আজ ৩৬ জুুলাই বুধবার (৫ আগস্ট)। বাংলাদেশপন্থী মানুষের জন্য দ্বিতীয় স্বাধীনতার দিন। ২০২৪ সালের এদিন ছিল সোমবার। আজ থেকে দুই বছর আগে এই দিনে ‘শেকের বেটি পালায় না খ্যাত’ ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচার শাসক হাসিনা, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ভয় পেয়ে জীবন বাঁচাতে কার্গো বিমানে করে বাংলাদেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পলায়ন করেছিলেন। তবে তিনি স্বপদে টিকে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। এই দিনে জাতি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ঘৃণা ভরে স্মরণ করবে। ৫ আগস্টকে যথাযথ মর্যাদায় পালনের জন্য সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন জুলাই স্মৃতি জাদুঘর খুলে দেওয়া হবে জনগণের জন্য। উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিকে এদিন রাজধানীতে গণসমাবেশ করবে ১১ দলীয় ঐক্য। গণসমাবেশ থেকে চলমান আন্দোলনের পরবর্তী বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগের এই দিনটি কল্পনায় এলে একদিকে যেমন গা শিহরিত হয়ে ওঠে; অন্যদিকে আনন্দে মন উদ্বেলিত হয়ে ওঠে, পরক্ষণে ফ্যাসিবাদ বিতাড়ণের পর রাস্তায় নামা আনন্দ মিছিলে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর গুলীতে অসংখ্য হতাহতের কথা মনে এলে আবারো বিষাদে ভরে যায় হৃদয়। ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই অর্থাৎ ৫ আগস্টকে কল্পনায় নিলে তিনটি রূপ চোখের সামনে ভাসে। দিনটিকে তিন ভাগ করলে সকাল বেলাটা পুরো যুদ্ধংদেহী, দুপুরবেলাটা আনন্দমূখর। আর বিকাল বেলাটা ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর বুলেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত জুলাইযোদ্ধাদের আত্মীয়স্বজনের আর্তনাদভরা আহাজারিকরা মুখগুলো।
এ মুহূর্তে ওসমান হাদির কিছু বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে বেশি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ‘জান দেবো, জুলাই দেবো না’ কিংবা ভাইয়েরা মনে রাখো। শত শত জুলাইয়ের রক্তের মধ্য দিয়ে নেতা হয়েছো তোমরা। যদি জুলাইকে বেচে দিয়ে দিল্লীর দাসত্ব করে ক্ষমতায় আসতে চাও! হাসিনার চেয়ে ভয়ানক পরিণতি হবে।
বিপ্লবের দুই বছর পর এমন এক সময় ৩৬ জুলাই বা দ্বিতীয় স্বাধীনতার দিন আমাদের মাঝে এসেছে; কেউ কেউ জুলাইকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছে। কিংবা জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এজন্যই হয়তো জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আবারো রাজপথে নামছে মানুষ। ক্ষমতায় আরোহন করা একজন সিনিয়র মন্ত্রীর মুখ থেকে শুনতে হচ্ছে ‘দেশ আগের মতোই রয়ে গেছে’। দুর্নীতি চাঁদাবাজি আগের মতোই রয়ে গেছে। একটুও পরিবর্তন হয়নি ক্ষমতার পালা বদল ছাড়া। জুলাইযোদ্ধাদের স্বজনরা সন্তান হত্যার বিচারের দাবিতে রাস্তায় রাস্তায় কর্মসূচি দিতে হচ্ছে। রাগে ক্ষোভে দিশেহারা তারা। নাগরিক সমাজে প্রশ্ন ওঠেছে, জুলাই আন্দোলনের নানাবিধ লক্ষ্য ও আকাক্সক্ষা থাকলেও দেশে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা ছিল অন্যতম প্রধান দাবি। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, দুই বছর পর সে প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে ? দুই বছর পর আবার দুর্নীতি দলীয়করণ সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে রাস্তাপথে নামার হুমকি দিতে হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিরপেক্ষ জায়গা থেকে ১২টির মতো সংস্কার কমিশন সুচিন্তিত রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। দুঃখজনকভাবে সেই রিপোর্ট বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বলা হচ্ছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণমুক্ত না হলে সুশাসন অসম্ভব। “সাংবিধানিক সংস্কারগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। পুলিশ অভ্যুত্থানের পর পুলিশ সংস্কার কমিশনের যে সুপারিশ ছিল, সেগুলোর বিষয়ে কোনও অগ্রগতি হয়নি। ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল সংস্কার বা সিস্টেমেটিক চেঞ্জই সুশাসনের মূল ভিত্তি। রাজনীতিবিদরা বলছেন, “বর্তমান নির্বাচিত সরকার তাদের প্রতিশ্রুত ‘৩১ দফা’ অনুযায়ী সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর বললেও দায়িত্ব নেওয়ার গত ৫ মাসে তার স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়নি।
দুঃখজনকভাবে বলতে হয় একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তিরা আজ জুলাইকে সমালোচনা করছে। তারা চায় জুলাইকে ভুলিয়ে দিতে। যারা একাজটি করছে তারা আজ চিহ্নিত জাতির কাছে। বোঝা-ই যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ অথবা তাদের দোসর অথবা যারা চৌদ্দ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জোটে ছিল, এরাই আসলে চাচ্ছে রক্তাক্ত জুলাই বিতর্কিত হউক। অথবা যারা বাংলাদেশে ন্যায় এবং ইনসাফ পন্থীদের উত্থানকে সহ্য করতে পারে না, ওই গোষ্ঠিগুলো মূলত জুলাইকে অবজ্ঞা করার চেষ্টা করছে। আরেকটা শ্রেণি আছে যারা জুলাইতে যাদের খুব বেশি অবদান ছিল না; ওই মানুষগুলো যখন দেখতে তাদের পলিটিক্যাল অবস্থান ব্যাকফুটে যাচ্ছে তখন তারা এই জুলাইকে ম্লান করে দেওয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামীর চালিকা শক্তি হচ্ছে জুলাই। চাইলেই কেউ জুলাইকে ভুলিয়ে দিতে পারবে না।
ইতিহাস বলছে, ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালিত হয়। কারফিউ ঘোষণা থাকায় সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলে। সকালে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমে পুলিশের সঙ্গে মিলে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা করে ও গুলী চালায়। সকাল ১০টার পর থেকেই উত্তরা এবং যাত্রাবাড়ী দিয়ে ঢাকায় ঢুকতে শুরু করে হাজারো মানুষ। দুপুর নাগাদ শেখ হাসিনার পতনের কথা শোনা যায়। দুপুরে পর রাজপথগুলো গণজোয়ারে পরিণত হয়।
সেদিন ঢাকাকে ঘেরাও করার জন্য সারাদেশ থেকে মানুষ চলে আসে। যে যেভাবে সম্ভব আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর চোখ রাঙ্গানি উপেক্ষা করে চলে আসে আগে থেকে ঠিক করে দেওয়া দশটি পয়েন্ট। রাজধানীর উত্তরা, যাত্রাবাড়ি, শাহবাগ, সাইন্সল্যাব, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বাড্ডা ও চাঁনখার পুল, সাভারসহ রাজধানীর অন্তত ১০ টি পয়েন্টে। সেখানে নির্বিচারে গুলী চালায় পুলিশ এবং র্যাব। জনগণের টাকায় কেনা অস্ত্র তারা নিজ দেশের জনগণের ওপর প্রয়োগ করে নির্দ্বিধায়। লাশের ওপর দাঁড়িয়ে তারা হাসিনার স্বৈরাচারকে রক্ষার ব্যর্থ চেষ্টা করে।
ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ১৭ বছরের শাসনামলে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছেন খুনি হাসিনা। খুন গুম আর রক্তে পিচ্ছিল করেছেন রাজপথ। ক্ষমতার শেষ দিন পযন্ত তিনি মানুষ খুনে লিপ্ত ছিলেন। শেখ হাসিনার পলায়নের পরও মানুষ খুনে লিপ্ত ছিল স্বৈরাচারের দোসর পুলিশ বাহিনী। একটি আন্তর্জঅতিক তদন্ত সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে সেই চিত্র। তাতে বলা হয়, ‘মার্চ অন ঢাকা’ থামাতে, বিক্ষোভ কারীদের শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছাতে বাধা দিতে তখনো পুলিশ অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী গুলী চালাচ্ছিল। পুলিশের একজন কমান্ডার ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ‘সেদিন সকাল থেকেই সেনাবাহিনী জানত, শেখ হাসিনার পতন হয়ে গেছে। কিন্তু পুলিশ জানত না। তাই, পুলিশ তখনো সরকারকে রক্ষা করতে সর্বাত্মকভাবে মাঠে ছিল। টানা ৩৬ দিন ধরে চলা বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ভারতে পালিয়ে যান।
