বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান এক অনন্য অধ্যায়। স্বাধীনতার পর থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পারিবারিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় উন্নয়নে প্রবাসীরা নীরব অথচ শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে আসছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের ভূমিকা নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। শুধু রেমিট্যান্স পাঠিয়েই নয়, বরং আন্তর্জাতিক জনমত গঠন, মানবাধিকার প্রশ্নে সোচ্চার হওয়া, গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার প্রতি সমর্থন এবং নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে প্রবাসীরা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

আজ যখন একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন প্রবাসীদের প্রত্যাশাও বদলেছে। তাদের প্রশ্ন এখন শুধু নিরাপদে অর্থ পাঠানো নয়; বরং দেশে বিনিয়োগের নিশ্চয়তা, আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা।

জুলাই আন্দোলনে প্রবাসীদের ভূমিকা

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।

একই সঙ্গে অনেক প্রবাসী মানবিক সহায়তা, আইনি সহায়তা এবং তথ্যপ্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাদের মধ্যে একটি বিশ্বাস জন্মেছে যে, নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রক্রিয়ায় তাদের মতামত ও অংশগ্রহণকে মূল্যায়ন করা হবে।

নতুন বিনিয়োগ পরিবেশের প্রত্যাশা

দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের একটি বড় অভিযোগ ছিল, দেশে বিনিয়োগ করতে গিয়ে জটিল আমলাতন্ত্র, দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়। অনেকেই শিল্প, আবাসন, কৃষি, প্রযুক্তি কিংবা পর্যটন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছেন।

বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে সরকার যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে প্রবাসীদের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আবেগ নয়, আস্থাই বিনিয়োগের মূল ভিত্তি। তাই বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত সেবা, ডিজিটাল অনুমোদন, কর-সহায়তা, বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রবাসীদের অনেকেই মনে করেন, দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক অর্থনৈতিক অঞ্চল, প্রযুক্তি পার্ক এবং স্টার্টআপ তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

প্রবাসী কার্ড: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

সাম্প্রতিক সময়ে সরকার প্রবাসীদের জন্য “প্রবাসী কার্ড” চালুর উদ্যোগ এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে আসা-যাওয়া, বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণ, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং সুবিধা, ব্যবসা নিবন্ধন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও সহজ হতে পারে।

প্রবাসীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, প্রবাসী কার্ড কেবল একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হওয়া উচিত। এই কার্ডের মাধ্যমে যদি দ্রুত সেবা, একক জানালা (One Stop Service), কর-সুবিধা, ভূমি ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সহায়তা এবং প্রশাসনিক অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এর প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।

তবে অনেকের মত, শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নই হবে সফলতার প্রধান শর্ত। অতীতে বিভিন্ন উদ্যোগ ঘোষণার পরও বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা গেছে। ফলে এবার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপরই প্রবাসীদের আস্থা নির্ভর করছে।

শুধু রেমিট্যান্স নয়, জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিনিয়োগ

বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা ও শিক্ষাবিদদের অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রবাসীদের মতে, দেশে স্বল্পমেয়াদি বিশেষজ্ঞ কর্মসূচি, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত সহযোগিতা, গবেষণা তহবিল এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করা হলে তারা আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে পারবেন। এতে শুধু অর্থনৈতিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।

আস্থার সংকট দূর করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রবাসীদের একটি সাধারণ প্রত্যাশা হলো তাদের যেন শুধুমাত্র বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হিসেবে দেখা না হয়। তারা চান, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হোক।

বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর সেবার মান উন্নয়ন, দ্রুত পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা, প্রবাসী শ্রমিকদের আইনি সহায়তা এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি।

এছাড়া দেশে বিনিয়োগকারীদের হয়রানি, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর না হলে বিনিয়োগের পরিবেশ প্রত্যাশিত মাত্রায় উন্নত হবে না।

নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে প্রবাসীদের প্রত্যাশা

প্রবাসীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।

তারা চান এমন একটি অর্থনীতি, যেখানে বিদেশফেরত উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা থাকবে, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে তারা আশা করেন, দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও ইতিবাচক হবে, যাতে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরাও সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে পারেন।

উপসংহার

জুলাই ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য যেমন একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, তেমনি প্রবাসীদের মধ্যেও নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। তারা বিশ্বাস করেন, একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র গড়ে উঠলে প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠাবেন না; বরং শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উদ্ভাবনের মতো খাতে বৃহত্তর বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব গড়ে তুলবেন।

প্রবাসীদের জন্য ঘোষিত বিভিন্ন সুবিধা, বিশেষ করে প্রবাসী কার্ড ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা, যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা প্রবাসীদের আস্থা আরও দৃঢ় করবে। তবে এই আস্থা ধরে রাখতে হলে নীতির ধারাবাহিকতা, সুশাসন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় প্রবাসীরা শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নন; তারা অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং উন্নয়নের মূল্যবান অংশীদার। রাষ্ট্র যদি সেই অংশীদারত্বকে সম্মান ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তবে বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমৃদ্ধ এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।