স্বাধীনতা শব্দের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। প্রতিবারই স্বাধীনতা শব্দটি ঘুরে ফিরে আসে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। এখন ভাবার সময় সমস্যা উন্মোচিত করা। সেই পলাশীর যুদ্ধে স্বাধীনতা হারিয়েছি তা ফেরত পেতে সিপাহী বিপ্লবের সৃষ্টি হয়, কিন্তু লাভ হয়নি। এর পরে অনেক আন্দোলন চড়াই-উৎরাই পার হয়ে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়, ব্রিটিশরা চলে যায়। কিন্তু স্বাধীনতা নেই, কোথায় জানি একটা সমস্যা। এরপরে শুরু হলো পাকিস্তানিদের শোষণের বয়ান, একাত্তর এলো, রক্ত দিলাম, কোনো লাভ হয়নি। ফ্যাসিস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলো কোনো পরিবর্তন আসেনি। তারপরে জেনারেল এরশাদ পতনের পর গণতন্ত্র ফিরে আসলো। এসব পতনে গণতন্ত্র ফিরে আসলেও কোনো পরিবর্তন আসেনি। ২৪-এর এত রক্ত, এত কিছুর পর কোন পরিবর্তন হয়নি। আমরা হতাশ হয়েছি মাত্র।

ব্রিটিশ আমলে আমরা যে আইনে শাসিত হয়েছি, সে আইন এখন বিদ্যমান, আন্দোলনে ব্রিটিশ চলে গেছে, তথা সাদা চামড়ার লোকগুলো ফেরত চলে গেলেও আইন পরিবর্তন হয়নি। ব্রিটিশরা শাসন করার সময় একটু চিন্তা-ভাবনা করতো, তারা ভাবতো আমরা বিদেশি আমরা যেখানে শাসন করছি সেটা ভারতবর্ষে, একটু রয়েসয়ে চিন্তা-ভাবনা করে মূলত (হিন্দু জমিদার ও আমলা) আমাদের মাধ্যমে তারা শাসন করতো। ক্ষেত্র বিশেষে কিছুটা নমনীয় ছিল, দুর্ভাগ্য ব্রিটিশরা চলে গেলে আমরা যখন শাসন শুরু করি, তখন আমরা হয়ে যাই চরম ফ্যাসিস্ট। ব্রিটিশ সৃষ্টি কানন পরিবর্তন না করায় কোনো লাভ হয়নি। লোকগুলো পরিবর্তন হয়েছে কানুন পরিবর্তন হয়নি। এখনই সময় সেই কানুন পরিবর্তন করার।

আমাদের জনগণের জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ, অপরাধ ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে সংশোধন/ সংস্কারের মাধ্যমে আইন সৃষ্টি করতে হবে। যে আইনে সকল বৈষম্য দূর হবে। সবাই তার অধিকার খুঁজে পাবে। সবার জন্য শিক্ষা, সবার জন্য মৌলিক অধিকার।

সমসাময়িক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। তৃণমূল, অজপাড়াগাও, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিটি ব্যক্তি কতটুকু সুফল পায় আমরা কিন্তু জানি না, আমরা দেখিও না। আমরা নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যেই বিদ্যমান। আমরা চাই ন্যায়বিচার, ইনসাফ এবং একটা নতুন বন্দোবস্তের সমাজ। আজ আমরা পুলিশকে সেবক হিসেবে দেখি না। যদিও পুলিশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে সেটা আমাদের আশা জাগায় বটে। আমাদের আরো পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। বিচারক এত দূরে থাকেন, যেখানে সাধারণ মানুষ যেতে পারে না। তৃণমূলের জনগণের পেটের চাহিদা মেটাতে বিধ্বস্ত। বিচার ব্যবস্থা পরিবর্তন হয়নি, পুলিশকে কীভাবে সেবক করা যায় তার চিন্তা আমাদের করতে হবে।

