বহুমত ও পথকে ধারণ করার মাধ্যমেই একটি দেশের গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুঠে ওঠে। গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ কখনো একত্রে সহাবস্থান করতে পারে না। যেখানেই গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছে সেখানেই ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটেছে। ফ্যাসিবাদ মূলত ভিন্নমত দমনের এক নিষ্ঠুর হাতিয়ার। গঠনমূলক ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা যখন শাসকগোষ্ঠী হারিয়ে ফেলে তখনই রাজনীতির ময়দান সংঘাতময় হয়ে ওঠে। এ সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা কোনো দেশের জন্য কোনো জনকল্যাণ বয়ে আনে না। সংঘাতের এ সংস্কৃতি আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা স্বাধীনতা সংগ্রাম- সবক্ষেত্রেই রাজনৈতিক উত্তাপ ও সংঘাতের উপস্থিতি ছিল। দেশ স্বাধীনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা উদ্ভব হবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়টি রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভুরপুর ছিল। এ সময় আওয়ামী সরকার বিশেষ বাহিনী ‘রক্ষীবাহিনী’ গঠন করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে বিরোধী মতকে দমন, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল। রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে বহু মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এ সময় জাসদের বহু নেতা-কর্মী সহিংসতার শিকার হয়েছিল এবং পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদারের মৃত্যু ব্যাপকভাবে আলোচিত ছিল। ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় সাভারে তাঁর মৃত্যু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আজও সমালোচিত। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। একই বছরের ৭ নভেম্বর আরেকটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মেজর জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি একদলীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পথ উন্মুক্ত করেন। কিন্তু তার শাসনকালও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল সেনাসদস্যের হাতে শহীদ হন।

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহাম্মুদ এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকারকে অপসারিত করে ক্ষমতা দখল করে এবং সামরিক শাসন জারি করেন। তাঁর প্রায় নয় বছরের শাসনামল ছিল রাজনৈতিক বিরোধ, দমন-পীড়ন এবং তীব্র আন্দোলনের এক দীর্ঘ পর্যায়। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচির সময় ঢাকার জিরো পয়েন্টে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেনের মৃত্যু স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। তাঁর বুকে-পিঠে লেখা ‘‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’’ গণতন্ত্র মুক্তি পাক’’ স্লোগানটি হয়ে ওঠেছিল আন্দোলনের মূল প্রেরণা। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্রগ্রামের লালদীঘি ময়দানে পুলিশের গুলিতে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি এবং ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ডা.শামসুল আলম মিলনের হত্যাকাণ্ড আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। ডা. মিলনের শাহাদাত বরণ এরশাদ সরকারের পতনের পথকে ত্বরান্বিত করে। ফলে গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ২৭ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর এই কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও গণজোয়ারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়।

পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। এ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার গঠন করে এবং ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমেই দেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুন:প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে গণতন্ত্রের এ নবযাত্রায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অধরাই থেকে যায়। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার তীব্র মতবিরোধ, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, হরতাল এবং অবরোধের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই রাজনৈতিক সংঘাত ও অনিশ্চয়তা এক স্থায়ী রূপ নিতে শুরু করে। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুসারে ১৯৯৬ সালের প্রথম কয়েক মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা আবারও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত থামেনি। দেশেজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা। ১৯৯৭ সাল থেকে ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় কয়েক হাজার মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ১৯৯৯ সালের প্রথম নয় মাসে কারাগার ও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও তৎকালীন সময়ে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ২০০১ সালে মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেও তাদের শাসনামলজুড়ে সংঘাত ও সহিংসতা ছিল।

পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১ অক্টোবরে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোট বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়কালেও দেশে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা ছিল। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এ ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবরের মধ্যে দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী ২০০৬ সালের অক্টোবরের শেষ প্রহরে সংঘটিত সহিংসতায় অন্তত দুই ডজনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিশেষত রাজধানীর পল্টন এলাকায় লগি-বৈঠার উন্মত্ত তাণ্ডব এবং জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার নৃশংস ঘটনাগুলো শুধু দেশেই নয়, বিশ্বজুড়েও তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই বিভীষিকাময় দৃশ্যাবলি তৎকালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভয়াবহ অবক্ষয়ের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হয়নি।

পরবর্তীতে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে। মানুষ প্রত্যাশা করছিল এবার হয়ত আওয়ামীলীগ সংঘাত সহিংসতার পথ পরিহার করবে। কিন্তু বিধি বাম! যে লাউ সে কদু। তারপর ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়গুলোতে রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো গুরুতর অভিযোগ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসলেও দলটি কোন কর্ণপাত করেনি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে সারাদেশে ১৬ হাজারের বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা গড়ে প্রতিদিন ৯টির বেশি। সর্বশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পূর্ববর্তী কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর প্রভাব বিস্তারকারী অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হয়। সহিংসতার ভয়াবহতা কত নির্মম হতে পারে তার এক করুণ উদাহরণ শিশু আবদুল আহাদ। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগে ৪ বছরের শিশু আবদুল আহাদ নিজ বাসায় বাবা-মার সাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে নিচে তাকিয়ে সংঘর্ষের দৃশ্য দেখেছিল। কিন্তু হঠাৎ ঘাতকের গুলি আহাদের ডান চোখে বিদ্ধ হয়ে মগজে ঢুকে যায়। একটি নিষ্পাপ শিশুর এমন অকাল মৃত্যু আমাদের এ রূঢ় সত্যটিই মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা যখন চরম সহিংসতায় রূপ নেয় তখন তার সবচেয়ে বড় শিকার হয় নিরপরাধ সাধারণ মানুষ ও কোমলমতি শিশুরা। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে এ ধরনের আরও অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনার চিত্র উঠে এসেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই-কমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এই সময়ে প্রায় ১৪০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশের জন্য জানমালের ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও বেদনাদায়ক। এসব ঘটনাকে কেবল বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই; বরং এগুলো দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতারই নির্মম বহি:প্রকাশ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি এ রাজনৈতিক সংঘাত দেশের জাতীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্তই করছে। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সংঘাতনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেকোনো মূল্যে বন্ধ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ, যেখানে মতপার্থক্য এবং ভিন্নমতের মর্যাদা থাকবে। কিন্তু মতভেদের সহিংসতায় একটি প্রাণও যেন না ঝরে এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

লেখক : প্রাবন্ধিক।