ড. মোজাফফর হোসেন
বাংলা তারিখ গণনা আরম্ভের প্রথম মাস বৈশাখ নির্ধারিত হয়েছে। একসময় অগ্রহায়ণ মাসকে ধরা হতো বাংলা বছরের প্রথম মাস। অগ্র শব্দের অর্থ অগ্রে বা আগে বা শুরু আর হায়ণ শব্দের অর্থ বছর। পরে বৈশাখ মাসের শুরুর দিনটা অর্থাৎ পয়লা বৈশাখকে বর্ষবরণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। অবশ্য খ্রিস্ট সনও প্রারম্ভিক সময়ে পয়লা মার্চ থেকে গণনা শুরু হতো; পরে সেটি জানুয়ারির এক তারিখ; নববর্ষের প্রথম দিন ধার্য হয়েছে। তারিখ, সন, সাল , অব্দ এই শব্দগুলোর কোনোটিই বাংলা শব্দ নয়। তারিখ আরবি শব্দ; এর অর্থ দিন। ‘সন’ও আরবি শব্দ; অর্থ বছর। ‘সাল’ ফারসি শব্দ, অর্থ বছর। আর ‘অব্দ’ সংস্কৃত শব্দ। এই শব্দগুলো বাংলা সনের সাথে যুক্ত হওয়ার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটের গোড়ার কথা হচ্ছে বাংলা সনের উৎপত্তি ঘটেছে হিজরি বা আরবি সনের অবয়ব থেকে। মোঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে তারই নির্দেশে ৯৯৮ হিজরি অনুসারে ১৫৮৪ খিস্টাব্দে বাংলা সালের জন্ম ঘটে। গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের হিসেব মতে সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও শেষনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। মুহাম্মদ সা. এর হিজরত থেকে শুরু হয় হিজরি সনের যাত্রা। সম্রাট আকবরের আদেশে রাজ জ্যোতিষী আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজী চিন্তাভাবনা করে হিজরি সালকে যে কয়টি সালে রূপান্তরিত করেন তার মধ্যে একটি হলো ‘ফসলি সন’ বা বাংলা সন’। যেহেতু আরবি হিজরি সনকে পরিমার্জন করে বাংলা সাল গণনা করা হয় সেহেতু বাংলা সনের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক শব্দই আরবি-ফারসি হতে পেরেছে। সম্রাট আকবরের আমলে সুবা-এ- বাংলা (বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা) মোঘল শাসনের অধীনে চলে আসে। সুবা-এ-বাংলার প্রজারা প্রধানত কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল। প্রজাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে হলে ফসলের মাধ্যমে তা করতে হবে। সেজন্যে বছরের একটি নিদিষ্ট সময়কে বেঁছে নেবার প্রয়োজন পড়ে। তখন মোঘল শাসনে রাষ্ট্রীয় কার্যাবলি চলতো হিজরি সন অনুসারে। হিজরি সন চান্দ্রবৎসর হওয়ায় প্রতিবছর একই সময়ে রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হতো না। ফলে খাজনা আদায়ে গোলযোগ দেখা দিত। প্রতিবছর একই সময়ে যেন খাজনা আদায় সম্ভব হয় সে কারণে সৌরভিত্তিক সন প্রবর্তনের পরিকল্পনা করেন সম্রাট আকবর। তাঁর পরিকল্পনা মাফিক খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে সৌরভিত্তিক বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। সম্প্রতি বাংলা সনকে কি উদ্দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে তা স্পষ্ট হতে পারে নি। বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জের সাধারণ লোকজন, কৃষক-কৃষাণীরা বাংলা তারিখে দিনক্ষণ গণনার মাধ্যমে জমিতে ফসল বোনার কাজ করলেও শহুরে নাগরিকদের ব্যবহারিক জীবন-যাপনের কাছে এই সন বাহুল্য ও বিড়ম্বনা তাড়িত। দেখা গেছে বাংলাদেশের নগর-রাষ্ট্র পরিচালিত হয় গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুসারে। নাগরিকগণ তাদের খাজনাপাতি ট্যাক্স-ভ্যাট পরিশোধ করেন ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। রাষ্ট্রও তার সকল কার্যক্রম গণনা করে ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে। তাহলে রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের কাছে বাংলা তারিখ গণনার গুরুত্ব কি পর্যায়ে রয়েছে তা ভেবে দেখা যেতে পারে। অথচ প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ উদযাপনে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন প্রতিপাদ্য।
