ড. মোহাম্মদ নাকিবুর রহমান

আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগে আমার বাবা, মতিউর রহমান নিজামীকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার অন্যায়ভাবে ফাঁসি দিয়েছিল। এক দশক পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এমন একটা দিনও যায়নি যেদিন তার স্মৃতি আমার চিন্তা, মূল্যবোধ আর জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে না। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমার আব্বুকে শহীদের মর্যাদা দান করেন এবং আমাদের সবাইকে জান্নাতে আবার একত্রিত করেন।

গত কয়েক বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়েছে, যারা আব্বুকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। শিক্ষক, রিকশাচালক, রাজনীতিবিদ, ছাত্র, ইসলামী আন্দোলনের কর্মী, ব্যবসায়ী, গ্রামের সাধারণ মানুষÑ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর গল্প শুনিয়েছেন। আর সবার গল্পের মধ্যে একটা জিনিস বারবার ফিরে এসেছে: আব্বু ছিলেন অসম্ভব দয়ালু এবং ভীষণ gracious একজন মানুষ।

অনেকেই আমাকে একই কথা বিভিন্নভাবে বলেছেন। তারা বলতেন, আপনি যদি শত মানুষের ভিড়ের মাঝেও নিজামী ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতেন, তিনি আপনাকে এমন অনুভব করাতেন যেন আপনি-ই সেই রুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তিনি পুরো মনোযোগ দিয়ে কথা শুনতেন। ধৈর্য নিয়ে শুনতেন। কখনো তাড়াহুড়ো করতেন না। আজকের এই সময়ে এটা খুব বিরল। এখন বেশিরভাগ মানুষ শোনে উত্তর দেওয়ার জন্য। কিন্তু আব্বু শুনতেন বোঝার জন্য।

আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করে যে বিষয়টা, এত বড় বড় অর্জনের পরও তিনি কখনো অহংকারকে নিজের ভেতরে ঢুকতে দেননি।

তিনি ছিলেন অল পাকিস্তান ইসলামী জমিয়তে তালাবার শেষ কেন্দ্রীয় সভাপতিÑ উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ছাত্র সংগঠনগুলোর একটি। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান থেকে কেউ সেই জায়গায় পৌঁছানো তো দূরের কথা, কল্পনাও করতে পারত না।

এ ধরনের বিনয় আজকাল খুব কম দেখা যায়।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে অনেকেই ত্যাগ ছাড়া নেতৃত্ব চায়, সংগ্রাম ছাড়া পরিচিতি চায়, সেবা ছাড়া সম্মান চায়। আব্বু আমাদের উল্টোটা শিখিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন সত্যিকারের বড়ত্ব অনেক সময় খুব সাধারণ জীবনযাপনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।

সূরা ফুরকানের ৬৩ নম্বর আয়াত পড়লেই আমার চোখের সামনে আব্বুর চেহারা ভেসে ওঠে:

“রহমানের বান্দা তো তারাই, যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে। আর যখন অজ্ঞ লোকেরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে ‘সালাম’।”

আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, আব্বু এই আয়াতটাকে নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে নিয়েছিলেন।

তিনি কখনো তর্কে জড়াতে পছন্দ করতেন না। মানুষের উসকানি উপেক্ষা করার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, যেন তিনি অদৃশ্য কোনো noise-canceling headphone পরে থাকতেন। আমি নিজের চোখে বহুবার দেখেছি মানুষ তাঁকে অপমান করার চেষ্টা করছে, রাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তিনি হয় চুপ থাকতেন, না হয় হালকা হেসে ‘সালাম’ বলে দিতেন। তাঁর কাছে নীরবতা ছিল শক্তি।

ছোটবেলায় আমি অনেকবার সংসদে গ্যালারি থেকে আব্বুর বক্তব্য শুনেছি। চারপাশে হট্টগোল, চিৎকার, বাধা কিন্তু তিনি সবসময় শান্ত থাকতেন। এখনো মনে আছে, একবার তিনি স্পিকারকে বলেছিলেন: ‘Mr. Speaker, please keep my microphone on. I can handle the chaos.’

ওই শান্ত থাকা দুর্বলতা ছিল না। সেটা ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে এক টিভি অনুষ্ঠানে আনিসুল হক বারবার আব্বুকে ব্যঙ্গ করে প্রশ্ন করছিলেন, ‘জামায়াত ক্ষমতায় এলে কি নর্তকীদের বোরকা পরে নাচতে হবে?’

অধিকাংশ মানুষ হয়তো রেগে যেতেন। কিন্তু আব্বু প্রশ্নটাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে দেশের আসল সমস্যা নিয়ে কথা বলে গেছেন, যেন তিনি প্রশ্নটাই শোনেননি। ‘অজ্ঞরা যখন সম্বোধন করে, তারা বলে সালাম’Ñ এই আয়াতের বাস্তব উদাহরণ যদি কাউকে বলতে হয়, আমি এই ঘটনাটার কথাই বলব।

এত ব্যস্ততার মাঝেও আব্বু আশপাশের ছোট ছোট জিনিস খুব খেয়াল করতেন।

তিনি সবসময় সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোন পায়জামার সঙ্গে কোন পাঞ্জাবি যায় সেটা তিনি নিখুঁতভাবে বুঝতেন। আমরা যদি ভুল করে অন্যটার সঙ্গে মেলাতাম, তিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলতেন। আজও বুঝি না, এত মিল থাকা কাপড়ের পার্থক্য তিনি কীভাবে ধরতেন!

