জুলাই বিপ্লব আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম অর্জন। ছাত্র-জনতার এ যুগপৎ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের অপশাসন-দুঃশাসন থেকে দেশ ও মুক্তি লাভ করেছিলো। আর এ বিজয় হয়েছিলো শত-সহস্র প্রাণের বিনিময়ে। মূলত, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে একটি অহিংস আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে তীব্র গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহিংস দমন-পীড়নের প্রতিবাদে এটি পরবর্তীতে স্বৈরাচারবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে পরিণত হয়। এ তীব্র আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

১ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামেন। মাসের মাঝামাঝি সময়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দেশব্যাপী ব্যাপক বলপ্রয়োগ ও গুলিবর্ষণ করা হলে আন্দোলন তীব্র হতে তীব্রতর হয় এবং তা ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসন পতনের একদফা দাবিতে পরিণত হয়। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা ‘মার্চ টু ঢাকা’ বা ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচির ডাক দেন। ঢাকার রাজপথে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে এবং আন্দোলনের মুখে ওই দিনই সরকার পতন ঘটে। সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়ন এবং পরবর্তী সংঘাত ও সহিংসতায় অগণিত ছাত্র ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান এবং আহত হন। এ বিপ্লবের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। আর সে সরকারের অধীনে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসে এবং প্রধান বিরোধী দল হিসাবে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও মহান স্বাধীনতা আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। তাই এ অর্জনকে কোন কিছুর সমান্তরাল করার সুযোগ নেই। তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবও আমাদের জন্য ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জল অধ্যায়। কারণ, এ বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ ও জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা আওয়ামী ফ্যাসিবাদ এবং আধিপত্যবাদের দোসরদের লজ্জাজনক পতন হয়েছিলো। তাই একথা বলতে কুন্ঠিত হওয়ার সুযোগ নেই যে, জুলাই বিপ্লব আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। তবে কেউ কেউ এমন দাবির সাথে দ্বিমত করতে কসুর করেন। কিন্তু তাদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, আওয়ামী বাকশালীরা আমাদের স্বাধীনতার চেতনা ও জাতিস্বত্তার ভিত্তিমূলকেই ভুলুন্ঠিত করেছিলো। জুলাই বিপ্লব আমাদের সে চেতনাকে নতুন করে সঞ্জিবনী শক্তি দিয়েছে। আমরা নতুন করে বাঁচতে ও দেশ গড়ার প্রেরণা লাভ করেছি। মূলত, জুলাই বিপ্লব আমাদের স্বাধীনতাকে নতুন করে প্রাণশক্তি দিয়েছে। তাই এমন কথা বলা মোটেই যুক্তিযুক্ত ও কাক্সিক্ষত হবে না যার মাধ্যমে জুলাই চেতনার প্রতি অসম্মান ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব যে শুধু আওয়ামী ফ্যাসিবাদী অপশাসন-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সংঘঠিত ছাত্র-জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থান এমনটা নয় বরং আমাদের দেশে চলমান নেতিবাচক রাজনীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কারণ, স্বাধীনতা পরবর্তী কোন সরকারই জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি পুরোপুরি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারেনি। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বারবার ক্ষমতার পালাবদল হলেও জনগণের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি বরং শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করে নিয়েছে। বিত্ত-বৈভব ও শান-শওকত বেড়েছে একশ্রেণির রাজনীতিক এবং তাদের তল্পিবাচকদের। মূলত, এরাই দেশেটাকে দুগ্ধবতী গাভীতে পরিণত করে মর্জি মাফিক দোহন করেছে। প্রায় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক শক্তিগুলো গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সুবিধাবাদী ব্যাখ্যা করে এসেছে। ফলে আমাদের দেশে আইন, সাংবিধানিক ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায়নি। সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি গণমানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকারেরও। ফলে স্বাধীনতার সুফলগুলোও আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি বরং নেতিবাচক রাজনীতির কারণে তা আমাদের অধরাই রয়ে গেছে।