বাংলাদেশে তিনটি সন চালু রয়েছে। হিজরি, বাংলা ও খ্রিস্ট। এই তিনটি সনের দুটিকে (নতুন বছরের শুরুর দিনাটাকে) রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। বাংলা বর্ষের শুরুর দিন পয়লা বৈশাখকে উদযাপনের জন্য সরকারি ছুটি ঘোষণা করা আছে এবং এই দিনটিকে যেন আনন্দের সাথে উদযাপন করা যায় সে জন্য রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারিগণকে গত কয়েক বছর থেকে বৈশাখি উৎসব ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। হিজরি নববর্ষ পালনের জন্য সরকারি ছুটি ও উৎসবভাতা ঘোষণা করা না থাকলেও পয়লা মর্হরম দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা রয়েছে। আর যে সনটির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ছুটি-ছাঁটা ও উৎসবভাতা কোনেটিরই ঘোষণা নেই সেই খ্রিস্ট সনটিই সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্রীয়জীবনে গুরুত্বের সাথে গুণিত হয়ে থাকে এবং জনসাধারণ এই সনটির দিন-তারিখ সবসময় মনে রাখতে পারছেন। রাষ্ট্রও এই খ্রিস্ট সনের দিন, তারিখ যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে থাকে এবং বাংলা সনের দিন তারিখ পয়লা বৈশাখ ব্যতীত সমস্ত বছরজুরেই রাষ্ট্রের কাছে উপেক্ষিত থাকে। অন্যদিকে হিজরি সনের দুটি মাস এদেশে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়ে থাকে; তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে নয়। রমযান মাসে মানুষ তাদের নিত্যদিনের হিসেব রমযানের তারিখ ধরে গণনা করেন ঈদের দিন পর্যন্তু এবং কুরবানি ও হজের জন্য জিলহজ মাসের এগারো তারিখ পর্যন্ত মানুষ এই মাসটিকে মনে রাখতে পারে। এ থেকে অনুমান করা যেতে পারে এদেশের মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম, ভাষাপ্রেম, জাতীয়তাবোধ ইত্যাদি বিষয়ে গণ্ডোগোল রয়েছে। মানুষ কোন সনটিকে প্রাত্যহিক কাজকর্মে ব্যবহার করবে; করা উচিৎ আর কোনটিকে তুলে রাখা দরকার সে ব্যাপারে রাষ্ট্রের কোনো দায়দায়িত্ব লক্ষ করা যায় নি। বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতিসত্তার প্রতি গভীর মমতাবোধ থেকে যদি পয়লা বৈশাখ উদযাপনে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা প্রদান করা হয় তাহলে বাংলা সনকে শুধু পয়লা বৈশাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রের প্রত্যেকটা শাখা-প্রশাখায় বাংলা তারিখ ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরী ছিল কিন্তু সেটা আজও হয়ে ওঠে নি। এদেশের দেশপ্রেম, ভাষাপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, বাংলা সনের প্রতি ভালোবাসা সবকিছু যেন পরকীয়া প্রেমের মতো চলে। পরকীয়া প্রেমে যেমন নিজেরটা বাদে পরেরটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়; বাংলাদেশের জাতীয়তাপ্রেম তেমনি এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের কিছু মানুষ নিজেদেরকে বাঙালি জাতিসত্ত্বার মানুষ হিসেবে ভাবতে সাচ্ছন্দবোধ করেন কিন্তু বাংলা সনকে