বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে যে কজন ব্যক্তি তাঁদের মেধা, প্রজ্ঞা, যুক্তি এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমে সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর করে তুলেছিলেন, শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাই ছিলেন না, বরং জাতীয় সংসদে গঠনমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসন থেকে দুবার নির্বাচিত এই জননেতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সংসদে যে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন, তা আজও দেশবাসীর হৃদয়ে অম্লান।
সংসদীয় নেতৃত্বের শুভসূচনা
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১৯৯১ সালে তাঁর জন্মস্থান পাবনা-১ নির্বাচনী এলাকা থেকে পঞ্চম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সংসদে তিনি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তিনি সংসদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কার্য উপদেষ্টা কমিটি, প্রিভিলাইজ কমিটি, পিটিশন কমিটি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
২০০১ সালে তিনি পুনরায় একই এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দ্বিতীয়বারের মতো সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অষ্টম সংসদে তিনি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কার্য উপদেষ্টা কমিটি এবং কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
বাবরী মসজিদ ইস্যুতে ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর ভারতে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংস করা হলে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর সাথে বাংলাদেশের তৌহিদী জনতাও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেই সময় জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় নেতা হিসেবে মাওলানা নিজামী জাতীয় সংসদে এই ন্যক্কারজনক ঘটনার ওপর আলোচনার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যদিও শুরুতে তৎকালীন সরকারি ও প্রধান বিরোধী দল এই আলোচনায় রাজি ছিল না, কিন্তু মাওলানা নিজামীর অনমনীয় অবস্থান এবং সংসদীয় দলের চাপে শেষ পর্যন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সংসদে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “বাবরী মসজিদ নিছক একটি ইমারত নয়; এটি ইসলামী আদর্শ, ইতিহাস এবং সভ্যতার এক বিরল প্রতীক। একে ধ্বংস করা মানে একটি সভ্যতার ওপর আঘাত।” তিনি আরও দূরদর্শিতার সাথে উল্লেখ করেছিলেন যে, এই ঘটনার পেছনে ভারতীয় আধিপত্যবাদের লক্ষ্য ছিল সার্ককে অকার্যকর করা। তাঁর সেই তথ্য ও যুক্তিভিত্তিক বক্তব্য কেবল সংসদ সদস্যদেরই নয়, বরং পুরো জাতিকে আলোড়িত করেছিল।
ফারাক্কা ও পানি সমস্যা: জীবন-মরণ যুদ্ধের ডাক
ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের মানচিত্র যখন মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার উপক্রম, তখন মাওলানা নিজামী সংসদে ফারাক্কা ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তাঁর নেতৃত্বে জামায়াতের ২০ জন সংসদ সদস্য একযোগে দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর জোরালো দাবির মুখে সংসদে ফারাক্কা ইস্যুতে বিশেষ আলোচনা হয়।
তিনি তথ্যের ভিত্তিতে প্রমাণ করেছিলেন যে, ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৩ লক্ষ একর জমি সরাসরি এবং লোনা পানির অনুপ্রবেশের কারণে ৬৪ লক্ষ একর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি এই ক্ষতিপূরণ আদায়ে আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার প্রস্তাব দেন এবং মেক্সিকো-আমেরিকার কলোরাডো নদীর উদাহরণ টেনে আন্তর্জাতিক আইনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তাঁর এই ভূমিকা বাংলাদেশের পানিবণ্টন আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
আন্তর্জাতিক সংহতি: বসনিয়া ও পুশব্যাক ইস্যু
মাওলানা নিজামী ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক মানের নেতা। বসনিয়া-হারজেগোভিনায় মুসলিমদের ওপর সার্ব বাহিনীর পৈশাচিক গণহত্যার বিরুদ্ধে তিনি সংসদে আলোচনার নোটিশ দেন। সংসদের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর প্রথমবারের মতো সার্ব বাহিনীর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। মোট এক ঘণ্টার আলোচনার মধ্যে মাওলানা নিজামী একাই আধা ঘণ্টা বক্তব্য রাখেন, যা উপস্থিত সকল সদস্যের চোখে পানি এনে দিয়েছিল।
