ড. কামরুল হাসান

নববর্ষ। পহেলা বা পয়লা বৈশাখ। আমাদের জীবনে আনে নতুনের আমেজ। এই দিন নিয়ে আমাদের মাঝে বিরাজ করে আবেগময় শিহরণ। জাতির প্রতিটি সদস্য নববর্ষ উদযাপনে হয়ে থাকে সরব। দেশব্যাপী চলে বর্ষবরণ আয়োজনের মহড়া।

পয়লা বৈশাখ বছরের শুরু মাস। নতুন হিসাবের সূচনা হয় এই মাসে। বাংলাদেশ, ভারত, ত্রিপুরায় বর্ষবরণ নিয়ে ঘটা করে নানা আয়োজনের তীব্রতা চোখে পড়ার মতো। এজন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে দেয়া হয় প্রণোদনা। বাংলাদেশে সকল সরকারী কর্মচারীকে দেয়া হয় বৈথাখী ভাতা।

আয়োজনের মাত্রা ও তীব্রতা দেখে অনুমান করা যায়- নববর্ষ আমার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। নববর্ষ উদযাপনের এই উম্মাতাল হিড়িক আর কোনো জাতির মধ্যে এইভাবে প্রত্যক্ষ করি না। তবে পারস্যে এই রীতির ও উদযাপনের ঐতিহ্য লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমারা নববর্ষ উদযাপনে ব্যাকুল না হলেও থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে তারা সিদ্ধহস্ত। এ সকল আয়োজনে থাকে উৎসব আর মাতামাতি। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রলেপের স্পর্শ পাওয়া গেলেও তা খুবই গেীণ এবং নাম কা ওয়াস্তে।

বাংলা সাহিত্যের এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বৈশাখের অবস্থান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নববর্ষকে সর্বদা আশা সঞ্চারী ও আনন্দদায়ী ভাবতে পারেননি যথাবাস্তবতায়। কিন্তু নববর্ষের প্রতিকুলতা, বিভীষিকা ও অকল্যাণকে ভয় পেতে বারণ করেছেন জাতিকে। নববর্ষ আজি এল কবিতায় তিনি বলেছেন-

নববর্ষ এলো আজি

দুর্যোগের ঘন অন্ধকারে,

আনেনি আশার বাণী

দেবে না সে করুণা প্রশ্রয়।

প্রতিকুল ভাগ্য আসে

হিংস্র বিভীষিকার আকারে,

তখনি সে অকল্যাণ

যখনি তাহারে করি ভয়।

এভাবেই বিশ্বকবি নববর্ষকে জাতীয় জীবনে অন্ধকার মুক্তির সোপান হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। অকল্যাণ থেকে মুক্তি পেতে জাতিকে সনির্বন্ধ আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিকে তিনি জীবনের সব ঋণ পরিশোধের আকুতি জানিয়েছেন। নির্ভিক চিত্তে এগিয়ে যাবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এভাবে-

যে জীবন বহিয়াছি

পূর্ণ মূল্যে আজ হোক কেনা,

দুর্দিনে নির্ভিক বীর্যে শোধ করি তার শেষ দেনা।

তবে বৈশাখ কেবলই অন্ধকার আর ঘন বিভীষিকার কথা কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় না। বৈশাখে থাকে আনন্দের নানাবিধ উপকরণ। হর্ষোৎফুল্লতার প্রায় সর্ব উপাদানে পূর্ণ আমাদের বৈশাখ।

এসেছে আবার পহেলা বৈশাখ

নতুন সূর্য হেসে বলে “আনন্দে থাক!”