মূলত, ক্ষমতাকেন্দ্রীক বিভেদের রাজনীতির কারণেই আমাদের স্বাধীনতা অর্থবহ হয়ে ওঠেনি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশ ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা জরুরি হলেও রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার দেশ ও জাতিকে বিভক্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে। একই সাথে তারা সৃষ্টি করেছে সুবিধাভোগী শ্রেণি। যারা রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য নানাবিধ বয়ান তৈরি করে জাতিকে বহুধাবিভক্ত করেছে। এমনকি অবৈধভাবে নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য নানাবিধ কালাকানুন তৈরি করে অপশান ও দুঃশাসন চালিয়েছে নির্বিঘ্নে। কেড়ে নেওয়া হয়েছে গণমানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একশ্রেণির রাজনীতিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার অনুষঙ্গে পরিণত করেছে। এখানেই শেষ নয় বরং নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য নতুন নতুন চেতনা তৈরি করতেও কসুর করেনি। মূলত, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে একশ্রেণির জ্ঞানপাপি সৃষ্টি হয়েছে, যারা ব্যক্তিস্বার্থে সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে বা মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে বয়ান তৈরি করতে সিদ্ধহস্ত। তারা রাজনীতিকে গণমানুষের কল্যাণের পরিবর্তের নিজেদের ব্যবসার অনুষঙ্গ বানিয়েছে। এমনকি তারা ইতিহাস বিকৃতিও বেশ করিৎকর্মার পরিচয় দিয়েছে। এদের প্রধান কাজই হলো চেতনা ব্যবসাকে অধিকতর লাভজনক করার জন্য সংঘঠিত ঘটনার পক্ষপাতদুষ্ট ব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা। এভাবেই চালানো হয়ে প্রায় ১৬ বছরের অপাশাসন-দুঃশাসন। এ সময় পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। গণপ্রশাসন, আইন ও বিচারবিভাগ, শিক্ষাপ্রশাসন সহ রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হয়েছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে পরিণত করা হয়েছিলো রীতিমত দলদাস কমিশনে। দুর্নীতি দমন কমিশনে বানানো হয়ছিলো বিরোধী দল দমনের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে। বিরোধী দলের ওপর মামলা, হামলা, গণগ্রেফতার, রিমাণ্ড, হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য সহ নানাবিধ জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে দেশকে রীতিমত ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলো। ইতিহাসের এক নির্মম বাস্তবতায় ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মাধ্যমে সে অবস্থার অবসান হয়েছে। তবে কেন এ বিপ্লব অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠেছিলো, ছাত্র-জনতা কেনই বা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন তা অবশ্য আলোচনার দাবি রাখে। আপাতদৃষ্টিতে এ আন্দোলন সময়ের ব্যাপ্তিতে সংক্ষিপ্ত হলেও এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সুদূরপ্রসারী ও বৈচিত্র্যময়।

একথা কারো অজনা নয় যে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা দুর্নীতি আর দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ। আর দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে এ দেশের নষ্ট রাজনীতি সর্বোপরি একশ্রেণির বিপথগামী রাজনীতিকরা। এ দেশের মানুষ কোনও সরকারের কাছ থেকে খুব বেশি সামাজিক বা অর্থনৈতিক সুরক্ষা আশা করে না; অথচ এরা দেখেছে রাজনৈতিক সরকারেরা শুধু একশ্রেণির মানুষকে সুরক্ষা দিতে চেয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রেই বড় ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। সম্পদের সুসম বণ্টন করা সম্ভব হয়নি। তাই মানুষে মানুষে আয় বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনীতি পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই কলুষিত করে ফেলেছে। লাগামহীন দুর্নীতির ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কথিত রাজনীতির জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়েছেন একশ্রেণির তথাকথিত রাজনীতিক। এমনটা দেখা গেছে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে। রাজনীতির বিশেষ মহলগুলো বিশেষ মানুষদের ভাগ্য বদলেছে, দেশের মানুষের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে। এ যাবতীয় অনাচারের কোনও জবাবদিহিতা ছিল না বা এখনো নেই। ফলে রাজনীতির কল্যাণকামীতা থেকে সাধারণ মানুষ বরাবরই বঞ্চিত থেকেছেন।

