বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত গভীর এবং এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। পোশাক শিল্পের (RMG) পাশাপাশি রেমিট্যান্সই মূলত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মূল ভিত্তি টিকিয়ে রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা রেকর্ড ৩৫.৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা জিডিপির প্রায় ৬.৯৬ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় মেটাতে এ আয়ের ভূমিকা অপরিসীম। পাশাপাশি, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা এবং দারিদ্র্য বিমোচনেও রেমিট্যান্সের অবদান উল্লেখযোগ্য। মূলত, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আমাদের জাতীয় অর্থনীতির সঞ্জীবনী শক্তি। আর প্রবাসী আয়ই আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে সচল ও গতিশীল রেখেছে।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রবাসী আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ এখনো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) তুলনায় বেশি। যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, দেশে অর্থ পাঠাতে গড়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত লেনদেন ব্যয় হয়। এতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের একটি অংশ দেশে পৌঁছানোর আগেই খরচ হয়ে যায়। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা (ইউএনসিটিএডি) প্রকাশিত সর্বশেষ বৈশ্বিক বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের রেমিট্যান্স স্থানান্তর ব্যয়ের বেঞ্চমার্কের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। যা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।
মূলত, বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশের একটি। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রতিবছর দেশে অর্থ পাঠান। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান এবং প্রবাসী পরিবারের জীবনযাত্রায় এ অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে উচ্চ স্থানান্তর ব্যয় রেমিট্যান্স প্রবাহের সুফল কমিয়ে দিচ্ছে। ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স স্থানান্তর ব্যয়ের দেশগুলোর অর্ধেকই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বেনিন ও অ্যাঙ্গোলায় এ ব্যয় সবচেয়ে বেশি। বিপরীতে লাও পিডিআর ও হাইতিতে খরচ তুলনামূলক কম।
একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, বাংলাদেশে গড়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশ ব্যয় হওয়ায় প্রবাসী আয়ের পুরো সুফল পরিবার ও অর্থনীতিতে পৌঁছায় না। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের অভিবাসীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক ছোট অঙ্কের অর্থ পাঠানোর কারণে লেনদেন ফি ও বিনিময় হারের ব্যবধান তাদের প্রকৃত প্রাপ্তি কমিয়ে দেয়। এ ব্যয় কমাতে ডিজিটাল লেনদেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ইউএনসিটিএডি। সাব-সাহারান আফ্রিকায় এরই মধ্যে মোবাইল মানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এর ব্যবহার ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে প্রায় ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া প্যান-আফ্রিকান পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেম (পিএপিএসএস) আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের ব্যয় কমাতে এবং বিদেশি ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তথ্যব্যবস্থা ও ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি উদীয়মান ডিজিটাল বাণিজ্যের নিয়মকানুন প্রণয়নে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য তাই একদিকে রেমিট্যান্স স্থানান্তরের ব্যয় কমানো, অন্যদিকে উচ্চমূল্যের ডিজিটাল সেবা রপ্তানি বাড়ানো-দুই ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যা খুবই সময়োচিত ও বাস্তবসম্মত।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রবাসী আয়ই আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল রেখেছে। তাই প্রবাসীরা যাতে স্বপ্ল খরচে তাদের উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতে পারেন সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। এতে প্রবাসীরা যেমন উপকৃত হবেন, একই জাতীয় অর্থনীতিও অধিক সমৃদ্ধ হবে।