আমার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলোর একটি হলো, আব্বু বাসায় ফিরলে আমি তাঁর জুতা-মোজা খুলে দিতাম। অবাক করার মতো বিষয়, তিনি বুঝতে পারতেন কোন মোজাটা ডান পায়ের আর কোনটা বাম পায়ের। ভুল করে উল্টো দিলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যেতেন।

এখন এসব ছোট ছোট স্মৃতি মনে পড়লে চোখ ভিজে যায়। তখন সেগুলো খুব সাধারণ মুহূর্ত মনে হতো। আজ বুঝি, সেগুলো কত মূল্যবান ছিল।

আরেকটা ঘটনা এখনো মনে পড়লে হাসি পায়।

সম্ভবত ১৯৮৯ সালের ঘটনা। তখন আমার বয়স বারো। আমরা বাসার ভেতরে ক্রিকেট খেলছিলাম। একসময় টেনিস বল গিয়ে ড্রইংরুমের কাচ ভেঙে ফেলল। ভয় পেয়ে আমরা একটা চেয়ার দিয়ে কাচটা ঢেকে রাখলাম। কিন্তু আব্বু বাসায় ঢুকেই সব বুঝে ফেললেন। তিনি খুব খুশি হননি!

এখন মনে হলে হাসি পায় — তাঁর চোখ এড়াতোই না কিছু।

আব্বুর হাস্যরসও ছিল খুব আলাদা। খুব সূক্ষ্ম। কখনো জোরে নয়।

এক সকালে নাশতার টেবিলে আম্মু খুব রাগান্বিত ছিলেন এবং সেটা লুকাচ্ছিলেন না। আমি আব্বুর দিকে তাকালাম। ভাবলাম তিনি হয়তো সিরিয়াস কিছু বলবেন। কিন্তু তিনি হালকা হেসে বললেন:

‘আমি শুধু দেখছি তাওয়া কত গরম।’

এভাবেই তিনি পরিস্থিতি শান্ত করতেন কাউকে কষ্ট না দিয়ে।

তিনি আমাদের সবার কাছ থেকেই সর্বোচ্চটা আশা করতেন। কিন্তু কখনো অতিরিক্ত প্রশংসা করে আমাদের মাথা বড় হতে দেননি। তিনি চাইতেন আমরা যেন মাটির মানুষ থাকি।

২০০৫-২০০৬ সালে আমি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়াতাম। আমার এক ছাত্রী, যিনি তৎকালীন পরিকল্পনা সচিবের মেয়ে ছিলেন, এক বিয়ের অনুষ্ঠানে আব্বুর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি পরিচয় দেন যে তিনি আমার ছাত্রী। আব্বু খুব স্বাভাবিকভাবে হেসে বলেছিলেন:

‘ও কি কিছু পড়াইতে পারে?’

পরে ছাত্রীটি হাসতে হাসতে আমাকে গল্পটা বলেছিল। এটাই ছিল আমার আব্বু। তিনি কখনো আমাদের নিয়ে গর্ব করে কথা বলতেন না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমাদের জন্য দোয়া করতেন, চাইতেন আমরা যেন ভালো মানুষ হই।

আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগের স্মৃতিগুলোর একটি হলো যেদিন আমি পিএইচডি ডিফেন্স শেষ করে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করি।

আমি সঙ্গে সঙ্গে আম্মুকে ফোন করি। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘তোমার আব্বু অনেক খুশি হবে। আমি জেলে খবর পাঠাচ্ছি।’ পরে জানতে পারি, খবর শুনে আব্বু এত খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি জেলে মিষ্টি পাঠাতে বলেছিলেন। তারপর নিজের হাতে সবার মাঝে সেই মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন।

এ ধরনের মুহূর্ত মানুষকে অসহায় করে দেয়।

খুব ইচ্ছে করে, আরেকবার তাঁকে জড়িয়ে ধরি। কপালে একটা চুমু দিই। কিন্তু হয়তো দুনিয়া কাউকে সবকিছু দেয় না। কিছু পুনর্মিলন আখিরাতের জন্যই তুলে রাখা হয়।

তাই আমরা শুধু দোয়া করি, আল্লাহ যেন জান্নাতে আবার আমাদের একত্রিত করেন।

দশ বছর চলে গেছে। আরও বিশ বছর চলে যেতে পারে। প্রজন্ম বদলাবে। কিন্তু আব্বু যে প্রভাব রেখে গেছেন, সেটা মুছে ফেলা যাবে না। তাঁর দয়া, বিনয়, ধৈর্য আর অটল ঈমান পৃথিবীর অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।

আর তাঁর সেই উত্তরাধিকার বেঁচে থাকবে।

শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর জ্যেষ্ঠ সন্তান ও যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারেলিনার অধ্যাপক