আবহমান গ্রামীণ সমাজে একটি বহুল প্রচলতি প্রবাদ আছে ‘‘যার জন্য সিন্নি খাইলা, মোল্লা চিনলা না”। লোকজ এই প্রবাদটি মূলত যে উদ্দেশ্যে বহুকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে-আধুনিক সমাজ সভ্যতায়ও এর ব্যবহার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। চব্বিশের জুলাইয়ে দেশের লাখো মানুষ রাজপথে ফ্যাসিস্ট রেজিমের বিরুদ্ধে টানা আন্দোলন করে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। এটি ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানে প্রায় দুই হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের বাহিনীর বর্বর হামলায় আহত হয়েছেন ২০ হাজার। কেউ চিরতরে অন্ধ হয়েছেন, কারো দুই পা কেটে ফেলতে হয়েছে, কারো এক হাত নেই-কেটে ফেলতে হয়েছে। কেউ এক পা হারিয়েছেন। এক চোখ হারিয়েছেন কেউ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্বিচার গুলীবর্ষণে বা ছররা গুলীতে অনেকের শরীর ঝাঁজরা হয়ে গেছে। গুলীবিদ্ধতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় এখনো কাতরাচ্ছেন কেউ কেউ। উন্নত চিকিৎসার অভাবে পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি এমন আহত ব্যক্তিও আছেন। সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন এ সংখ্যাও কম নয়। আবার এমন অনেকেই আছেন রাজপথে তখনকার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন। রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। আবার রাজপথ থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর অনেককে জেলে পাঠানো হয়েছে । ৫ আগস্টের পরে মুক্তি মেলে তাদের।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে যে আন্দোলন শুরু হয়-তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নে রক্তাক্ত এক অধ্যায় পেরিয়ে তা গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৩৬ দিন আন্দোলনের পর ওই বছরের ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের।

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে পরিবর্তিত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে জীবনকে ভুলে গিয়ে যারা রাজপথে আন্দোলন করে বিপ্লব ঘটিয়েছেন তারা সবাই জুলাই যোদ্ধা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য- অভ্যুত্থানের মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে জীবন উৎসর্গকারী মানুষদেরকে আমরা ভুলে যাচ্ছি। রাষ্ট্র এদেরকে প্রকৃত সম্মান দিতে পারছে না। জুলাই যোদ্ধারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবহেলিত হচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। অস্ত্রধারী সরকারি বাহিনীর সামনে বুক পেতে দেয়া মানুষ গুলোকে ভুলে যাচ্ছি। গণমাধ্যমের কর্মরত সাংবাদিকরা খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পুলিশ বাহিনীর বন্দুকের নালের মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন দেশের স্বার্থে। দেশের মানুষের জন্য তারাও আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে জীবন ভুলে গিয়ে অন্তরালের খবর সংগ্রহে নিজের জীবনকে ভুলে গিয়েচিলেন। বেঁচেফেরা সেসব মানুষদের অনেককেই প্রাপ্ত সম্মানটুকু দিতে পােেরনি রাষ্ট্র। এখন জুলাই যোদ্ধার তালিকার নামে প্রকৃত সৈনিকরা অবমূল্যায়িত হচ্ছেন। হাস্যকর বিষয় হলো- যে পুলিশ গুলী করেছে; সেই পুলিশকেই আবার জুলাই যোদ্ধাদের তালিকা করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে! রাজপথে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার কারণে যে পুলিশ মানুষের ওপর গুলী চালিয়েছে সেই পুলিশকেই যদি জুলাই যোদ্ধাদের তালিকা করতে নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় তা হলে সে কি প্রতিবেদন দিবে তা কারো বুঝতে আর বাকি থাকে না। এই হলো সরকারের জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি করণীয় বা দায়িত্ব পালন।