জাতিসংঘের তদন্ত সংস্তা ওএইচসিএইচআর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের গুলী করার ঘটনা নথিভুক্ত করে। সংস্থাটির তদন্ত বলছে, সব কটির ধরন ছিল একই। উদাহরণস্বরূপ, চানখাঁরপুলে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তারা ও অন্যান্য পুলিশ রাইফেল থেকে প্রাণঘাতী গুলী করেছে। শাহবাগের দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা করা বিক্ষোভকারীদের থামাতে তাঁরা কম প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, পুলিশ যাকে দেখেছিল, তাকে লক্ষ্য করে গুলী চালাচ্ছিল। রামপুরা ব্রিজ পার হয়ে বাড্ডায় যাওয়ার চেষ্টাকালে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ ধাতব গুলী ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীরা আহত হন। ওই এলাকায় সকালে গুলীতে আহত বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের নিবৃত্ত ও আটক করতে প্রাথমিকভাবে তল্লাশিকেন্দ্র (চেকপোস্ট) বসিয়েছিল। যখন আরও বেশি বিক্ষোভকারী দেখা যায়, তখন অন্তত প্রথম দিকে পুলিশ কম প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছিল। পরে প্রাণঘাতী গুলী ছোড়ে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী অন্যান্য আহত বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করতে গিয়ে ধাতব গুলীতে আহত হন। আওয়ামী লীগের সমর্থকেরাও বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলী চালান।
সাভার বাসস্ট্যান্ডের আশপাশে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলী চালায়। এতে বিপুলসংখ্যক হতাহত হন। একজন সাংবাদিক এলাকাটির বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁদের জোর করে মোতায়েন করেছেন। কিন্তু সেই সাধারণ পুলিশ সদস্যরা আরও হতাহতের ঘটনা ঘটাতে চাননি। ওই এলাকায় গুলী চালানোর ঘটনার আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শীও একটি ছেলের লাশ দেখেছেন। ছেলেটি ৫ আগস্ট নিহত হয়েছিল। এই প্রত্যক্ষদর্শী ওএইচসিএইচআরকে বলেছেন, ৫ আগস্ট ছিল ‘আমাদের (বিক্ষোভকারীদের) জন্য সবচেয়ে আনন্দের দিন, কিন্তু ছেলেটির মায়ের জন্য সবচেয়ে দুঃখের দিন।
৫ আগস্ট বিকেলে যখন জনতা শেখ হাসিনার বিদায় উদ্যাপন শুরু করেছিলেন, তখনো কিছু পুলিশ তাঁদের ওপর প্রাণঘাতী গুলী ছুড়ছিল। হতাহত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশ কয়েকটি শিশুও ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ও চিকিৎসার নথিতে এই বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছে যে উত্তরায় মা-বাবার সঙ্গে ‘বিজয় মিছিলে’ আসা ৬ বছর বয়সী একটি ছেলেকে গুলী করে হত্যা করা হয়েছিল। হাসিনার পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে ভিডিও ও ছবিতে আনন্দের মুহূর্তগুলো দেখা যায়। তবে সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলীর শব্দে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, যার ফলে জনতা পালিয়ে যায়। শিশুটির ঊরুতে গুলী লেগেছিল। পরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে সে মারা যায়।
আরেকটি ঘটনা ঘটে গাজীপুরে। সেখানে পুলিশ কর্মকর্তারা একজন নিরস্ত্র রিকশাচালককে আটক করে তাঁকে খুব কাছ থেকে গুলী করে হত্যা করেন। পুলিশ লাশটি টেনে নিয়ে যায়। তারা সেই লাশটি আর ফেরত দেয়নি। পরিবার তাদের প্রিয়জনকে দাফন করতে, শোক পালন করতে পারেনি। ওই রিকশাচালককে গুলী করা পুলিশ কর্মকর্তাকে গত সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যক্তির পরিবারের এক সদস্য ওএইচসিএইচআর-এর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেছেন, ‘আমি ন্যায়বিচার, স্বাধীন তদন্ত ও লাশ ফেরত চাই।
