সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। এর ভালোমন্দ বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ওপর এই মাধ্যমের প্রভাব নিয়ে আলোচনার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন দেশ সিদ্ধান্তও নিচ্ছে। শিশুদের প্রযুক্তিনির্ভরতার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন বিধিনিষেধ চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য। গত বৃহস্পতিবার রাজ্যের গভর্নর গ্যাভিন নিউজম দু’টি গুরুত্বপূর্ণ আইনসহ মোট ১৩টি বিলে স্বাক্ষর করেছেন। নতুন আইনে ১৬ বছরের কম বয়সি শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আচরণগতভাবে আসক্তি তৈরি করে এমন কিছু ফিচারের সংস্পর্শে আসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি এআই চ্যাটবটযুক্ত খেলনা তৈরি ও বিক্রির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। গভর্নরের কার্যালয় সূত্রে রয়টার্স জানায়, তরুণদের প্রযুক্তিজনিত ঝুঁকি কমানোর এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের অনলাইন গোপনীয়তা সুরক্ষা জোরদার করতেই এসব আইন করা হয়েছে। নতুন বিধানগুলোর মধ্যে শিশু যৌন নির্যাতনের উপকরণ সংক্রান্ত আইনের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। এখন ১৮ বছরের কম বয়সি কাউকে যৌন কর্মকা-ে জড়িত দেখানো যে কোন এআই নির্মিত কনটেন্টও ওই আইনের আওতায় পড়বে।

আরেকটি আইনে আগামী চার বছর এআই চ্যাটবটযুক্ত ‘কম্প্যানিয়ন’ খেলনা তৈরি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আর একটি আইনে চ্যাটবট প্রোগ্রামে অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংক্রান্ত আইনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘অ্যাডামসল’। ১৬ বছর বয়সি অ্যাডাম রেইনের স্মরণে এ নাম রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে আত্মহত্যা করেন অ্যাডাম। তার বাবা-মায়ের দাবি, আত্মহত্যার চিন্তা নিয়ে ওপেন আইনের চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কয়েক মাসের আলোচনার পর তিনি এমন সিদ্ধান্ত নেন। ওপেন আই জানিয়েছে, চ্যাটজিপিটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথোপকথন চললে সুরক্ষা ব্যবস্থা ‘কম নির্ভরযোগ্য’ হয়ে পড়েছিল বলেও স্বীকার করেছে, প্রতিষ্ঠানটি। গভর্নর নিউজম বলেন, আমরা চাই আমাদের শিশুরা এবং ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিটি শিশু এমন একটি বিশে^ বেড়ে উঠুক, যেখানে প্রযুক্তি তাদের কল্যাণে কাজ করবে, তাদের দুর্বলতাকে কাজে লাগাবে না। গুগল, মেটা ও ¯œ্যাপের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আবাসস্থল ক্যালিফোর্নিয়া এখন শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপকারী যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হলো।

তবে বিধিনিষেধ আইনের সমালোচনাও হয়েছে। ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন এটিকে তরুণদের ইন্টারনেট ব্যবহারে অপ্রয়োজনীয় বিধি-নিষেধ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, এটি গোপনীয়তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে। নতুন আইনে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য ‘মনস্তাত্ত্বিকভাবে শোষণমূলক’ ফিচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অসীম স্ক্রলিং, ফিড, অ্যালগরিদমনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালু এবং ভবিষ্যৎ বিধিমালায় নির্ধারিত অন্যান্য ফিচার। ক্যালিফোর্নিয়ার এই পদক্ষেপের আগে আরকানসাস, লুইজিয়ানা, ওহাইও, ট্যাক্সাস, ফ্লোরিডা, নিউইয়র্কও শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন করেছে। উপলব্ধি করা যায়, বর্তমান সভ্যতায় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর বিধি-নিষেধের পক্ষে-বিপক্ষে মতামতের বিষয়টিও নতুন কিছু নয়। তবে শিশু-কিশোরদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আত্মহত্যাকারী কিশোর অ্যাডাম বেইনের পিতা-মাতাকে শান্ত করার কোনো উপায় আছে কি স্বাধীন চিন্তার প্রবক্তাদের? তবে শুধু প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিবিদদের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। ওরা তো একটি সামাজে, সমাজব্যবস্থায় বসবাস করেন। এ সমাজে রাজনীতি আছে, অর্থনীতি আছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শোবিজ আছে। আছে ধর্ম-দর্শন এবং পরিবার। এতসব প্রতিষ্ঠান কী করছে, সরকার কী করছে? প্রযুক্তির কাছে সবাই হেরে গেল? এমন হার মেনে নেওয়া যায় না। নিষিদ্ধের পাশাপাশি এখন আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। নিজনিজ অবস্থানে কি আমরা সঙ্গত কাজ করছি?