গত বছর জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শহীদ ও আহত সেলের সম্পাদক তামিম খান বলেছেন, একজন আহত জুলাইযোদ্ধা আমার কাছে কান্না করে বলেছেন, ভাই, যে আমাকে গুলী করেছে, সেই পুলিশই এখন আমাকে ভেরিফাই করার জন্য পিবিআইতে ডেকেছে। এটা কি কোনো মানুষের কাজ হতে পারে? তিনি তখন জানান, জুলাই আন্দোলনে আহতদের তালিকাভুক্তির কাজ শুরু থেকেই নানা জটিলতা ও হয়রানির মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। প্রথমদিকে ছাত্র প্রতিনিধি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারের সমন্বয়ে কোনো ভোগান্তি ছাড়াই প্রায় সাড়ে নয় হাজার আহতের যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১ হাজার ৪৮৫ জন আহতকে নিশ্চিত করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে হঠাৎ করে তালিকাকরণ ও এমআইএস কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে দেখানো হয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চাপের মুখে ভুয়া আহত অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা। এরপর সম্পূর্ণভাবে তালিকাকরণ বন্ধ হয়ে যায়। তামিম খানের ভাষ্য, অনেক আহত জুলাই যোদ্ধা ছয় মাস ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের কি তালিকার বাইরে রাখা হবে? তালিকাকরণের বিষয়ে গণমাধ্যম বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, ফরম বা নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক আহত তালিকার বাইরে পড়ে যান। চাপের মুখে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে পুনরায় বৈঠক হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কোনো আহত জুলাই যোদ্ধা তালিকার বাইরে থাকবে না। এরপর দরখাস্ত নেওয়া শুরু হলে এপ্রিল-জুনের মধ্যে আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দুই থেকে আড়াই হাজারে। জুলাই যোদ্ধা সেলের তখনকার সম্পাদক তামিম খানের বক্তব্যেই বেরিয়ে এসেছে ভেতরের চিত্র। তামিম খানসহ জুলাই আন্দোলনে সম্মূখসারির কয়েকজন যোদ্ধা একই মন্তব্য করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়, জুলাই অধিদফতর, জুলাই ফাউন্ডেশন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ প্রতিটি দফতরে গিয়ে এমন অভিযোগ করেছেন। প্রকৃত জুলাই যোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করতে সরকারের প্রতি দাবি জানালেও আগ্রহ নিয়ে কাজ করছে না। জানা গেছে, আমলারা চাচ্ছেন না জুলাই যোদ্ধারা শক্ত অবস্থানে থাকুক। জুলাই যোদ্ধাদের সংখ্যা ভারি হলে রাজনৈতিক সরকার কোনো এক সময় বেকায়দায় পড়তে পারে এই আশঙ্কায় জুলাই যোদ্ধাদের তালিকা কাটছাট করা হচ্ছে। এ কারণে বিপ্লবের দুই বছরেও জুলাই যোদ্ধাদের তালিকা করা নিয়ে গড়িমসি চলছে।

শুধু বর্তমান সরকারই নয়- জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারও জুলাই যোদ্ধাদের তালিকা করার কাজ যথাযথভাবে করে যেতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারে তখন দুই জন ছাত্র প্রতিনিধি উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন। এরমধ্যে নাহিদ ইসলাম ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

নাহিদ ইসলামের পদত্যাগের পর তার মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে আসেন মাহফুজ আলম। তাকে বলা হতো- জুলাই বিপ্লবের মাস্টারমাইন্ড। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে জুলাই বিপ্লবের প্রভাবশালি প্রতিনিধি থাকার পর জুলাই যোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির কাজ সম্পন্ন না হওয়া অবশ্যই দুঃখজনক। এমনকি জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল- জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারাও জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষে অথবা জুলাই যোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করার জন্য সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে দেখা যায়নি। জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ করা হয়েছে এনসিপির নেতাদের ব্যাপারে।

অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে-ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে বা রাজনৈতিক দল গঠনের পর জুলাই যোদ্ধাদের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি হয়তো তারা অনুভব করতে পারছেন না।