অনেকের ২৪ নিয়ে গা জ্বালা, ২৪-কে সহ্য করতেই পারে না, তাদেরকে নানাভাবে দেওয়া হয় ট্যাগ, যা দুঃখজনক। চব্বিশে আমরা হারিয়েছি ১৪০০ বাংলাদেশী। আর প্রায় ৩০ হাজারের অধিক আহত। আহতদের অনেকে ২ চোখ হারিয়েছে , অনেকেরই ১ চোখ আহত। এই সংখ্যা অতীতের সকল বিপ্লবী ক্ষয়ক্ষতি চেয়ে অধিক। ৪৭-এর পর শুরু হয় ৫২-র ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের সময় শহীদ হয় ৬ জন। ওই সময় এই ঘটনা ঘটায় পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ তথা বাংগালী এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বাঙালি নুরুল আমিন সাহেব যার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। একই সাথে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ঢাকা নবাব বাড়ির খাজা নাজিম উদ্দিন। তাহলে দোষ কার? আমি কোনো আন্দোলনকে ছোট ভাবি না। সকল শহীদদের শ্রদ্ধা ও সম্মান করি।

যার যার সম্মান মর্যাদা তাকে দিতে হবে ২৪ আছে ২৪-এর জায়গায়, আমার ও আমাদের প্রাণে। ভাষা আন্দোলন ভাষা আন্দোলনের জায়গায় ৭১ আছে ৭১-এর জায়গায়। অতীতকে সম্মান করবো ধারণ করবো। তবে ২৪-এর গুরুত্বটা একটু বেশি করে আলোচনা করা প্রয়োজন। আমাদের উচিত ২৪-এর বিপ্লবে শহীদ ও আহত সবার সংখ্যা ও পরিচয় সংরক্ষণ করা।

শহীদদের জাতীয় মর্যাদা দেওয়া সুযোগ আছে। সকল শ্রেণির পাঠ্য পুস্তক, মাদরাসার পুস্তকসহ সকল ক্ষেত্রে একে লেখনি ও চিত্রকর্মে তুলে ধরা। ২৪-কে হারাতে দেওয়া যাবে না। আমরা ইতিহাসে অনেক সাহসী নেতা দেখছি, অনেক বিপ্লব দেখা যায়, এমন কোনো বিপ্লব পাবেন না, যে বিপ্লব ছিল নিরস্ত্র আমজনতার সাথে সশস্ত্র সরকারি বাহিনী। এটা কত সাহসের ব্যাপার বোঝানো যাবে না। প্রতিটা বিপ্লবে পক্ষে-বিপক্ষে কমবেশি অস্ত্র থাকে কিন্তু আমাদের এই বিপ্লব এমন একটা আদর্শিক বিপ্লব জনগণ তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না, সম্বল শুধু লাঠি অথবা ঢিল। প্রতিপক্ষের ছিল সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত হেলিকপ্টার তাদের কাছে ছিল এপিসি ভারী অস্ত্র ইত্যাদি। এই বিপ্লবীদের ছিল বলিষ্ঠ কন্ঠ যা ছিল সুন্দর সুন্দর প্রাণের স্লোগান। যাতে পুরো জাতি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং এ শক্তি এতটা বেশি ছিল ফ্যাসিস্ট দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এ স্লোগানগুলো মনে রাখার মতো।

‘দিল্লি না ঢাকা- ঢাকা ঢাকা’

‘বুকের ভেতর উঠছে ঝড়, বুক পেতেছি গুলি করে’

‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা এই বাংলায় হবে না’

‘পিছনে পুলিশ সামনে স্বাধীনতা’

এই সাহসের স্লোগানগুলি ক্ষমতাসীনদের ভীত লড়িয়ে দেয়। সেনাবাহিনী জনগণের পাশে এসে দাঁড়ায়। বিজয় নিশ্চিত হয়ে যায়।

এ বিপ্লব আমাদের চিনিয়েছে ভারত আমাদের একমাত্র শত্রু। আবু সাঈদের খালি হাতে কোন রকম অস্ত্র ছাড়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দুই হাত প্রসার করে বুক পেতেছে। ভাষা পরিষ্কার জীবন দিব মান দেব না।

বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি হয় একটা সংস্কার সনদ যা জুলাই সনদ কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। একটা নির্বাচন হয়েছে কেউ কথা রাখেনি হয়তো আরেকটা বিপ্লব দরকার। দুঃখজনক এবং পরিতাপের বিষয় আমাদের শাসকরা নিজেদের মন মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারেনি, যার জন্য এই সমস্যাটা।

শাসককে বুঝতে হবে জনগণই সকল শক্তি। শাসক ইনসাফ কায়েম করতে হবে। সকল বৈষম্য দূর করবে। মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে। জনগণের কাছে গিয়ে তার কষ্টের কথা ও ভাষা বুঝতে না পারলে আপনারা ব্যর্থ।