স্বার্থান্ধ ও অপরাজনীতির কারণে রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রেই বৈষম্য যখন সকল সময়ের সীমা অতিক্রম করেছিলো তখনই জুলাই বিপ্লব অবশ্যাম্ভাবী হয়ে ওঠে। এমন বাস্তবতায় ২০২৪-এর জুলাই-এর ছাত্র আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী প্রতিবাদ হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছিলো। এ আন্দোলনের শৌর্য যদিও প্রকাশ পেয়েছে রাজপথে, কিন্তু এ আন্দোলনের চেতনা দেশের আপামর মানুষ ধারণ করেছে বহুদিন ধরে অস্থিমজ্জায়, যদিও তা পূর্বে কোনও সংগঠিত রূপ প্রকাশ পায়নি। কেউ কেউ এ আন্দোলনকে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসাবে দাবি করলেও বাস্তবতা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ আন্দোলন যদি শুধু ছাত্রদের সরকারি চাকরির বাজারের বৈষম্যের বিরুদ্ধে হবে, তবে এ আন্দোলন কেন সর্বজনীন রূপ নিলো? কেন সর্বস্তরের মানুষ পরোক্ষ আর প্রত্যক্ষভাবে এ আন্দোলনকে আপন করে নিলো। খাবার, পানি নিয়ে কেন আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা রাজপথে নেমে এলো? কেন মানুষ সিজদাহ অবনত সহ প্রার্থনায় রত হলো এ আন্দোলনের চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য? কেন ৯ দফা থেকে ১ দফায় পরিণত হলো? এ উত্তরগুলো মিলবে তখনই, যখনই এ আন্দোলনকে দেখা হবে এক নিপীড়ন, বঞ্চনা আর অবিচারবিরোধী সংগ্রাম হিসেবে।

অবশ্য এ আন্দোলন ‘অভ্যুত্থান’ নাকি ‘বিপ্লব’, তা নিয়ে যথেষ্ট তাত্ত্বিক গবেষণা, আলোচনা ও সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। কেউ বলতে চাচ্ছে, এটা ‘গণঅভ্যুত্থান’ কারণ প্রায় সর্বস্তরের মানুষের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক অংশীদারিত্ব এখানে ছিল বিভিন্নভাবে। কারণ ভিন্ন থাকলেও উদ্দেশ্য ছিল এক, যেমন একটা অগণতান্ত্রিক, জনবিচ্ছিন্ন সরকারকে হটানো। অন্যদিকে যারা এটাকে বিপ্লব বলে আখ্যা দিতে চান, তারা দেখেন এ আন্দোলন কোনও বিশেষ এলাকায় বা বিশেষ সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটা মানুষের মনোজগৎকে নাড়া দিয়েছিল সার্বিকভাবে, অন্যায়কে রুখে দিতে প্রেরণা জুগিয়েছিল, প্রতিবাদী মানুষকে রাজপথে এনেছিল, ঢিল আর গুলতি নিয়ে বন্দুকের নলের সামনে দাঁড় করানোর সাহস জুগিয়েছিল। আন্দোলনকারীরা একের পর এক তাদের পদ্ধতি পাল্টাচ্ছিলেন, যাবতীয় রাষ্ট্রশক্তির সামনে এরা ছিলেন অকুতোভয়, দুর্বার ও আপসহীন। দেশ ও জাতির মুক্তির জন্য আত্মত্যাগে বলীয়ান হওয়ার ঘটনা শুধু বিপ্লবেই পরিলক্ষিত হয়। জুলাই বিপ্লবে তেমনটিই লক্ষ্য করা গেছে। দেশের তরুণ ছাত্ররা যখন সরকারি বাহিনীর গুলিকে বুকে ধারণ করার সাহস দেখাচ্ছিল, তখন তাকে আর বৈপ্লবিক না ভাবার কোনও কারণ দেখা যায় না। এ আঙ্গিকে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ‘বিপ্লব’ এতে কোন সংশয় নেই।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হলেও এর বিপ্লবী পরিভাষা ছিল সরকারের একচেটিয়া অন্যায়, বৈষম্য ও জুলুমের বিরুদ্ধে। ‘বৈষম্য’ যখন নগ্ন আকারে সর্বজনীন হয়ে পড়ে, তখন তা হয়ে যায় নিপীড়ন ও দুঃশাসন। পরীক্ষিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কখনও কখনও কৌশলে বৈষম্য তৈরি করা হয়; যা মূলত করা হয় সূক্ষ্মভাবে। যদি কোন রাষ্ট্র কোন বিশেষ শ্রেণির ক্ষেত্রে এমন শর্ত জুড়ে দেয় যে, যখন তা বিশেষ কোনও বর্ণের বা এলাকার অধিবাসীদের বিশেষ সুবিধা দেয় বা কোনও গোষ্ঠীকে অসুবিধায় ফেলে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে একটা অগণতান্ত্রিক সরকার যখন প্রকাশ্যে একটা বিশেষ এলাকার, বিশেষ রাজনৈতিক ঘরানার মানুষদের নগ্নভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়, চাকরি ও ব্যবসা তাদের হাতে তুলে দেয়, তখন আর তা বৈষম্য থাকে না, হয়ে যায় স্পষ্ট দুঃশাসন। এ দুঃশাসন যাবতীয় সীমালঙ্ঘন করে তখন, যখন বছরের পর বছর নির্লজ্জভাবে একই ধারা চলে, আর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যখন প্রকাশ্যে অন্য দেশের কাছে ইজারা দেওয়া হয়, তখন দেশ ও দেশের মানুষের অস্তিত্ব যাবতীয়ভাবে অনিরাপদ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করে যখন নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়, তখন জনক্ষোভ বিপ্লবে পরিণত হয়।

