পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বাংলাদেশের পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নগরজীবনের জন্য দীর্ঘদিনের এক ভয়াবহ সমস্যা। পলিথিনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে এর দীর্ঘস্থায়িত্ব। সাধারণ জৈব বর্জ্যের মতো এটি সহজে মাটিতে মিশে যায় না। বছরের পর বছর পরিবেশে পড়ে থেকে মাটি ও পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করে। শহরের ড্রেন, নালা ও খালে পলিথিন জমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দেয়। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারণ এ পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য। বর্ষাকালে এর ক্ষতিকর প্রভাব আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

পলিথিনের কারণে শুধু নগরজীবনই বিপর্যস্ত হচ্ছে না, কৃষি ও জলজ পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খাল-বিল, নদী ও জলাশয়ে পলিথিন জমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। গবাদিপশু ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী খাবারের সঙ্গে পলিথিন গ্রহণ করে মৃত্যুর মুখে পড়ে। মাটিতে পলিথিন জমে থাকার কারণে মাটির উর্বরতা ও পানি ধারণক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পরিবেশ রক্ষায় পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে আইন থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। ফলে নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার প্রায় নির্বিঘ্নেই চলছে। এমন পরিস্থিতিতে পলিথিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বুধবার পলিথিন ও প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু নির্দেশনা জারি করলেই হবে না; আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণীত হয়েছে বহু বছর আগে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেও এর প্রয়োগে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। রাজধানীর বাজার থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত এলাকার হাটবাজার—প্রায় সর্বত্রই পলিথিনের ব্যাগ সহজলভ্য। অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদনের কারখানা পরিচালিত হচ্ছে লোকচক্ষুর আড়ালে।

এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। তবে কঠোরতা যেন শুধু খুচরা বিক্রেতা বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানে সীমাবদ্ধ না থাকে। পলিথিন উৎপাদন ও সরবরাহের মূল উৎস চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারখানা মালিক, বড় সরবরাহকারী ও মজুতদারদের আইনের আওতায় আনা গেলে বাজারে নিষিদ্ধ পলিথিনের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং অভিযানের পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদফতর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও বাজার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কোন এলাকায় কোথা থেকে পলিথিন আসছে, কারা উৎপাদন করছে এবং কোন সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে তা বাজারে পৌঁছাচ্ছে—এসব বিষয় অনুসন্ধান করে একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তবে পলিথিন বন্ধের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পাটের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগের ব্যবহার বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের দ্বৈতনীতি থাকা চলবে না। একই অপরাধে সবার বিরুদ্ধে সমানভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। অভিযানের নামে হয়রানি বা অনৈতিক সুবিধা নেয়ার সুযোগও রাখা যাবে না। এ জন্য অভিযান পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা মনে করি প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করে পলিথিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কার্যকরভাবে বন্ধ করতে হবে। আমরা সেই আহ্বান রাখছি সরকারের কাছে।