অপরাহ্নের সময়, মহাসড়কের একপাশে অনেক যানজট আবার অন্যপাশ ফাঁকা। অনেকে অফিস শেষ করে কিংবা বিভিন্ন কাজে ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন; হয়তো তাদের হেঁটে কিংবা ভেঙে ভেঙে যেতে হচ্ছেÑকিছুদূর পায়ে হেঁটে, আবার কিছুদূর রিকশা নিয়ে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের মুখে শোনা যাচ্ছে, রাস্তার একপাশে পুলিশ ও ছাত্রদের মুখোমুখি সংঘর্ষ চলছে। সেই হামলার এক অনন্য স্মৃতি এখনো মনে পড়লে মনে হয়, এই তো সেদিন।
জীবনে কিছু স্মৃতি থেকে যায়, আবার কিছু স্মৃতি মুছে যায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কিছু স্মৃতি কখনোই মোছে না; বরং থেকে যায়Ñসেটা হোক কোনো ভালো স্মৃতি, কিংবা কষ্টের। তেমনই এক মনে রাখার মতো স্মৃতির নাম ২৪-এর জুলাই আন্দোলন।
জুলাই আন্দোলন শুধু একটি আন্দোলন ছিল না, সেটি ছিল জাতির মুক্তি। প্রথমে এই আন্দোলন ছাত্রদের থাকলেও, পরবর্তী সময়ে এটি আপামর জনতার দীর্ঘ ১৭ বছরের মুক্তির সনদ হিসেবে রূপ লাভ করে। বাঙালি জনগণ তাদের দীর্ঘ ত্যাগ ও নির্যাতনের প্রতিচ্ছবি দেখে এই জুলাই আন্দোলনে। তেমনই একটি দিন ছিল ১৮ জুলাই ২০২৪।
যখন সারাদেশে আন্দোলনের গতি সঞ্চার হতে থাকে ধীরে ধীরে, ১৫ জুলাই রাতে সারাদেশে ছাত্রলীগের একযোগে হামলার শিকার হয় দেশের বিভিন্ন স্থান, যার মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। সেদিন পুলিশ এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের হামলা চলে রাতভর। এরপর ভোরের আলোতে ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস ছাড়া করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ১৭ জুলাই আন্দোলনকে দমানোর জন্য হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হল খালি করার নির্দেশ দিল, যার ফলে শিক্ষার্থীদের সাথে সৃষ্টি হয় আরেক দফা তীব্র সংঘর্ষ । এর ফলে বাধ্য হয়ে বহু শিক্ষার্থী হল ছেড়ে চলে যায় এবং পুরো ক্যাম্পাস পুরোপুরি পুলিশের দখলে চলে যায়। অনেকে চলে গেলেও কিছু ছাত্র তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য ক্যাম্পাসের আশেপাশে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। এসব শিক্ষার্থীকে আশ্রয় দিলেন সাধারণ জনগণ এবং শিক্ষকেরা, যার ফলে ১৮ জুলাই প্রথম পুলিশকে ক্যাম্পাসমুক্ত করেন ছাত্ররা। কিন্তু এর বাইরেও দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ততদিনে আন্দোলনের দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, সন্ধ্যার কিছু আগে। ক্যাম্পাস থেকে পুলিশকে বিতাড়িত করার পর সাভারে যাচ্ছিলাম ফুফুর ওখানে থাকতে। আমার একমাত্র ফুফু, যার কোনো সন্তান নেই এবং তিনি নিজে একজন পোশাকশিল্পের শ্রমিক। ডেইরি গেটে আসার পর মনে হলো কোনো বাস পাওয়া যাবে না। অহেতুক ভাড়া বেশি দিয়ে রিকশা ঠিক করলাম; ভাড়া জনপ্রতি ৩০ টাকা, ৫ জন উঠেছি। এরপর হঠাৎ করে ইন্টারনেট অকেজো হলো। ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ তাড়ানোর ভিডিওটা ফেসবুকে আপলোড করা শেষ হয়েছে মাত্র কয়েক মিনিট হলো। নয়তো সেদিনের আরও কিছু ভিডিও ফেসবুক প্রোফাইলে শেয়ার করা যেত।
কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম অনেক লোকের নবীনগর কিংবা ঢাকার বাইরে যাওয়ার ঢল। মূল কারণ কোনো গাড়ি নেই, আবার রাস্তার একপাশে দীর্ঘ যানজট। খবর পেলাম, স্থানীয় শিক্ষার্থীরা পুলিশের হামলা প্রতিহত করতে এবং ‘বাংলা ব্লকেড’-এর অংশ হিসেবে গাড়ি অবরোধ করেছে, আর তাদের আন্দোলন দমন করার জন্য পুলিশ পাঠানো হয়েছে। সেখানে পুলিশ ও স্থানীয় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাথে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সংঘর্ষ চলে।
আমি সাহস পেলাম, কারণ আমি সাংবাদিক। সেজন্য পকেটে কার্ড এবং গলায় থাকত আইডি। আইডি কার্ডটি পকেট থেকে বের করে গলায় ঝোলালাম। ভাবলাম হয়তো পুলিশ আমাকে কিছু করবে না।
সাহস নিয়ে এগিয়ে গেলাম কিছুদূর, কিন্তু ব্যত্যয় ঘটল রেডিও কলোনির কিছুদূর আসার পর। দূর থেকে দেখলাম পুলিশ রাবার বুলেট এবং টিয়ারশেল নিক্ষেপ করছেÑদু-চারজন মানুষ যেখানেই দেখছে, তাদের ওপর। হয়তো সেদিন গলির মধ্যে না ঢুকলে নিশ্চিত গুলী লাগত।
কিছুদূর দূরে অবস্থান করার পরও পুলিশ কয়েকটি টিয়ারশেল মারল এবং তাদের অবস্থান ছিল কয়েকটি দলে; প্রতি দলে ১২ জন করে সমানভাবে হাঁটছে, মনে হয় কোনো কুচকাওয়াজে লেফট-রাইট করছে।
অনেকে টিয়ারশেল খাওয়ার পর গ্যাসলাইট জ্বালাচ্ছে ঝাঁজালো ভাব দূর করার জন্য। সাহায্য করছেন কোনো পোশাকশিল্পের নারী বা পুরুষ কিংবা স্থানীয় লোকজন।
গলি দিয়ে কিছুদূর গেলাম, অর্থাৎ সোসাইটি রোডে। সেখানে দেখলাম যাঁরা স্কুল-কলেজে কোনোদিন যাননি, যাঁদের জীবন কাটে রাস্তায় বোতল কুড়িয়ে কিংবা চায়ের দোকানে কাজ করেÑতারা পুলিশের মুখোমুখি হচ্ছেন। এর সাথে যোগ দিয়েছেন এলাকার লোকজনও। রাস্তার মধ্যে টায়ার, বোতল কিংবা রোড ব্যারিয়ারগুলো উপড়ে তুলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করছেন। তখন লেফট-রাইট করে পুলিশ আসলে তারা মুহূর্তের মধ্যে উধাও হচ্ছেন; মনে হয় যেন জনপ্রাণীশূন্য এলাকা! আমিও তাদের মতো দৌড়াচ্ছিলাম এবং লুকাচ্ছিলাম, সেই সাথে দেখছিলাম তাদের কাজ। যে কাজটি হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের করার কথা ছিল, সে কাজটি তারা করছেন।
একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন করছেন?” তিনি বললেন, “এই ফ্যাসিস্ট সরকারের অনেক নির্যাতন সহ্য করেছি, আর নয়।
এখন ছাত্রদের জন্য সুযোগ পেয়েছি, আপ্রাণ চেষ্টা করছি; বাকিটা আল্লাহ ভরসা।” শেষের কথাটি আমার মনের মধ্যে নাড়া দিয়ে উঠলÑ’আল্লাহ ভরসা’। যাঁদের কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, তারা শিক্ষার্থীদের অসমাপ্ত কাজ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; এর জন্য কোনো কিছুর পরোয়া নেই।
পথিমধ্যে দেখলাম গুপ্তচর হিসেবে এক সাংবাদিক এবং দুজন ছাত্রলীগ কর্মীকে বেদম পেটাচ্ছিল জনতা। সেদিন তো টোকাই কিংবা চায়ের দোকানে কাজ করা শিশু-কিশোরদের কাহিনি হয়তো কেউ তুলে ধরেনি, কিন্তু নীরবে-নিভৃতে তারা আন্দোলনকে ঠিকই বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। সেদিন তাদের এই প্রতিরোধ হয়তো সংখ্যায় নগণ্য, কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে তা অনেক বড়। পরিশেষে সেদিন তাদের এই আন্দোলন আমার কাছে মনে হয়েছে অনেক বৃহত্তর। রুমে আসার পর ভাবলাম, হয়তো চোর-পুলিশ খেলে আসলামÑছোটবেলায় যেভাবে খেলতাম!