এ ছাড়া ভারত সরকার যখন মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশব্যাকের (Pushback) ষড়যন্ত্র শুরু করে, তখন মাওলানা নিজামী সংসদে-এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি একে ‘পুশব্যাক’ এর পরিবর্তে ‘পুশইন’ (Push-in) বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর এই মোক্ষম যুক্তি ও শব্দচয়ন সংসদীয় বিতর্কে ভারতের চক্রান্তকে বিশ্ববাসীর সামনে নগ্ন করে দেয়।
জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গ
বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যু যখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে, তখন জাতীয় সংসদে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইসলাম শান্তি, মানবতা ও ন্যায়বিচারের ধর্ম; নিরীহ মানুষ হত্যা, বোমা হামলা কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ইসলামের শিক্ষা হতে পারে না। তিনি সংসদে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের পাশাপাশি এ সমস্যার রাজনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেন।
মাওলানা নিজামী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, জঙ্গীবাদ মোকাবিলায় কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, সুশিক্ষা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও জরুরি। তিনি এও বলেন যে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য “জঙ্গীবাদ” শব্দকে অপব্যবহার করা হলে প্রকৃত সমস্যা আড়ালে থেকে যাবে।
তিনি সংসদে আরও বলেন, ইসলামের নামে যারা চরমপন্থা ও সহিংসতার পথ বেছে নেয় তারা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। দেশের আলেম-উলামা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সচেতন নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে জঙ্গীবাদ প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা, তেমনি ছিল জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ।
কওমি ও আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে বিপ্লব
মাওলানা নিজামীর জীবনের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল ফাজিল ও কামিল ডিগ্রিকে যথাক্রমে স্নাতক (ডিগ্রী) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স)-এর সমমান প্রদান। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০০৬ সালে মন্ত্রিসভার বিশেষ কমিটির মাধ্যমে তিনি এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে দেশের হাজার হাজার মাদরাসা শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটে এবং তারা মূলধারার শিক্ষার সাথে তাল মিলিয়ে চলার সুযোগ পায়।
উত্তরসূরিদের পদযাত্রা: নতুন দিগন্তের পথে
ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ২০১৬ সালের ১১ মে এই মহান নেতাকে শাহাদাত বরণ করতে হয়েছে। কিন্তু আজ ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে এবং নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। শহীদ নিজামী যে ইনসাফ কায়েমের স্বপ্ন দেখতেন, আজ সেই পথে তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরিরা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর সন্তান আজ পিতার আসনেই সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন, যা শহীদ নিজামীর আদর্শিক বিজয়েরই এক অনন্য প্রতিফলন।
নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার নাম
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সংসদীয় ঐতিহ্য, যুক্তিভিত্তিক রাজনীতি এবং দেশপ্রেমের আদর্শ বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে। তিনি দেখিয়ে গেছেন কীভাবে সংসদে শোরগোল না করে যুক্তি ও তথ্য দিয়ে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে হয়। বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে শহীদ মাওলানা নিজামীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আজকের সংসদ সদস্যদের জন্য তাঁর জীবন ও কর্ম এক অফুরন্ত শিক্ষার উৎস।
বর্তমানে দেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পর নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই নতুন প্রজন্মের সংসদ সদস্যদের সামনে অতীতের গঠনমূলক সংসদীয় রাজনীতির উদাহরণ হয়ে আছেন মাওলানা নিজামী। বিশেষ করে তাঁর উত্তরসূরিরা আজ সংসদে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন এবং তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও সংসদীয় ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
পাবনা-১ আসনে আজ তাঁর সন্তান সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা নয়; বরং একটি আদর্শিক উত্তরাধিকারেরও প্রতিফলন। জনগণের কল্যাণ, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার যে চেতনা মাওলানা নিজামী ধারণ করতেন, সেই চেতনাই নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।