আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, অপরাধ দমন এবং জনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হলো, রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের হাতে বলপ্রয়োগ, গ্রেপ্তার, আটক, তল্লাশি কিংবা অস্ত্র ব্যবহারের মতো ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে, তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর কার্যকর ও স্বাধীন নজরদারি থাকা আরও বেশি জরুরি।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এ বিষয়টিই নতুন করে সামনে এসেছে। জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করতে সক্ষম একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে। এটি বাংলাদেশের জন্য বাইরের কোনো চাপ হিসেবে দেখার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে স্বাধীন নজরদারি কোনো রাষ্ট্রের দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির অন্যতম পরিচায়ক। যে রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা বাহিনীকেও আইনের আওতায় রাখার সক্ষমতা দেখাতে পারে, নাগরিকের কাছে সে রাষ্ট্রের বৈধতা ও আস্থা তত বেশি সুদৃঢ় হয়। বিপরীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও যদি স্বাধীন তদন্ত বা জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে শুধু ভুক্তভোগীই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন না, পুরো প্রতিষ্ঠানটির ওপর জনগণের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস এ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের অনুসন্ধান এবং পরবর্তী সুপারিশগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি, স্বাধীন তদন্ত এবং বেসামরিক নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। এসব সুপারিশের আলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে এর নিরপেক্ষ তদন্ত করবে কে? এ প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বিবেচনার ওপর নির্ভর করতে পারে না। কোন সরকার ক্ষমতায় আছে, কোন দল রাষ্ট্র পরিচালনা করছে কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন প্রতিষ্ঠানের সদস্য, এসব বিবেচনা তদন্তের নিরপেক্ষতাকে প্রভাবিত করলে সেটিকে প্রকৃত জবাবদিহি বলা যাবে না। তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে হতে হবে আইনগতভাবে স্বাধীন, প্রশাসনিকভাবে সক্ষম এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।
এখানেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান কেবল অভিযোগ গ্রহণ করবে এমন একটি দপ্তর নয়। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাব চাওয়া, সুপারিশ প্রদান, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার পথ সহজ করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবাধিকারসম্মত আচরণে উৎসাহিত করার মতো কার্যকর ক্ষমতা তার থাকা প্রয়োজন। কিন্তু স্বাধীনতা শুধু আইনের পাতায় লিখে দিলেই নিশ্চিত হয় না। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত স্বাধীনতা নির্ভর করে তার নিয়োগপ্রক্রিয়া, অর্থায়ন, তদন্তক্ষমতা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। কমিশনের সদস্য নিয়োগ যদি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও যোগ্যতাভিত্তিক না হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি কাগজে স্বাধীন হলেও বাস্তবে তার স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এ কারণে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত আইন সংস্কারের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রথমত, কমিশনের নেতৃত্ব ও সদস্য নির্বাচনে এমন একটি প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যাতে সরকারের একক নিয়ন্ত্রণ না থাকে। দ্বিতীয়ত, কমিশনের জন্য পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্ত করার পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিতে হবে। চতুর্থত, তদন্তের ফলাফল ও সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার অর্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং এর বিপরীতটাই সত্য। একটি পেশাদার বাহিনীও চায় তার সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ ব্যবস্থা থাকুক। স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করতে পারে এবং একই সঙ্গে নির্দোষ কর্মকর্তাকে অযথা হয়রানি থেকেও রক্ষা করতে পারে। ফলে স্বাধীন নজরদারি বাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, বরং বাহিনীকে আরও পেশাদার ও জনবান্ধব করে তোলার পক্ষে কাজ করতে পারে।
গুমবিরোধী আইন নিয়েও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। গুমের অভিযোগ বিশ্বের যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কারণ একজন নাগরিককে আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে নিয়ে গিয়ে তার অবস্থান গোপন করা হলে তার নিজের পাশাপাশি পরিবারও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে পড়ে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগী ও পরিবারের সুরক্ষা, তথ্য সংরক্ষণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মতো বাস্তব সক্ষমতাও থাকতে হবে।