নাজিফা রহমান
একজন ইমিগ্রেন্ট পরিবারের বড় মেয়ে হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা, অন্য ইমিগ্রেন্ট সন্তানদের অভিজ্ঞতা থেকে খুব আলাদা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বড় হতে হতে আমি সবসময়ই নিজেকে এক অদ্ভুত টানাপড়েনের মধ্যে পেয়েছি। কখনো মনে হতো আমি খুব বেশি ‘ব্রাউন’, আবার কখনো মনে হতো আমি যথেষ্ট ‘ব্রাউন’ নই। স্কুলে আমার আমেরিকান বন্ধুদের মাঝে শালওয়ার কামিজ পরে যেতে অস্বস্তি লাগত, আর মনে হতো আমার কাছ থেকে তরকারির গন্ধ আসে কি না। আবার বাসায়, আত্মীয়স্বজনদের মাঝে মনে হতো আমার বাংলা যথেষ্ট ভালো নয়, কিংবা আমি খুব বেশি আমেরিকান সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছি। নিজের পরিচয় আর এই পৃথিবীতে আমার জায়গা কোথায়Ñ এই দ্বন্দ্বের ভেতরেও একটা ব্যাপার নিয়ে কখনো কোনো সন্দেহ ছিল না: আমার দাদার লেগেসি আর তাঁর জন্মভূমির প্রতি আমার ভালোবাসা।
আমার বাবা-মা কখনো আমার দাদার সত্যিকারের পরিচয় আর বাংলাদেশের জন্য তাঁর স্বপ্নের ও ত্যাগের কথা শেখাতে কার্পণ্য করেনি। তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন, যা হবে নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক।
দাদাকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি খুব সীমিত, কিন্তু তাঁর আশপাশের মানুষের জীবনে তিনি যে গভীর প্রভাব রেখে গেছেন, সেসব গল্প শুনে আমি তাঁকে যেন খুব কাছ থেকে চিনেছি। এই গল্পগুলো বাংলাদেশের কিছু প্রচারমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ছড়ানো অপপ্রচারের চিত্রের সঙ্গে একেবারেই মেলে না।
দাদার কথা ভাবলে আমার মনে পড়ে, আমার মা কী মায়া নিয়ে বলতেন তার ডেন্টাল ক্লিনিক থেকে দিনশেষে বাসায় ফিরলে দাদা তাঁর জন্য জেগে থাকতেন, শুধু বৌমার নিরাপত্তার চিন্তায়। মনে পড়ে, সকালের পত্রিকা পড়ার সময়ে তিনি ল্যাপটপে স্কাইপ অন করে রাখতেন, আর সুদূর আমেরিকাতে আমি তখন তাঁর এক বছরের নাতনি খেলনা নিয়ে খেলছি দেখে নিশ্চিন্ত হতেন। মনে পড়ে, বাবা একবার বলেছিলেন জীবনে একমাত্র যেদিন তিনি দাদাকে একটু রাগ করতে দেখেছিলেন, সেটা ছিল যখন বাবা পরীক্ষার পড়া না করে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। দাদির চোখের সেই ঝিলিকও মনে পড়ে, যখন তিনি বলতেন দাদা কতটা যত্নশীল আর সহানুভূতিশীল মানুষ ছিলেন।
আমার কাছে খুব অবাক লাগে, এই মানুষটিকে যিনি আমার কুরআন তিলাওয়াত শুনতে চাইতেন, ছোট বাচ্চাদের জন্য সবসময় বিস্কুট সঙ্গে রাখতেন সেই মানুষটিকে মিডিয়ায় দেখানো ‘অপরাধী’ পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে। অনেকের কাছে তাঁর জীবন ভিন্নভাবে দেখা হতে পারে, কিন্তু আমি তাঁকে চিনি একজন স্নেহশীল মানুষ হিসেবে, যিনি নিজের দেশের কল্যাণের জন্য ত্যাগ স্বীকারে বিশ্বাস করতেন।
দাদার ফাঁসির সময় আমার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। কিন্তু সেই বয়সেও আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এটা অন্যায়। দাদার প্রতি এই অন্যায়, তাঁর সহযোদ্ধাদের প্রতি অন্যায়, আর বাংলাদেশের মানুষের প্রতি অন্যায় এসব আমার ভেতরে এক আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, যা পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেয়। ছোটবেলা থেকেই আমি দেখেছি, বাবা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার উন্নতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, অনেকটা সময় ওয়াশিংটন ডিসিতে কাটিয়েছেন। ন্যায়বিচারের জন্য তাঁর অটল সংগ্রাম আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। বাবার জীবনে সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল নিজের বাবাকে হারানো, কিন্তু তাতেও তিনি ভেঙে পড়েননি। এমনকি যাদের একসময় বন্ধু বলতেন, তাদের নিষ্ঠুর কথাও তাঁকে থামাতে পারেনি।
দাদা আমার জন্য একটি লেগেসি রেখে গেছেন, আর বাবা আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে লড়তে হয়, কীভাবে পৃথিবী ভেঙে পড়ছে মনে হলেও শক্ত থাকতে হয়। অনেক দিন পর্যন্ত দাদার রেখে যাওয়া কাজগুলো থেকে আমি এক ধরনের দায়বদ্ধতা অনুভব করেছি। মা সবসময় বলতেন, এমনভাবে জীবন-যাপন করতে হবে যাতে আমি আখিরাতে দাদার মুখ উজ্জ্বল করতে পারি। তখন ভয় হতো আমি হয়তো কখনোই তাঁর নামের মর্যাদা রাখতে পারব না।
কিন্তু এখন আমি তাঁর রেখে যাওয়া কাজকে অন্যভাবে দেখি। এটা এখন আমার জীবনের উদ্দেশ্য, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রেরণা। দাদার লেগেসি আমার মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি করেছে, আর দেশটাকে সফল হতে দেখার এক তীব্র আকাক্সক্ষা জাগিয়েছে। আমি গর্বের সঙ্গে বলি, মতিউর রহমান নিজামী আমার দাদা। তাঁকে স্তব্ধ করে দেওয়ার, মানুষের কণ্ঠ রোধ করার যত চেষ্টাই করা হোক না কেন, তাঁর সত্য ন্যায়ের স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে। তিনি বহু মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন, আর আমিও আশা করি তাঁর সেই লেগেসি বহন করে যেতে পারব, ইনশাআল্লাহ।
শহীদ মতিউর রহমান নিজামীর নাতনি,
যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটির স্নাতক শিক্ষার্থী।