তাই সরকারি চাকরিতে বৈষম্যবিরোধী দাবির পক্ষে ছাত্রদের যে প্রতিবাদ তা ছিল কাক্সিক্ষত ও যৌক্তিক। বিগত দু’দশকে সাধারণ মানুষ বুঝে গিয়েছিল এ দেশের রাজনৈতিক সরকারেরা তাদের প্রতি বৈষম্য ও অধিকার হরণ করে; এরা মূলত একটা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধার করতে সরকারে যেতে বা থাকতে মরিয়া; এরা সরকারি প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থ হাতিয়ে নেয়।

এমন অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতায় রাজনৈতিক সরকারগুলোর ওপর মানুষের এ বিশ্বাস একবারে উঠে গেলো তখন, যখন মানুষ দেখলো জনগণের ম্যান্ডেটকে থোড়ায় কেয়ার করে কোনও ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়ে পাঁচ বছর রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা যায়; ভোটের নামে পুলিশ আর সরকারি লোক দিয়ে ভোটারবিহীন নির্বাচনেও ব্যালট বাক্স ভরা যায়। দুর্নীতির মাধ্যমে দেশকে দেউলিয়া করে দিতে রাষ্ট্রের কর্তাদের বুক কাঁপে না। এ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দিক তরুণ সমাজের রাষ্ট্রচিন্তা ও হাল না ছাড়ার আপসহীন মানসিকতা। ধনী-দরিদ্র-মধ্যবিত্ত সব শ্রেণি থেকে উঠে আসা যুবসমাজ যাদের কেউ সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানে পড়ে, আবার কেউ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত, এমন সবাই এককাতারে এসে লড়েছে এ বিপ্লবী আন্দোলনে।

এ বিপ্লবের প্রেক্ষাপট বহুমাত্রিক। ছাত্র-জনতার বিপ্লব বা অভ্যুত্থান হলেও এর প্রেক্ষাপট নির্মাণে বিরোধী রাজনৈতিক দল বা প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অগণতান্ত্রিক আর আনুষ্ঠানিক নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের জনভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। স্বার্থহীন, দুঃসাহসী সংগ্রামীর অভাব তাদের ছিল। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার পেটুয়া বাহিনীদের দিয়ে বিরোধী শিবিরের আন্দোলনকে শক্তহাতে দমন করতে তাই খুব বেশি বেগ পায়নি। তবে এটা ঠিক যে বহুদিন ধরে এ দেশে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো খুব বেশি একটা সাফল্য পায় না এর জনসম্পৃক্ততার অভাবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি সচেতন বা শিক্ষিত জনগণের বিশ্বাসহীনতা দেখা যায়। তাই তো সংগ্রাম পরবর্তীকালে এ দেশের বিজয়ী তরুণ তুর্কিরা চায় নষ্ট, দুর্নীতিবাজ আর দলীয় দালালমুক্ত সিস্টেম। তাদের দাবি, শুধু দলীয় সরকার পরিবর্তন না, বরং ভঙ্গুর সিস্টেমকে ঢেলে সাজানো।