এরপরও জুলাই যোদ্ধাদের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনের চাপে সরকার জুলাই যোদ্ধাদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের জুলাই শহীদ এবং আহত ব্যক্তিদের জুলাই যোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত “জুলাই যোদ্ধা” তালিকা মূলত আঘাতের তীব্রতা অনুযায়ী ‘ক’ (অতি-গুরুতর আহত), ‘খ’ (গুরুতর আহত) ও ‘গ’ (সাধারণ আহত)-এই তিনটি প্রধান ক্যাটাগরিতে বিভক্ত। বিভিন্ন ধাপে সংশোধিত ও প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী এ পর্যন্ত ১৬ হাজারের অধিক আহত যোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যাদের নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিভিত্তিক আর্থিক সহায়তা ও মাসিক ভাতা দেওয়ার কথা। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সর্বশেষ সংখ্যা ৮৪৩ জন। তবে এই তালিকা নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। গত জুলাইয়ে দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-‘কত মানুষ শহীদ হয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানে? উত্তর খুঁজতে গেলে বিভ্রান্তিতে পড়তে হচ্ছে দুই বছর পরও। একেক জায়গায় একেক রকম হিসাব। সরকার হিসাব দিচ্ছে এক রকম; সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মুখ থেকে আসছে ভিন্ন রকম তথ্য। আবার নানা দল ও সংগঠনের কাছ থেকে আসছে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শহীদ ও আহত সেলের নেতা তামিম খান বলেছেন, এই তালিকাগুলো হঠাৎ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া এবং পুলিশকে ভেরিফিকেশনের দায়িত্ব দেওয়া অযৌক্তিক। তিনি বলেন, ভেরিফিকেশনের নামে আহতদের কাছ থেকে সমন্বয়কের প্রত্যয়ন, দুইজন সাক্ষী, আন্দোলনে কেন গিয়েছিল- এমন প্রশ্ন করে হয়রানি করা হচ্ছে। পুলিশের দোষ দিচ্ছি না, তারা কমান্ড ফলো করে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভুল। আহত সাংবাদিকদের প্রসঙ্গে তামিম খান বলেন, আমি ৩২ জন সাংবাদিকের দরখাস্ত পেয়েছি, যাদের মধ্যে ২৪ জন প্রকৃত আহত জুলাইযোদ্ধা। তারাও এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি।

সর্বশেষ কথা হলো- জুলাই যোদ্ধাদেরকে অবহেলা করলে অথবা তাদের প্রাপ্ত সম্মানটুকু না দেয়া হলে পরিণতি কোন দিকে যেতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখা উচিত। চব্বিসের আন্দোলনে যারা রাজপথে নেমে বাংলাদেশের অপশাসনের বিদায় ঘটিয়েছে, যারা ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন ঘটিয়েছে, যারা একজন ফাস্টিকেই শুধু নয়- তার ল্যাসপেনসারদের দেশ ছাড়া করেছে তাদেরকে আর দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যারা বুঝতে পেরেছে রাজপথই একমাত্র সমাধান তাদেরকে খাট করে দেখার সুযোগ নেই। নদী পার হওয়ার মাঝিকে চিনি না বলে পার পাওয়া এখন অসম্ভব।

অতএব, রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকতে হলে জুলাই বিপ্লবীদের অবদান সম্মানের সঙ্গে সম্মরণ রাখতে হবে। জুলাই বিপ্লবীদের স্বপ্ন শুধু ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনই নয়- তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার এবং নতুন বন্দোবস্ত।

রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার করে একটি বৈষম্যহীন সমাজ ও নীতি প্রণয়ন করা ছিল জুলাই বিপ্লবীদের উদ্দেশ্য। রাষ্ট্র মেরামত করে জনগণের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার যে স্বপ্ন ছিল তা বাস্তবায়ন করা। পুরোনো রাজনৈতিক ধারা বর্জন এবং জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা। এর ব্যত্যয় ঘটলে অদূর ভবিষ্যতে এই জুলাই যোদ্ধারাই আবার গর্জে ওঠতে পারে।