আকাশেতে হাজার রঙের খেলা

মানুষের মাঝে আনন্দের মেলা।

বৈশাখ মানেই নতুন বছর, নতুন চিন্তা, নতুন সংকল্প। সামনে চলার, এগিয়ে যাবার, দেশকে এগিয়ে নেবার, উন্নয়নের পসরা সাজাবার এক অনন্য সুযোগ এনে দেয় এই বৈশাখ। তবে বাঙালী মানস নিমিষেই ভুলে যায় সেই চেতনার রেশ। থমকে যায় তার সংকল্পের দৃঢ়তা। আবারো গা ভাসিয়ে দেয় গাড্ডালিকা প্রবাহে। বিশ্বকবির উচ্ছাস যেন আকুতিতে পরিণত হয়-

আমি বাঁধিতেছি বসে সংকল্প নতুন অন্তরে আমার

সংসারে ফিরিয়া গিয়া হয়তো কখন ভুলিব আবার।

ভুলোমন বাঙালীকে বিশ্বকবি আত্মসচেতন করতে চেয়েছেন তার স্বকীয় কাব্য মহিমায়। জাতিকে সংকল্পে দৃঢ় থাকতে, ভাবনায় আরো প্রত্যয়ী হতে আবেদন জানিয়েছেন। পুরনো বছরের প্রস্থানের সাথে, পূর্বের অপরাধের সার্বিক যাচনা করেছেন জাতির পক্ষ হতে। বিশ্বকবির আন্তরিক আবেদন জাতিকে জাগ্রত করতে অতিশয় সবাক।

ক্ষমা করো আজিকার মতো-

পুরাতন বরষের সাথে

পুরাতন অপরাধ যত।

বাংলার প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাস বৈশাখকে নিয়ে ভাবেন ভিন্নমাত্রায়। নিঃসর্গ প্রকৃতির প্রেমে বিভোর হয়েও কবি জাতির উন্নয়নকে ভোলেননি এক মুহূর্তের জন্যেও। বিগত বছরের বিদায় ও প্রস্থানকে কবি জীর্ণ ও মলিনতার অন্তর্ধান হিসেবে চিহ্নিত করেন। নবিন ও নববর্ষকে মৃত্যুবিহীন জীবনের নতুনত্বের সাথে তুলনা করেছেন। অপরূপ উপমায় কবির ভাষায়-

অতীত নিশি গেছে চলে

চিরবিদায় বার্তা বলে

কোন আঁধারের গভীর তলে

রেখে স্মৃতি লেখা,

এসো এসো ওগো নবীন

চলে গেছে জীর্ণ মলিন

আজকে তুমি মৃত্যুবিহীন

মুক্ত সীমারেখা।

কবি জীবনানন্দের উচ্চারণে কেবল আবেদন নয় আছে উচ্ছাস, আছে নতুন জীবনের প্রতি উদগ্র আগ্রহ। আছে অনাবিল মুক্তির প্রত্যাশা, জাতির তরুণ সমাজকে জাগিয়ে তোলার অদম্য প্রয়াস।

প্রকৃতপক্ষে নববর্ষ হচ্ছে- জাগরণের উৎসভূমি, উন্নয়ন চিন্তার আতুরঘর। বৈশাখ জুড়ে কেবল সৃষ্টির উম্মাদনা, জাতি গঠনের প্রেষণা, কলঙ্ক মুক্তির প্রত্যয়, এগিয়ে যাবার দৃঢ়তা, অশুচি, জরা ঝেড়ে ফেলার বিক্রম আর জীর্ণতা ফেলে প্রাগ্রসরতাকে বরণ করে নেবার সাহসের স্ফুরণ, প্রেরণায় দীপ্ত থাকা। জাতির চিন্তামূলে থাকবে সেই অন্তহীন প্রতিতি সেটিই সকলের প্রত্যাশা।

অবশ্য আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বৈশাখ বলতেই তিনি বৈশাখী ঝড়ের প্রেমে পড়েন। কালবৈশাখী ঝড় নিয়ে কবির উম্মাদনার অনুরূপ আর কোথাও মেলা ভার। এমন মন্তব্যে কোনো বাতুলতা নেই।

কালবৈশাখী ঝড় ও বৈশাখবরণে নজরুলের কবিতা বাঙালির চিন্তা-চৈতন্য ও অন্তকরণে যে নব তরঙ্গ এনেছে, তা আর কোথাও নেই। কালবৈশাখী ঝড়কে সর্বনাশা ধ্বংস-অনাসৃষ্টির নেতিবাচকতা থেকে অবমুক্ত করে উজ্জীবনের প্রতিক রূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন কেবলই কবি নজরুল। কবি নজরুলের প্রত্যাশী উচ্চারণ-

