নুসরাত জাহান
গৃহিণী
জুলাই না আসলে হয়তো আমরা কখনোই বুঝতে পারতাম না, এই দেশটাকে আমরা কতটা ভালোবাসি।
১৪ জুলাই, আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীমউদ্দিন হল কোয়ার্টারে ছিলাম। রাত প্রায় নয়টা। “রাজাকার, রাজাকার” স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীমউদ্দিন হল। ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণের নীরব সাক্ষী ছিলাম আমি। তখনও ভাবিনি, মাত্র কয়েকটি দিনের ব্যবধানে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এত দ্রুত বদলে যাবে।
১৫ জুলাই হলপাড়ার শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হলো। মনে হয়েছিল, হয়তো ২০১৮ সালের মতো এটিও একটি ক্ষণস্থায়ী আন্দোলন হয়ে থাকবে। ছাত্রদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করে দেওয়া হবে।
কিন্তু ১৬ জুলাই আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার সংবাদ যেন সব হিসাব বদলে দিল। সেদিন মনে হয়েছিল, এই রক্ত বৃথা যাবে না। এই শাহাদাতই একদিন স্বৈরাচারের পতনের সূচনা হয়ে ইতিহাসে লেখা থাকবে।
জুলাইয়ের দিনগুলো কোন শব্দে লিখব, জানি না। এমন অনেক স্মৃতি আছে, যেগুলো শব্দের সীমা অতিক্রম করে যায়। সেগুলো আজও হৃদয়ের গভীরে অনির্বচনীয় ব্যথা হয়ে রয়ে গেছে। প্রতিটি রাত ছিল উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক আর নির্ঘুম অপেক্ষার। হলপাড়ায় একটু পরপর ভেসে আসা ফাঁকা গুলীর শব্দ ঘুম কেড়ে নিত। নীলক্ষেত ও শাহবাগজুড়ে ড্রোনের নজরদারি, পরিচিত মানুষদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর সব মিলিয়ে প্রতিটি দিন যেন ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভরা ছিল। মন থেকে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু রাজপথে সেই ক্লান্তি কিভাবে যেন কেটে যেত।
৩০ জুলাই পরিচিত এক ছেলে (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বাবা-মাকে বুঝিয়ে দুপুরে বের হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর গলায় গুলীবিদ্ধ অবস্থায় সে বাসায় ফিরে আসে।
৩ আগস্ট শহীদ মিনারে আমি মানুষের মধ্যে এক অনন্য দেশপ্রেম প্রত্যক্ষ করেছিলাম। সেখানে কোনো দলের পরিচয় ছিল না, কোনো বিভাজন ছিল না; ছিল শুধু দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং স্বৈরাচারের বিদায়ের অপেক্ষা।
৪ আগস্ট শাহবাগ জাদুঘরের সামনে রাস্তায় পড়ে থাকা গুলীবিদ্ধ ভাইদের নিথর দেহ হয়তো জানত না, তাদের রক্তের হিসাব ইতিহাস খুব শিগগিরই নেবে। আমার হাজবেন্ড কয়েকজন আহত মানুষকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সাংবাদিকদের সরিয়ে দিয়ে পুলিশ যেভাবে নির্বিচারে গুলী চালাচ্ছিল, সেখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। বাসায় ফিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম আসিফ মাহমুদের পোস্ট—’পরশু নয়, কালই লং মার্চ’। মনে মনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। কিন্তু রাত দশটার পর পুরো এলাকায় সব ধরনের আলো নিভিয়ে দিতে বলা হলো। এ যেন এক অলিখিত কারফিউ। অন্ধকারে হলপাড়া আরও নিস্তব্ধ, আরও ভারী হয়ে উঠল।
সারা রাত উৎকণ্ঠায় কেটেছিল। পরদিন ৫ আগস্ট (৩৬ জুলাই) সকাল থেকে মানুষ দলে দলে রাস্তায় নামতে শুরু করল। সাড়ে এগারোটার দিকে খবর এল, সারাদেশ কার্যত অচল। চাঁনখারপুলের গুলীর শব্দ ঘরে বসে স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম। পরিচিতজনেরা বারবার রাস্তায় নামার জন্য বলছিল। আমার ছোট মেয়ের বয়স তখন মাত্র আড়াই বছর, বড় মেয়ের দশ। দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আমরা পুরো পরিবার রাস্তায় নেমে পড়লাম। ছেলে তখনো মাদ্রাসার হোস্টেলে। পুরো জুলাই মাসে ছেলেকে বাসায় আনার সুযোগ হয়নি।
বারোটার একটু পর একটি পুলিশের সাঁজোয়া যান গুলী করতে করতে টিএসসি হয়ে শাহবাগ পার হয়ে গেল। এর কিছুক্ষণ পর স্বৈরাচারী পালানোর খবরে আনন্দমিছিলে মুখর হয়ে যায় পুরো ক্যাম্পাস এলাকা।
আসলে জুলাই কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো এক দলের অর্জন নয়। জুলাই এই দেশের প্রতিটি মানুষের। এই মাটির মানুষের সাহস, আত্মত্যাগ, অশ্রু ও রক্তের বিনিময়েই জুলাইয়ের ইতিহাস রচিত হয়েছে।
সাইফুল্লাহ হয়তো কখনোই জানবে না, তাঁর রক্ত স্বৈরাচারের পলায়নের পথ প্রশস্ত করেছিল। আজিমপুরে পুলিশের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল ষোল বছরের সাইফুল্লাহ। একটি মানুষকে হত্যা করতে ৭১টি গুলী লাগে?? পুলিশের এমন নির্মমতা আর কোথায় আছে, আমার জানা নেই। সাইফুল্লাহর ক্ষতবিক্ষত দেহে ছিল ৭১টি গুলীর চিহ্ন। ঢাকা মেডিকেলের মর্গে
পাঞ্জাবি দেখে সাইফুল্লার বাবা বুঝতে পেরেছিলেন এটাই তার কলিজার টুকরা।
আরেকজন ছিলেন একজন ভ্যানচালক, যিনি কোটা, মেধা কিংবা রাজনীতির কোনো জটিল হিসাব বুঝতেন না। তিনি শুধু আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য ভ্যানে করে পানি পৌঁছে দিয়েছিলেন। অথচ তাকেও স্নাইপারের গুলীর লক্ষ্য হতে হয়েছিল।
আজ যখন জুলাইয়ের গল্প বলা হয়, তখন অনেকেই শুধু ঘটনাগুলো স্মরণ করেন। অথচ জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার আদর্শ, তার ঐক্য, তার আত্মত্যাগ। সেই আদর্শ যদি আমরা হারিয়ে ফেলি, তাহলে ইতিহাস শুধু স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে, চেতনায় নয়।
তাই জুলাইকে শুধু স্মরণ করলেই হবে না, ধারণ করতে হবে। সত্য, ন্যায় ও মানুষের মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানোর যে শিক্ষা জুলাই আমাদের দিয়েছে, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিতে হবে।
একটি প্রবাদ দিয়ে শেষ করতে চাই—
“একটি বিপ্লব হলো ভবিষ্যতের মুখোমুখি লড়াই; এটি অতীতের কোনো সহজ পুনরাবৃত্তি নয়।”