এ আন্দোলন এমন সময় দানা বেঁধেছিলো যখন দেখা গেলো সরকারের প্রভাবশালী নেতা, আমলা, ব্যবসায়ীরা দুর্নীতিতে একের পর এক রেকর্ড ভাঙছিল। দেশের মানুষ দিন চালানোর মতো আর্থিক সঙ্গতি যখন হারাচ্ছিল, তখন তারা অবাক হয়ে দেখল সরকার আর সরকারের পার্টনারশিপে আমলা ও ব্যবসায়ীরা কীভাবে দেশকে দেউলিয়া করে, নিজেদের অর্থেবিত্তে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। শেয়ার বাজার লুট, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা চুরি, লক্ষ-কোটি টাকা প্রতিবছর পাচার, কুইক রেন্টালের নামে গণলুটপাট, ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে হুন্ডি ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া, মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে মেগা দুর্নীতি মানুষকে হতবিহ্বল যখন করেছিল, তখনও সরকার এ দেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া গ্রহণ না করে, নিজেদের খেয়াল জারি রেখে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে প্রতিজ্ঞ ছিল।

তাই নির্দলীয় আন্দোলন হিসেবে ছাত্র-জনতার এ বিপ্লবী অভ্যুত্থানকে সব মানুষ গ্রহণ করেছিল। নিজেদের আন্দোলন হিসেবে সাধারণ জনগণ মেনে নিয়েছিল। তাই তো কোন অপশক্তি এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। জনঐক্য ও সমর্থন চূড়ান্ত সাফল্যের সহায়ক হলো। তবে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার অসহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে ও কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সের ক্রমাগত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা মানুষকে রাজনৈতিকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে সাংঘাতিকভাবে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা যখন দালালির মিথ্যা বয়ান বানাতে ব্যস্ত, তখন কিছু মানুষ দেশ ও দেশের বাইরে থেকে তাদের প্রচারণা অব্যাহত রাখে। কোনও রাজনৈতিক নেতৃত্বের আহ্বান নয়, কিন্তু তরুণ ছাত্রদের নিবেদিত ত্যাগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার এক শব্দহীন বার্তা দিয়ে গেছে গোটা জাতিকে।

মূলত, জুলাই চেতনা হচ্ছে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, বৈষম্যের বিরোধী দ্রোহ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনা। আর জুলাই বিপ্লবের আমাদের জন্য দ্বিতীয়বারের মত স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। ফলে আমরা এক সম্ভবনাময় নতুন বাংলাদেশ হাতে পেয়েছি। এ বিপ্লবের মাধ্যমেই আওয়ামী ফ্যাসিবাদ আমলে নানাভাবে জুলুম-নির্যাতনের শিকার অনেক শীর্ষ রাজনীতিক মুক্ত হয়েছেন। ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া কারামুক্ত হয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান সাজামুক্ত হয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন এবং তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছেন। ফাঁসির দণ্ড থেকে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন জামায়াতের নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জমান বাবর। তারা উভয়েই এখন জাতীয় সংসদের সম্মানিত সদস্য।

তবে অতীত পরিতাপের বিষয়টি জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে যারা নানাভাবে উপকৃত হয়েছেন এবং যারা এ বিপ্লবের ভূয়সী প্রশংসায় নিকট অতীতে পঞ্চমুখ ছিলেন তারাই এখন এ বিপ্লবের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের গণরায়ের বিরোধীতা করছেন। তাদের মুখে এখন আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদী বয়ান শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের একথা মনে রাখা উচিত যে, জুলাই বিপ্লব আমাদের দেশ ও জাতিসত্ত্বাকে আত্মসচেতন করে তুলেছে। তাই জুলাই চেতনাকে কালের গর্ভে বিলীন করে দেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

জুলাই আমাদেরকে নতুন করে আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে শিখিয়েছে। মূলত, জুলাই চেতনা হচ্ছে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা ও আধিপত্যবাদী বিরোধী চেতনা। তাই যারা হীন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য জুলাই চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থ বিরোধী এবং আধিপত্যবাদীদের প্রতিভূ হয়ে কাজ করছেন, তাদের স্বপ্নবিলাস এদের মানুষে কোন ভাবেই বাস্তবায়িত হতে দেবে না বরং তাদেরকে একদিন কালের গর্ভেই হারিয়ে যেতে হবে। তাই বাস্তবতা উপলব্ধি করে গণরায়ের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন পূর্বক আগামী দিনের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়নও সময়ের দাবি।