জুলাই সনদকে সংবিধানে তফসিলভুক্ত করার জন্য জারি করা হয়েছিলো গণভোট অধ্যাদেশ। সে অধ্যাদেশকে ভিত্তি ধরেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ক জনগণের মতামত গ্রহণ করা হয়েছিলো। ফল এসেছিলো ইতিবাচক।
তবে এ দুর্ভাগা জাতির ভাগ্য মোটেই সুপ্রসন্ন ছিলো না। অনেক ত্যাগ কোরবানির মাধ্যমে অর্জিত জুলাই বিপ্লব ক্ষমতাকে উপভোগ্য, উষ্ণ ও আরামদায়ক করতে এবং নতুন করে স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার হীন মানসিকতা থেকেই গুম করার জন্য সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার গণভোট অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে তা সংসদে উপস্থাপন করেনি। সংবিধান অনুযায়ী জনগণ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলেও হীন রাজনৈতিক উচ্চাভিালাষ চরিতার্থ করার জন্যই গণভোট অসাংবিধানিক বলতে কসুর করা হচ্ছে না। ফলে অনেক ত্যাগ ও কুরবানির মাধ্যমে অর্জিত জুলাই বিপ্লব এখন রীতিমত অপমৃত্যুর প্রহর গুণছে। যা আমাদের পশ্চাদপদ ও নেতিবাচক রাজনীতির পরিচয় বহন করে। আর এ পশ্চাদপদতা জাতি হিসাবে আমাদের গন্তব্যকেই অনিশ্চিত করে তুলেছে।
রাজনীতি সেবামূলক কাজ হলেও একশ্রেণির রাজনীতিকের অতিমাত্রায় রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও ক্ষমতালিপ্সা কারণে রাজনীতি হারাতে বসেছে গণমুখী ও কল্যাণকামী চরিত্র। ফলে বিফলে যেতে চলেছে আমাদের জাতীয় জীবনের বড় বড় অর্জন। তাই স্বাধীনতার সুফলগুলো আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারছি না। সংবিধান অনুযায়ী দেশ গণপ্রজাতন্ত্র হলেও বাস্তব প্রতিফলনটা এখনো প্রশ্নমুক্ত হয়নি। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এ অশুভ বৃত্ত থেকে সংশ্লিষ্টদের বেড়িয়ে আসতে হবে। জুলাই চেতনাকে ধারণ করেই আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্র আবারো দেশ-জাতি স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী বৃত্তে পড়তে পারে। ফলে আমাদের গন্তব্যই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
www.syedmasud.com