ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি-এর ক্ষমতায় আসা শুধু একটি প্রাদেশিক সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য অনেক গভীর। কারণ পশ্চিমবঙ্গ কেবল ভারতের একটি রাজ্য নয়, এটি বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত ভাগ করে নেওয়া অঞ্চল, যার সাথে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, অর্থনীতি, নদী এবং জনসংখ্যাগত সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহুবার দিল্লির নীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করেছিলেন, যদিও একই সঙ্গে তিনি তিস্তা চুক্তির অন্যতম বড় বাধাও ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশকে নিয়ে যতটা হিসাবি কূটনীতি অনুসরণ করে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি অনেক সময় তার চেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ ও আদর্শিক অবস্থান নেয়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ, সীমান্ত ইস্যু কিংবা অভিবাসন প্রশ্নকে তারা বরাবরই স্থানীয় রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়েছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়; মোটাদাগে বললে বিজেপি নামক দলটির রাজনৈতিক কৌশল বহুদিন ধরেই “অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” ইস্যুর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ বারবার এ ইস্যুকে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করার পর এ বক্তব্য প্রশাসনিক রূপ পেলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
প্রথমত, সীমান্ত পরিস্থিতি আরও কঠোর হতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গে। যদি রাজ্য সরকার সীমান্তে “অনুপ্রবেশ” ঠেকানোর নামে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়ায়, তাহলে বিএসএফ -এর তৎপরতা আরও আগ্রাসী হতে পারে। এতে সীমান্ত হত্যা, পুশব্যাক, অনুপ্রবেশের অভিযোগ এবং সীমান্ত উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। দ্বিতীয়ত, নাগরিকত্ব রাজনীতি বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সিটিজেনশিপ এমেন্টমেন্ট এ্যাক্ট (সিএএ) এবং ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনসিসি)এবং “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” প্রসঙ্গ নতুন করে সামনে আসতে পারে। যদি পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার এ এজেন্ডাকে আরও জোরালো করে, তাহলে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
তৃতীয়ত, তিস্তা চুক্তির সমীকরণ বদলাতে পারে। অনেকের ধারণা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না থাকলে তিস্তা চুক্তি সহজ হতে পারে। কারণ অতীতে তিনিই সরাসরি আপত্তি জানিয়েছিলেন। তিস্তা চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় দিল্লি বারবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। যদিও এখানে একটি বড় প্রশ্ন আছে: বিজেপি কি সত্যিই বাংলাদেশের স্বার্থে দ্রুত চুক্তি করবে, নাকি এটি আরও বড় কৌশলগত দরকষাকষির অংশ হবে? চতুর্থত, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উভয় বাংলার সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশে যেকোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনীতিতে দ্রুত ব্যবহার হতে পারে। অন্যদিকে ভারতের মুসলিমবিরোধী রাজনীতিও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর উত্তেজনা দু’দেশের জনগণের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পঞ্চমত, বাণিজ্য ও ট্রানজিট রাজনীতিতে নতুন চাপ আসতে পারে। বাংলাদেশের স্থলবন্দরভিত্তিক বাণিজ্যের বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট-পেট্রাপোল বর্ডার চেকপোস্ট-এ করিডোরটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত স্থলবন্দর। রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে অর্থনৈতিক প্রবাহও প্রভাবিত হতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ে দিল্লি প্রায়ই বলত, “রাজ্য সরকার বাধা দিচ্ছে।” এখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে সেই অজুহাত আর থাকবে না। তিস্তা, কানেক্টিভিটি, বিদ্যুৎ, বাণিজ্যÑএসব বিষয়ে কেন্দ্রকে তখন সরাসরি দায় নিতে হবে।
এখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন কিছু বিষয়ও বিবেচ্য। বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে সীমান্তবর্তী অনেক জেলায় ইসলামপন্থী দল বিশেষ করে জামায়াতের নির্বাচনী সাফল্য ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি অংশ ভালোভাবে নেয়নি। জামায়াতের সাম্প্রতিক উত্থানকে কেন্দ্র করে ভারতীয় ডানপন্থী মহলের কিছু অংশ ক্রমাগত নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে তারা বাংলাদেশকে “উগ্রবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি” হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারে। এ বয়ান তৈরি হলে তা দু’ভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। একদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুসলিমবিরোধী অবস্থান আরও জোরদার করতে এটি ব্যবহার করা হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ানোর জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া খবর, উসকানিমূলক প্রচারণা কিংবা সীমান্তঘেঁষা ঘটনাকে ব্যবহার করা হতে পারে। অতীতে আমরা দেখেছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে যদি সংগঠিতভাবে এমন অপতৎপরতা পরিচালিত হয়, তাহলে সেটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হতে পারে।
ভারতের বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যে “বুলডোজার রাজনীতি” ইতোমধ্যে একটি আলোচিত বাস্তবতা। এর আগে অসংখ্যবার আইনগত প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই সংখ্যালঘু মুসলিমদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর কিংবা ধর্মীয় পরিচয়কে টার্গেট করে প্রশাসনিক অভিযান চালানো হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের পর এরই মধ্যে এই ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। ইতোমধ্যে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় গরুর গোশত বিক্রেতাদের দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মসজিদ ভাঙা হয়েছে। মুসলিমদের নামাজে বাঁধা দেয়া হয়েছে। এসব ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। বিজেপির এসব কার্যক্রমকে কেবল প্রশাসনিক বা দলীয় পদক্ষেপ নয়, বরং সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবিকা, খাদ্য সংস্কৃতি এবং নাগরিক অধিকারের ওপর আদর্শিক আক্রমণ হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ওপর নিপীড়নের খবরকে কেবল আন্তর্জাতিক সংবাদ হিসেবে দেখবে না, বরং তা আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন হিসেবেও গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে সামাজিক উত্তেজনা, জনমত