তারা সাদরে গ্রহণ করতে চান নি। চান নি এ কারণে যে, এই সনটি হিজরি সনের আদলে জন্ম নিয়েছে এবং এর জন্মদাতা পিতৃপুরুষও একজন মুসলিম অধিপতি সে জন্যে। তবে আকবর প্রণিত বাংলা সনটি হুবহু একই রকম না থেকে বিভিন্ন সময় এসে সংস্কার হয়েছে। আকবরের সময় বাংলা মাসের প্রতিটি দিনের একটি করে পৃথক পৃথক নাম ছিল। সম্রাট শাহজাহানের সময়ে সপ্তাহ হিসেবে সাত দিনের সাতটি নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কর্তৃক বাংলা সনের আরও সংস্কার করা হয়। এই সংস্কারে সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয় যে, মোঘল আমলে হিজরি সনভিত্তিক যে বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করা হয়েছে তা থেকে সন গণনা করতে হবে এবং মাস গণনার সুবিধার্থে বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রতি মাস ৩১ দিন আর আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিন ধরে গণনা করতে হবে। দুঃখের বিষয় সংস্কার করা বাংলা সনকে বাংলাদেশে আগ্রহসহকারে গ্রহণ করার ব্যাপারে দুইযুগের বেশি সময় ধরে গড়িমসি লক্ষ্য করা গেছে। অবশেষে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুন তারিখে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাংলা সন স্বীকৃতি লাভ করতে পারে। শুধু রাজনৈতিক কারণে বাংলা সনকে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এখন আবার বাংলা সনকে গুরুত্ব না দিয়ে চৈত্রসংক্রান্তির পরের দিনটি পয়লা বৈশাখের এই দিনটিকে শুধু গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বছরের বাকি দিনগুলো মানুষের জীবনযাপনের বাইরেই রয়ে যাচ্ছে। হিজরি সনের গর্ভে বাংলা সনের জন্ম সুতরাং এটির মধ্যেও আরবি-ফারসির গন্ধ রয়েছে এই অজুহাতে বাংলা সনকে গ্রহণ করতে না পারলেও বিদেশি খ্রিস্ট সনকে গ্রহণ করতে কোনো প্রকার আপত্তি দেখা যায় নি। বাংলা সনের অধিকাংশটা তো বাংলারই ছিল তবুও সেটাকে গ্রহণ করা গেল না কিন্ত যে সনটাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করা হলো সেটি সম্পূর্ণই বিদেশী। এই বিদেশী সনটি এখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে; সে স্থানে বাংলাকে প্রবেশ করানো খুব সহজ হবে না।
বিগত কয়েক দশক আগেও বাংলা সনের প্রথম দিন পয়লা বৈশাখ এভাবে উদযাপিত হতো না। চৈত্রসংক্রান্তির দিন বিগত দিনের দেনা-পাওনা সব চুকে দিয়ে পয়লা বৈশাখের দিন নতুন খাতা খুলে বসতো দোকানীরা। ব্যবস্যা-বাণিজ্যের বকেয়া আদায় করতে আয়োজন করা হতো ‘হালখাতা’ নামে মিষ্টিমুখের ছোট ছোট অনুষ্ঠান। কৃষক-কৃষাণীরা নতুন বছরের শুরুতে সমস্ত বছরের নতুন করে পরিকল্পনা তৈরি করে নিত। পরে শুরু হলো শোভাযাত্রা, ইলশিপান্তা, পেয়াজ-কাঁচামরিচ ইত্যাদি। আদতে মঙ্গলশোভাযাত্রা, আনন্দশোভাযাত্রা এসবের মধ্যে অকল্যাণ-কল্যাণের কিছু নাই। বছরের প্রথম দিন, এই বিশ্বাস অন্য কিছু নয়, শুধু সময় গণনার পদ্ধতি, সময়কে বুঝতে পারার কৌশল মাত্র।
তবুও বর্ষবরণের নামে পয়লা বৈশাখ দিনটিকে ঘিরে একটি বিশেষ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। রাজনীতির কারণেই তখনও এবং এখনও বাংলা সনের জন্য রাষ্ট্র কোনো দরদ দেখায় নি। মানুষ নিজের গরজে বাংলা সনকে জিইয়ে রেখেছে। এখনও রাষ্ট্র তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিদেশী সন-তারিখ দিয়ে। বাংলা সনের প্রতি রাষ্ট্রের উদাসীনতা আজকে বাংলা সনকে অন্তরীণ হতে বাধ্য করেছে।
লেখক : গল্পকার কথাসাহিত্যিক