আজ ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার,পহেলা বৈশাখ-বাংলা নববর্ষ। আজকের সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে যুক্ত হবে নতুন বাংলা বর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। নানা আয়োজনে দিনটি উদযাপন করবে বাংলাদেশ। আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হবে নতুন বছরকে। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হবে নববর্ষ। দিনটি উদযাপনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন। দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন। বাণী দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।

মহাকালের পরিক্রমায় আমাদের দুয়ারে সমাগত আরও একটি বাংলা নববর্ষ। এবারের নববর্ষ জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে এসেছে। ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে প্রিয় দেশ ও জাতিকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করার আপোষহীন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের কাক্সিক্ষত পরিবর্তিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার চলমান লড়াইয়ের সময়কে ধারণ করেই এবারের বৈশাখকে স্বাগত জানাবে পুরো জাতি।

‘পহেলা বৈশাখের সঙ্গে আমাদের এ অঞ্চলের কৃষি, প্রকৃতি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্পর্ক নিবিড়। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কৃষক তাঁর ফসল উৎপাদনের দিনক্ষণ ঠিক করে। বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা পহেলা বৈশাখের মাধ্যমে নতুন করে উজ্জীবিত হয়।

নানা কর্মসূচিতে আজ ভোর থেকেই বৈশাখের বর্ণিল উৎসবে মাতবে সারাদেশ। ভোরের প্রথম আলো রাঙিয়ে দেবে নতুন স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর জীবনের নতুন সম্ভাবনাকে। রাজধানী এবং সারাদেশজুড়ে থাকবে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। ‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩’ জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। দিনটি সরকারি ছুটির দিন। শোভাযাত্রাসহ নানা কর্মসূচী পালিত হবে দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করবে। বাংলা নববর্ষে সকল কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের আয়োজন করা হবে।

কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। হিজরী চান্দ্রসন ও বাংলা সৌর সনের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয় নতুন এই বাংলা সন। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাঁদের পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসেবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তাঁরা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয় দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

মূলত ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে। পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। ইতিহাসে দেখা যায়, ভারত বর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য শুরুর পর থেকে আরবী বছর হিজরী পঞ্জিকা অনুযায়ী তারা কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরী সাল চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি ফলনের সাথে এর কোন মিল পাওয়া যেত না। আর তখনই সম্রাট আকবর এর সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বাংলায় বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী সে সময়কার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজী সৌর বছর ও আরবী হিজরী সালের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরির কাজ শুরু করেন।

বাংলা বছর নির্ধারণ নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইয়ের প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে পরীক্ষামূলক এই গণনা পদ্ধতিকে কার্যকর ধরা হয় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর তারিখ থেকে অর্থাৎ সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহনের তারিখ থেকে। প্রথমে ফসলি সন বলা হলেও পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে।

‘নববর্ষের এই উৎসব ও আনন্দমুখর মুহূর্তে আন্তরিক প্রত্যাশা-সকল অশুভ ও অসুন্দর দূরীভূত হোক; সত্য ও সুন্দরের গৌরবগাথা প্রতিধ্বনিত হোক সর্বত্র। বিদায়ী বছরের সকল দুঃখ-বেদনা মুছে যাক; নতুন বছর ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয় হউক সবার।

নববর্ষ উদযাপনে কোনো ধরনের হুমকি নেই: র‌্যাব ডিজি

র‌্যাব মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেছেন, বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি না থাকলেও যে কোনো ধরনের নাশকতামূলক হামলার মোকাবিলায় র‌্যাব স্পেশাল কমান্ডো ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর রমনা বটমূলে বাংলা নববর্ষ উৎসব উদযাপনে র‌্যাবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন এবং দেশব্যাপী বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে র‌্যাবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি এসব কথা বলেন।

র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিশ্চিত করতে সারাদেশে ১৫টি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন থাকবে। তিনি বলেন, নববর্ষের অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত র‌্যাব সদস্যরা নিজ নিজ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ উপলক্ষে ১৮১টি পিকআপ পেট্রোল টিম, ১২৭টি মোটরসাইকেল পেট্রোল টিমসহ মোট ৩০৮টি টহল টিম মাঠে থাকবে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানস্থল- শাহবাগ, টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রবীন্দ্র সরোবর, হাতিরঝিল, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, বাংলা একাডেমি ও রমনা বটমূলসহ বিভিন্ন স্থানে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় চেকপোস্ট, অবজারভেশন পোস্ট স্থাপন এবং নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে।

র‌্যাব ডিজি আরও বলেন, সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও ডগ স্কোয়াড এরই মধ্যে সুইপিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যে কোনো ধরনের নাশকতামূলক হামলার মোকাবিলায় র‌্যাব স্পেশাল কমান্ডো ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া সারাদেশে কন্ট্রোল রুম, ফুট পেট্রোল, সিসিটিভি মনিটরিং এবং পর্যাপ্ত রিজার্ভ ফোর্স রাখা হয়েছে। র‌্যাব মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ বলেন, গোয়েন্দা তথ্য ও সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট নাশকতার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে গুজব, উসকানিমূলক বা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে যেন কেউ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে কড়া নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, নববর্ষের অনুষ্ঠানস্থলে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইভটিজিং ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো সন্দেহজনক তথ্য বা নিরাপত্তা ঝুঁকি চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। অভিযোগ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, বর্তমানে কোনো ধরনের হুমকি আমরা অনুভব করছি না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগের বছরের মতো এবারও শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হবে।