বিভাজন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছেÑ আর তাহলো বিজেপি কি এখনো শেখ হাসিনাকে তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখে? এবং যদি দেখে, তাহলে বাংলাদেশের একদম সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করায় শেখ হাসিনাকে আবারও বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার কোনো নীরব কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রচেষ্টা কি শুরু হতে পারে? প্রশ্নটি একেবারে অমূলক নয়। কারণ গত দেড় দশকে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে গিয়েছিল, যেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অনেকাংশে রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের সীমা অতিক্রম করে নেতৃত্বনির্ভর সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল। শেখ হাসিনার আমলে ভারত যে কৌশলগত সুবিধাগুলো পেয়েছে, তা দিল্লির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কঠোর অবস্থান, ট্রানজিট সুবিধা, আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংযোগÑএসব ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সরকার ভারতের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দিল্লির নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ মনে করত, বাংলাদেশে এমন একটি সরকার রয়েছে যারা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয় এবং আঞ্চলিক নীতিতে সংঘাতের বদলে সমন্বয়কে অগ্রাধিকার দেয়।
এ জায়গা থেকেই পশ্চিমবঙ্গের নতুন মূখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ইতোপূর্বে বিভিন্ন সময়ে দেয়া বক্তব্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির প্রভাবশালী এ নেতা একাধিকবার শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্য সহানুভূতি দেখিয়েছেন। অনেকেই এটিকে ব্যক্তিগত অবস্থান হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার অংশ হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে “বাংলাদেশ” একটি অত্যন্ত কার্যকর নির্বাচনী ইস্যু। অনুপ্রবেশ, সীমান্ত, সংখ্যালঘু রাজনীতিÑএসব প্রশ্নে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে ভোট রাজনীতি করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বিজেপির জন্য একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে ঝুঁকি।
সুযোগ এ কারণে যে, তারা বাংলাদেশকে “অস্থিতিশীল প্রতিবেশী” হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি আরও শক্তিশালী করতে পারে। আর ঝুঁকি এ কারণে যে, বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সংযোগের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যদিও অনেক বিশ্লেষকের মতে, শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের বিজেপির সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। কেননা, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হবে। বাংলাদেশেও যেমন এর বিরুদ্ধে তীব্র জনমত তৈরি হবে তেমনি আন্তর্জাতিক মহলেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কিন্তু এরপরও কথা থাকে। রাজনীতি সবসময় সরাসরি বা দৃশ্যমান পথে এগোয় না। পরোক্ষভাবেও এর প্রভাব বিস্তারের অনেক পথ থাকে। আন্তর্জাতিক মহলে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়াণ তৈরি করা, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, সীমান্ত উত্তেজনা ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা, মিডিয়ার মাধ্যমে মতামত তৈরি কিংবা “স্থিতিশীলতার জন্য পুরোনো নেতৃত্বই প্রয়োজন” এমন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াÑ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন নয়। ভারতের একটি অংশ হয়তো মনে করতে পারে, অনিশ্চিত নতুন শক্তির চেয়ে পুরোনো পরীক্ষিত অংশীদারই নিরাপদ। কিন্তু এখানেও বাস্তব সীমাবদ্ধতা আছে। বাংলাদেশের জনমত, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির বিন্যাস বদলে গেলে বাইরের কোনো শক্তির পক্ষে আগের সমীকরণ জোর করে ফিরিয়ে আনাও খুব সহজ নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত নিজেও এখন বহুমুখী চাপে রয়েছে। চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা,পাকিস্তান সংক্রান্ত নিরাপত্তা সংকট, ইরান ইস্যুতে পাকিস্তানের হঠাৎ করেই দৃশ্যপটে চলে আসার চাপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণÑএসব বাস্তবতায় বাংলাদেশে একক নেতৃত্ব পুনর্বহালের প্রকল্প ভারতের জন্য আপাতত অগ্রাধিকার নাও হতে পারে। তবে এও সত্য যে, দিল্লি কখনোই বাংলাদেশকে কেবল গতানুগতিক একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে দেখে না। ভৌগোলিক অবস্থান, উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় কৌশল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ভারতের কৌশলগত মানচিত্রের বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলতে চাই, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানে বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়তে পারে সে উত্তর খোঁজার চেয়ে আমাদের জন্য অধিকতর জরুরি প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে পারবে, যেখানে বহিরাগত কোনো শক্তির পছন্দ-অপছন্দের ওপর দেশের ভবিষ্যৎ আর নির্ধারণ করবে না? যদি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা এবং জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে দিল্লি, ওয়াশিংটন কিংবা বেইজিংÑকেউই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হতে পারবে না। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই বাইরের ষড়যন্ত্র খোঁজা নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তিকে এমনভাবে শক্তিশালী করা, যাতে কোনো বিদেশি শক্তির নীরব কৌশল সফল হওয়ার সুযোগই না থাকে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আবেগ নয়, বাস্তববাদী কূটনীতি। ঢাকাকে বুঝতে হবে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশ ইস্যুকে পরিকল্পিতভাবেই নির্বাচনী এজেন্ডায় পরিণত করা হয়েছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বহুমাত্রিক, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং কৌশলগত হতে হবে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হলো: তারা কি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতি প্রতিক্রিয়াশীল থাকবে, নাকি আগাম প্রস্তুতি নিয়ে নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করবে? পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান তাই নিছক কলকাতার ক্ষমতার পালাবদল নয়। এর প্রতিধ্বনি শোনা যেতে পারে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরিসরে। বিজেপির গ্রেটার ইন্ডিয়া গড়ার স্বপ্নকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন ঠাণ্ডা মাথার বিশ্লেষণ, জাতীয় সংহতি, আবেগহীন কূটনীতি এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।