৫ আগস্ট বিকেলে বিক্ষোভকারীরা আশুলিয়া থানাকে নিশানা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিপুলসংখ্যক জনতা থানা ঘেরাও করে। পুলিশ বার বার পিছু হটার চেষ্টা করলেও তারা ইট পাটকেল নিক্ষেপ করতে করতে অগ্রসর হতে থাকে। জবাবে পুলিশ প্রাণঘাতী গুলী ভর্তি সামরিক রাইফেল ব্যবহার করে নির্বিচার গুলী চালায়। পুলিশ যখন নিজেদের সরে যাওয়ার পথ পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছিল, তখন এলোপাতাড়ি গুলী চলছিল। বিশেষভাবে সহিংস ব্যক্তিদের নিশানা করার পরিবর্তে জনতাকে ভয় দেখানোর জন্য তা বেশি করে করা হচ্ছিল বলে মনে হয়। এর ফলে বিক্ষোভকারী ও পথচারীদের মধ্যে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ১৬ বছর বয়সী এক ছাত্রকে খুব কাছ থেকে গুলী করা হয়, তার মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লেগেছিল, তাকে অবশ করে দেয়। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশে পুলিশ পরে গুলীবিদ্ধ লাশগুলো একটি ভ্যানে স্তূপ করে। তারা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মনে হচ্ছিল, তারা কাজটি করেছে এই আশায় যে, লাশ পোড়ানোর বিষয়টি এই মিথ্যা ধারণা তৈরি করবে যে, এসব লোক আন্দোলনকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন।
আসলে সেদিনের সকাল আর বিকালবেলাটা ছিল আলাদা চিত্র। সকাল বেলা ছিল আন্দোলন মূখর। আর বিকাল বেলাটা ছিল আনন্দমূখর। সকালবেলার বর্ণনাটা ছিল এরকম। দুপুর হতে থাকে আর পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। মৃত্যুর মুখে বীরবিক্রমে স্বৈরশাসকের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অকুতোভয় লাখ লাখ মানুষের বিজয়ের দিন। দুপুরে কার্গো বিমানে করে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে স্বৈরাচার পতনের অফিশিয়াল খবর নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে ঘোষণা আসে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের। এরপর জনতার বাঁধভাঙা জোয়ার আছড়ে পড়ে গণভবন ও সংসদ ভবনে। বাদ যায়নি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরও। পলাতক প্রধানমন্ত্রীর শোবার বিছানা থেকে শুরু করে রান্নাঘর-সর্বত্র ছিল বিক্ষুব্ধ জনতার সরব উপস্থিতি।
৫ আগস্ট সকালে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ ও আনসার সদস্যরা থানা ও এর কর্মকর্তাদের রক্ষায় বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলী করার নির্দেশ পান। তাঁরা থানার ভেতর এবং আশপাশে অবস্থান নিয়ে বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারীর ওপর প্রাণঘাতী রাইফেল ও শটগান দিয়ে গুলী চালায়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্ট ঢাকার ব্যস্ত এলাকা যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলীতে অন্তত ৫২ জন নিহত হয়। ঘটনার সময়কার প্রাথমিক প্রতিবেদনে ৩০ জন নিহতের কথা বলা হয়েছিল। বিবিসির তদন্তে ওই হত্যাকাণ্ড কীভাবে শুরু ও শেষ হয়, সে বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। একই ঘটনার চিত্র পাওয়া যায় মেডিকেলগুলোতে। ৬ আগস্ট সকাল পর্যন্ত হতাহতের স্তুুপ ছিল হাসপাতালগুলোতে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে জানান, ২০২৪ইং সালের ৫ তারিখেতো কারফিউ ছিল। সেখানে গণভবনকে কেন্দ্র করে আমাদের মূল প্ল্যানটা ছিল। সবাই যাতে গণভবনের দিকে যাত্রা শুরু করবেন। এক্ষেত্রে শাহবাগে আমাদের একটা পয়েন্ট ছিল। শাহবাগ থেকে সায়েন্স ল্যাব হয়ে ধানমন্ডি দিয়ে গণভবনের দিকে যাবে। এদিকে উত্তরা থেকে মহাখালী হয়ে একটা টিম ছিল আমাদের। বসুন্ধরা এবং রামপুরায় যারা ছিল ঐদিক থেকে ছিল আরেকটা টিম। অর্থাৎ ঢাকাকে বিভিন্ন সেকশনে ভাগ করে প্রত্যেকে একযোগে গণভবনের দিকে অভিযাত্রা। এই প্ল্যানটা ছাত্র শিবির ৩ আগস্ট থেকে ই করেছিলাম। ৪ তারিখ এবং ৫ তারিখ চূড়ান্তভাবে শেষ করেছি।
