ভারত বিশ্বের এমন এক ব্যতিক্রমী রাষ্ট্র যে, কোন প্রতিবেশির সাথেই সুসম্পর্ক নেই দেশটির। বৃহৎ শক্তি তো নয়ই; বরং ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর সাথেও দেশটি কখনো ইতিবাচক সম্পর্ক রক্ষা করে চলতে পারে নি। চিরবৈরী পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক তো একেবারে বলাই বাহুল্য। বৃহৎ প্রতিবেশীর চীনের সাথে সীমান্ত সংঘাতও প্রায় নিত্যদিনের। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভূটান ও মালদ্বীপের মত ছোট রাষ্ট্রগুলোর সাথেও দেশটির সম্পর্ক ভালো নয়।

দেশটি চীন ও পাকিস্তানের সাথে খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর সাথে সব সময় বৈরী আচরণ করে এসেছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের সহায়তায় বাংলাদেশকে তো রীতিমত নিজেদের করদরাজ্যে পরিণত করছিলো। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর বাংলাদেশও মাথাউঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে দেশটির এখন খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। এমতাবস্থায় দেশটিকে এখন প্রতিবেশীদের সাথে কিছুটা হলেও আপসকামী হতে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি চীন-ভারত সীমান্ত আলোচনা এবং ভারতীয় পক্ষের নমনীয় মনোভাব সে কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ভারত ও চীনের সীমান্ত সমস্যা নিয়ে দু’দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর প্রশ্ন উঠেছে, সীমান্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভারত কি শেষ পর্যন্ত চীনের প্রস্তাব মেনে নিতে চলেছে? বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে জোরালো আলোচনা চলছে। আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আগে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ভারত ও চীনের সীমান্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের পর দু’দেশের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতির ভাষা পাশাপাশি রাখলে ভারতীয় পক্ষের নমনীয়তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। এ সীমান্তকে সাধারণত পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব, এ তিনটি অংশে ভাগ করা হয়। পশ্চিম অংশে রয়েছে লাদাখ, মধ্য অংশে উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশ এবং পূর্ব অংশে সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ। চীন গত কয়েক বছর ধরে বলে আসছে, সীমান্তের যেসব অংশে তুলনামূলকভাবে বিরোধ কম, সেগুলো আগে নির্ধারণ করা যেতে পারে। কূটনৈতিক পরিভাষায় এ পদ্ধতিকে সীমান্ত সমস্যার ফল ঘরে তোলার নীতি হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ পুরো সীমান্ত সমস্যার একসঙ্গে সমাধান না করে যেসব অংশে সমঝোতা সম্ভব, আগে সেসব অংশের সীমা নির্ধারণ করা। কিন্তু এ পদ্ধতি নিয়ে ভারতের অবস্থান নিয়ে এতদিন সংশয় ছিল। কারণ ২০০৫ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে হওয়া সীমান্ত-সংক্রান্ত চুক্তিতে সীমান্ত সমস্যার সামগ্রিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আলাদা আলাদা অংশের সমাধানের মাধ্যমে গোটা সীমান্ত সমস্যাকে টুকরো করার বিষয়ে ভারতের আপত্তি ছিল।

এবার অজিত দোভাল ও ওয়াং ইয়ের বৈঠকের পর ভারতের বিবৃতিতে সীমান্ত নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দু’পক্ষের আলোচনার কথা বলা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সীমান্ত নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। চীনের পক্ষ থেকেও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দু’পক্ষ সীমান্ত পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে।

এ বাক্যেই কূটনৈতিক মহল গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছে। কারণ, ভারতের বিবৃতিতে সীমান্ত সমস্যার সামগ্রিক সমাধানের কাঠামোর কথা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সীমান্তের যে অংশগুলিতে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব, সেগুলো নিয়ে কি ভারত নতুন করে আলোচনায় রাজি হয়েছে। তবে এখনই বলা যাচ্ছে না যে ভারত চীনের সব দাবি মেনে নিয়েছে। সীমান্ত নির্ধারণের আলোচনা মানেই কোনও নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর ভারতের দাবি প্রত্যাহার নয়। বরং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়ায় নতুন একটি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

২০২০ সালের পূর্ব লাদাখের সংঘাতের পর ভারত ও চীনের সম্পর্কে ব্যাপক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। পরে দু’দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা হয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অজিত ডোভাল ও ওয়াং ইয়ের বৈঠককে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে কূটনৈতিক মহল। দু’দেশ সীমান্ত সমস্যার সমাধানে নতুন পথ খুঁজছে। তবে সে পথ শেষ পর্যন্ত ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে কিনা, নাকি চীনের দীর্ঘদিনের প্রস্তাবকেই নতুন রূপে গ্রহণ করা হচ্ছে, তা নিয়েই কূটনৈতিক অঙ্গনে আগ্রহের অন্ত নেই।

প্রতিবেশীদের সাথে বৈরী সম্পর্কের কারণে ভারত খুব একটা স্বস্তিতে নেই। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর বাংলাদেশকে কব্জায় রাখতে পারলেও জুলাই বিপ্লব দেশটির সকল হিসাব নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে দেশটি খুবই একটা সুবিধা করতে পারছে না। সামাল দিতে পারছে না চীনকেও। এমতাবস্থায় আধিপত্যবাদী মনোভাবে পরিবার করে দেশটির পক্ষে ইতিবাচক বৃত্তে ফিরে আসার কোন বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক চীন-ভারত সীমান্ত আলোচনা সে কথারই প্রমাণ বহন করে। বাকি অবশ্য সময়ই বলে দেবে।