এলে হেথা কালবৈশাখী

মরা গাঙে যেত বান্ ডাকি

বদ্ধ জাঙাল যাইত ভাঙিয়া, দুলিত এদেশ টালমাটাল।

শ্মশানের বুকে নাচিত তাথৈ জীবন-রঙ্গে তাল-বেতাল।

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কালবৈশাখী ছাড়া যেন বৈশাখের চিন্তাও করতে পারতেন না। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বৈশাখ চান না, চান বৈশাখের ঝড়োবাত্যা, কালবৈশাখীর প্রলয়ের নৃত্য। কবির কাছে বৈশাখের চেয়ে বৈশাখী ইনকিলাবের গুরুত্ব অনেক বেশি। কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই ছিলেন কালবৈশাখী ঝড়ের আরেক নাম। বৈশাখের অনবদ্য প্রতীক। তিনি স্বয়ং বাংলা কাব্যের কালবৈশাখী, চির চেনা ধুমকেতুর অগ্নিমূর্তি। কবির দুঃসাহসি উচ্চারণ-

আমি ধুর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকালবৈশাখীর।

আমাদের জীবনে বৈশাখের চেয়ে কালবৈশাখীর ঝড়ো বার্তার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। কাজী নজরুল ইসলাম মনে করেন কালবৈশাখী কেবল ঝড়ের প্রতীক নয়। কালবৈশাখী উষর প্রেম উপত্যকায় বারির সিঞ্চন, শুষ্কতার পর কিয়দ আর্দ্রতা। কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে যুক্ত থাকে ফোঁটা ফোঁটা বারিরাশির শীতলতা। সোজা সাপ্টা কথায় কালবৈশাখীর ঘুর্ণিবাত্যায় খুঁজে পাওয়া যায় নতুন জীবনের স্বতঃস্ফুর্ত স্পন্দন, নতুনের আগমন বার্তা। কবি নজরুলের কি চমৎকার আহ্বান-

ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর প্রলয় নতুন সৃজন বেদন

আসছে নবীন জীবন হারা অসুন্দরের করতে ছেদন।

অন্যত্র-

ঐ নূতনের কেতন উড়ে কালবৈশাখীর ঝড়।

তোরা সব জয়ধ্বনি কর।

বৈশাখ এবং কালবৈশাখী নিয়ে কবির অভিব্যক্তি হলো- সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী আবেদন।

নাচে ঐ কালবৈশাখী

কাটাবি কাল বসে কি?

দেরে দেখি

ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি।

আবার ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস মেনে নিলেও তিনি মনে করেন- বৈশাখ হল বিপ্লবের স্মারক, পরিবর্তনের সুনীল দিগন্ত। কবি ফররুখ আহমদ বৈশাখকে ধ্বংসের নকীব বা প্রবল শক্তিমান এক মহাশক্তিকে বুঝিয়েছেন। ধ্বংসের নকীবের একমাত্র কাজ হলো- জীর্ণ ও অশুচির মূলোৎপাটন, বছরের প্রথম দিন হতেই সকল অন্যায্যতার বিদূরণ চান কায়োমনবাক্যে। দুর্বার বৈশাখের পঙ্কিলতা বিধ্বংসে আকাক্সক্ষী ফররুখ আহমদ উদ্বেল। কবি কণ্ঠে শোনা যায়-

ধ্বংসের নকীব তুমি হে দুর্বার, দুর্ধর্ষ বৈশাখ

সময়ের বালুচরে তোমার কঠোর কন্ঠে

শুনি আজ অকুন্ঠিত প্রলয়ের ডাক।

বাংলা সাহিত্যে কবি ফররুখ আহমদ প্রথম যিনি বৈশাখকে প্রলয়ের ডঙ্কা হিসেবে চিত্রিত করেছেন। রবীন্দ্র নজরুল বলয়ের বৃত্ত হতে বের হয়ে এমন স্বকীয় উচ্চারণ এবং চিন্তার নিজস্বতা তাকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। কবির কণ্ঠে শোনা যায়-