এর আগে মূলত ৩ আগস্ট হাসিনাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিলাম। আমরা একটা মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম এবং একদফা ঘোষণা হবে, এটাতো পাবলিকলি ঘোষনা হয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে। তার আগে কিন্তু মানুষের মুখে মুখে হয়ে যাচ্ছিল, যে এরকম কিছু একটা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে একটা প্ল্যান ছিল যে, যেহেতু ঢাকাতে শহীদ মিনারে সবাই জড়ো হবে; সবাইকে নিয়ে একসাথে যদি মুবটা যদি করা যায়, সেদিন-ই হয়তো এক দফা বাস্তবায়ন বা হাসিনার চূড়ান্ত পতন সেটা নিশ্চিত করতে পারবো। সেদিন বিকেল বেলা আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলাম এবং পুরো ঢাকার ম্যাপিং করে আমরা পর্যালোচনা করছিলাম। শহীদ মিনার থেকে যদি আমরা গণভবন অভিমুখে যাই, তাহলে কিছুটা আশঙ্কার জায়গা রয়েছে। সরকারের যারা গুন্ডাবাহিনীর রয়েছে, এবং প্রশাসনের তারা একমুখী যদি সবাইকে হামলা করে, তাহলে তাতে ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণটা বেশি হবে। এভাবে হয়তো মানসিক জায়গাটা নষ্ট হতে পারে। তখন আমরা চিন্তা করলাম আমাদের আরও দু’একদিন অপেক্ষা করতে হবে। পরবর্তীতে ৬ তারিখের যে একটা ঘোষণা ছিল, লং মার্চ হওয়ার কথা ছিল। বিশেষ করে ৪ তারিখে এতো বেশি ম্যাসাকার হয়েছে ফেনী এবং কুমিল্লাতে, সিলেট এবং নোয়াখালী অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক ম্যাসাকার হয়েছিল। আওয়ামী লীগ যুবলীগ ছাত্রলীগরা স্বশ্বস্ত্রভাবে হামলা চালিয়েছিল। তখন আমরা ভেবেছিলাম যে এভাবে যদি আরও একদিন দুইদিন অতিবাহিত হয়, তাতে শাহাদাতের ঘটনাগুলো আরও বেশি ঘটবে। সংখ্যাটা আরও বেড়ে যাবে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। তখন আমরা ৪ তারিখ বিকেলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ৬ তারিখের লং মার্চটা ৫ তারিখ আনা হয়। এবং সেদিন বিকেলে সেটা ঘোষণা করা হয়।
বিরোধীদলীয় নেতার বাণী : ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
গতকাল মঙ্গলবার দেওয়া এক বাণীতে তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের এক গৌরবময় ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, তরুণ-তরুণী, শিশু-বৃদ্ধ, নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ অভিন্ন দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। তিনি দাবি করেন, ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয় এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তার সরকারের পতন ঘটে।
বাণীতে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছরের একনায়কতন্ত্র, জুলুম-নির্যাতন ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের মাধ্যমে দেশের মানুষ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেয়েছে। তবে এ আন্দোলনের জন্য জাতিকে বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত হন। এছাড়া বহু মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমসহ আন্দোলনে নিহতদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে আহত, পঙ্গুত্ব বরণকারী, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং নির্যাতিতদের প্রতি সমবেদনা ও কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, ইনসাফভিত্তিক, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটি মহলের কারণে আন্দোলনের প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে তার দাবি। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, অতীতের বিভেদ ভুলে বৈষম্যহীন, মানবিক, সুখী-সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।