গতিহীন জড়তায় বিকলাঙ্গ জীবনের পথে জমে ক্লেদ, গ্লানি, পাঁক

এ দুঃসহ জীবনেরে নাড়া দিয়ে এসো ফিরে

হে দৃপ্ত বৈশাখ।

বৈশাখকে এমন দীপ্তিময়তায় ভরে দিয়েছেন কবি ফররুখ। বৈশাখের দীপ্তিতে কবি ঝেড়ে ফেলেছেন ক্লেদ, ক্লেশ ও জড়তা। কবি বলেন-

সকল দীনতা ক্লেদ লুপ্ত কর, জড়তার চিহ্ন মুছে যাক;

বিজয়ী বীরের মতো নির্ভীক সেনানি তুমি

ফিরে এসো হে দৃপ্ত বৈশাখ।

আবার কখনও

সুরে ইস্রাফিল কন্ঠে পদ্মা, মেঘনার তীরে

এসো তুমি হে দৃপ্ত বৈশাখ।

সাম্যের সমাজ গড়তে, মানবিক সমাজ বিনির্মাণে কবির বিশ্বাস অসামান্য। সমাজকে বৈষম্যমুক্ত করতে বৈশাখকে ক্ষুরধার তরবারির সাথে তুলনা করেছেন। কবি ফররুখ বৈশাখী খঞ্জরে আঘাত হানেন সমুদ্রের অতলে প্রাণের জাগ্রত করণে।

সুপ্তির সমুদ্র থেকে জাগ্রত প্রাণের দ্বারে হানা দেয় প্রমত্ত বৈশাখ

কিংবা

সময়ের হাতিয়ার কোষমুক্ত খরধার এসেছিল দুর্জয় বৈশাখ।

কিংবা

প্রমত্ত ধ্বংসের সুরে ধাও তুমি চিরদিন হে নির্মম; নির্ভীক বৈশাখ।

তবে নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখকে খোশ আমদেদ জানাতে কবি ফররুখ আহমদ ভোলেননি। বৈশাখের সূচনা হয় ইনকিলাবের প্রেষণায়, নব সৃষ্টির প্রণোদনায়। কবির আশা-সঞ্চারী আকুতি-

মৃত্যু ঘন অন্ধকারে জালায়ে বিদ্যুৎ ক্ষীণ দীপ্ত জুলফিকার

নববর্ষ শুরু হয়, নতুন বৎসর আসে সংগ্রামের পথে দুর্নিবার,

ব্যর্থতার যত গ্লানি মিশে যায় দূরান্তরে পলাতক বলাকার ঝাক,

সুরে ইস্রাফিল কন্ঠে মুক্ত জনতার মাঝে

আসে আজ প্রমত্ত বৈশাখ।

আমরা জানি বাংলার বহু কবি সাহিত্যিকের সাহিত্য উপাদানের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নববর্ষ, বৈশাখ, বাংলা বছরের প্রথম মাস, হালখাতা, শোভাযাত্রা ইত্যাদি। বাংলা সাহিত্যে বাংলা বর্ষ ও বর্ষবরণ নিয়ে যত মাতামাতি আছে আর কোনো সাহিত্যে তা আছে বলে আমাদের জানা নেই। বাংলা সাহিত্যের চার প্রধান নকীব বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ এবং রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের বৈশাখ ভাবনার কিয়দছটার আলোক সন্ধান আমরা করেছি। তাদের প্রত্যেকের বৈশাখ চিন্তনে রয়েছে স্বাতন্ত্র ও স্বকীয়তার ছাপ। প্রত্যেকের চিন্তা অন্যের চিন্তা হতে স্বতন্ত্র মর্যাদায় ভাস্বর। বিশ্বকবি অশুচি হতে মুক্তি চান, বিদ্রোহী কবি বৈশাখী বিপ্লবে আন্দোলিত হন। আর কবি ফররুখ বৈশাখের হুংকারে মিটিয়ে দিতে চান সকল ক্লেদ, পাঁক আর জীর্ণতা। বাংলার এই সকল কবিদের নব চিন্তায় উদযাপিত হোক নববর্ষের সকল আয়োজন। গড়ে উঠুক এক চিরন্তন চেতনার সম্ভাবনাময় সংস্কৃতি। শুভ নববর্ষ।

লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, গবেষক ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক