ঐতিহাসিক ৩৬ জুলাইয়ের ২ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ আজ একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার সংকট এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ের পর যে গণ বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছে, তাকে কেও ‘জুলাই বিপ্লব’ আবার কেউ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করছেন। ইতিহাস একদিন এর যথাযথ নাম নির্ধারণ করবে; কিন্তু এ নিয়ে দ্বিমতের খুব বেশি অবকাশ নেই যে, এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার বিদ্যমান পদ্ধতির বিরুদ্ধে জনগণের গভীর অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের লক্ষ্য কি কেবল সরকার পরিবর্তন ছিল, নাকি রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন? যদি দ্বিতীয়টিই সত্য হয়, তবে আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছেÑ সংবিধানের কয়েকটি ধারা সংশোধন করলেই কি বিপ্লবের আকাক্সক্ষা পূরণ হবে, নাকি রাষ্ট্রের মৌলিক সাংবিধানিক বন্দোবস্ত পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণ করতে হবে?
জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপট
বিপ্লব পূর্ব ১৬ বছরে দেশের রাজনৈতিক অবস্হা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে বহু মানুষের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র ও সরকার কার্যত অভিন্ন হয়ে পড়ে। বিরোধী রাজনৈতিক দল, ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিক, সাংবাদিক, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী কিংবা সামাজিক কর্মীরা নানাভাবে দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। হত্যা, গুম, মামলা, হামলা, রাজনৈতিক হয়রানি এবং মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যখন একটি ফ্যাসিবাদী সরকার দীর্ঘ সময় ধরে তাদের বিরোধিতাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ চরিত্র ক্ষয় হতে থাকে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, শত্রু হিসেবে বিবেচনা করার সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত সমাজের প্রতিটি স্তরে বিভাজন সৃষ্টি করে, ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। ফলে জনগণের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়। আরেকটি ভয়ংকর বিষয় ছিল, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে নষ্ট করে দেয়া হয়। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও দেশে বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এসব পরিস্থিতি এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছিল যেখানে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের সাংবিধানিক পথ কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ভাষার মধ্যেও একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পরিবর্তে, অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে “রাজাকার” বা অনুরূপ অবমাননাকর অভিধায় চিহ্নিত করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। ইতিহাসের গৌরবকে জাতীয় সংহতির পরিবর্তে রাজনৈতিক বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ফলে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে পারস্পরিক অবিশ্বাসকে আরও গভীর করে।
বিপ্লবের প্রত্যাশা
জনগণ কেবল ক্ষমতার পালাবদল চায়নি; তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন ও কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছে। একটি সরকারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে আরেকটি সরকার ক্ষমতায় আসাই যদি পরিবর্তনের একমাত্র ফলাফল হয়, অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি, ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহির কাঠামো এবং নাগরিক অধিকারের বাস্তব অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে, তবে সেই পরিবর্তন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে কোনো ব্যক্তি, পরিবার, রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী কখনোই রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কার্যকর সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ সবসময় বিদ্যমান থাকে।
এই প্রত্যাশার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল একটি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। জনগণ এমন একটি নির্বাচন কমিশন চায়, যা সরকারের আনুগত্যের পরিবর্তে কেবল সংবিধান ও আইনের প্রতি অনুগত থাকবে। নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা এমন পর্যায়ে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রতিটি নাগরিক বিশ্বাস করতে পারেন যে তার ভোটাধিকার নিরাপদ, প্রতিটি ভোটের সমান মূল্য রয়েছে এবং জনগণের রায়ই সরকার গঠনের একমাত্র বৈধ ভিত্তি। কারণ গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর নয়; বরং নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য তার ওপর। একইভাবে জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত থেকে কেবল সংবিধান ও আইনের ভিত্তিতে বিচার করবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো বিচারকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা। আদালত যদি নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত না থাকে, তবে সংবিধান, মৌলিক অধিকার এবং আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তাই বিচার বিভাগকে এমন সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দিতে হবে, যাতে যে কোনো নাগরিক ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও নির্ভয়ে ন্যায়বিচার চাইতে পারেন।
জনগণের প্রত্যাশা প্রশাসন সম্পর্কেও ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রশাসন হবে রাষ্ট্রের প্রশাসন, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রশাসন নয়। রাষ্ট্রের কর্মচারীরা জনগণের করের অর্থে পরিচালিত হন; তাদের আনুগত্য সংবিধান, আইন এবং প্রজাতন্ত্রের প্রতি, কোনো দল বা ব্যক্তির প্রতি নয়। একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক প্রশাসনই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। প্রশাসনিক নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি কিংবা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যদি রাজনৈতিক আনুগত্য প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে, তবে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ চরিত্র ক্ষুণ্ন হয় এবং নাগরিকের সমান আচরণ পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারকে কার্যকরভাবে সুরক্ষিত করাও ছিল জনগণের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা। সংবিধানে অধিকার লিপিবদ্ধ থাকলেই তা নিশ্চিত হয় না; রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আচরণে সেই অধিকার প্রতিফলিত হতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ন্যায্য বিচারের অধিকার এবং আইনের সমান সুরক্ষা—এসব কেবল তাত্ত্বিক সাংবিধানিক ঘোষণা নয়; এগুলো নাগরিক জীবনের বাস্তব নিশ্চয়তা হওয়া প্রয়োজন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার সমালোচনার মুখোমুখি হবে—এটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সমালোচনাকে দমন করা নয়; বরং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারকে সম্মান জানানো।
একই সঙ্গে জনগণ এমন একটি সাংবিধানিক কাঠামো প্রত্যাশা করেছে, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য (checks and balances) প্রতিষ্ঠিত থাকবে। ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়েই কর্তৃত্ববাদের জন্ম দিয়েছে। তাই আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার এমন ভারসাম্য থাকতে হবে, যাতে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি রাষ্ট্রের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা থেকে রক্ষা করে।
জনগণের প্রত্যাশার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অতীতে সংঘটিত গুরুতর সাংবিধানিক লঙ্ঘন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা। ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তবে সেই বিচার অবশ্যই প্রতিশোধের ভিত্তিতে নয়; সংবিধান, আইন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায়বিচারের মানদণ্ড অনুসারে হতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভবিষ্যতের অপরাধকে উৎসাহিত করে, আর ন্যায়সঙ্গত ও নিরপেক্ষ বিচার ভবিষ্যতের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এই কারণেই জনগণের দাবি ছিল কেবল জবমরসব ঈযধহমব বা সরকার পরিবর্তন নয়; বরং System
Change —অর্থাৎ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে; ক্ষমতা নয়, সংবিধান সর্বোচ্চ হবে; দল নয়, রাষ্ট্র হবে সবার; এবং শাসকের সদিচ্ছার পরিবর্তে আইন, জবাবদিহি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই নাগরিকের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার প্রধান নিশ্চয়তা হয়ে উঠবে।
সংবিধান সংশোধন না সংস্কার?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে ঘোষণা করা হয়েছে যে, জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক এবং সংবিধান জনগণের অভিপ্রায়ের সর্বোচ্চ প্রকাশ। এই নীতির আলোকে প্রশ্ন উঠতে পারে যদি জনগণ রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুস্পষ্ট ইচ্ছা ব্যক্ত করে, তবে সেই ইচ্ছা বাস্তবায়নের সাংবিধানিক পথ কী? অনেকে যুক্তি দেন যে ২০২৬ সালের জুলাই সনদ এবং পরবর্তী জাতীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য জনগণের নতুন সাংবিধানিক আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। তাঁদের মতে, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সমঝোতা নয়; বরং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার সাংগঠনিক প্রকাশ। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোকে সেই নতুন জনগণ-অভিপ্রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, আরেকটি মত হলো—সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে সংসদ সংশোধনী এনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে পারে। এখানেই শুরু হয় প্রকৃত সাংবিধানিক বিতর্ক।
বাংলাদেশের সংবিধান সংসদকে সংশোধনের ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক পঞ্চম সংশোধনী মামলায় ((Bangladesh Italian Marble Works Ltd. v. Government of Bangladesh) আদালত Basic Structure Doctrine-কে স্বীকৃতি দেন। আদালতের মতে, সংসদ সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করতে পারে না। এই নীতি ভারতের Kesavananda Bharati মামলার ধারাবাহিকতায় বিকশিত হলেও বাংলাদেশে এটি এখন সুপ্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক নীতি। এখন প্রশ্ন হলো যদি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের কাঠামো, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা কিংবা নির্বাহী-আইনসভা-বিচার বিভাগের সম্পর্ক পুনর্লিখনের প্রয়োজন হয়, তবে তা কি কেবল ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে সাধারণ সংশোধনীর মাধ্যমে করা সম্ভব? আইনগতভাবে এই প্রশ্নের উত্তর মোটেও সহজ নয়।
আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ (৮ম সংশোধনী মামলা)-তে আপিল বিভাগ রায় দেন যে, বিচার বিভাগের মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন সংশোধনী টেকসই হতে পারে না। ধরা যাক, ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক সংস্কারের অংশ হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, আঞ্চলিক সাংবিধানিক আদালত অথবা নতুন বিচারিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আসে। তাহলে প্রশ্ন হবে—এটি কি ৮ম সংশোধনী মামলার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? নাকি পুনরায় বিচারিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে? একই প্রশ্ন নির্বাচন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক কমিশনের কাঠামো এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মতাদর্শগত বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে, পঞ্চম সংশোধনীর বিচারিক পরিণতি আমাদের সামনে একটি মৌলিক আইনগত বাস্তবতা তুলে ধরতে পারে যে কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তার আইনগত ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় প্রণীত সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছিল, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পূনর্জন্ম হয়েছিল । দীর্ঘ সময় ধরে সেই সংশোধনী কার্যকর ছিল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ হিসেবে প্রয়োগও হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্ট সেই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। এর ফলে দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয় এবং বহু মৌলিক প্রশ্ন পুনরায় বিচারিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। এই অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো—বৃহৎ রাজনৈতিক পরিবর্তন যদি দৃঢ় ও টেকসই সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে তা ভবিষ্যতে বিচারিক পর্যালোচনার মুখে পড়ার ঝুঁকি বহন করে। রাজনৈতিক ঐকমত্য বা সাময়িক জনপ্রিয়তা কোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে স্থায়ী বৈধতা প্রদান করে না; সেই বৈধতা নিশ্চিত করতে হয় সংবিধানসম্মত, সুসংহত এবং আইনগতভাবে টেকসই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
আজ যদি রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তবে অতীতের এই অভিজ্ঞতাকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় বর্তমান প্রজন্ম যে সংস্কার বাস্তবায়ন করবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হয়তো আবারও তার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে দীর্ঘ বিচারিক লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। ইতিহাসের একই আইনগত দুর্বলতার পুনরাবৃত্তি করা কোনো বিচক্ষণ রাষ্ট্রের জন্য কাম্য হতে পারে না।
যদি বিপ্লবের উদ্দেশ্য সত্যিই রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পুনর্গঠন হয়, তবে সেই লক্ষ্যকে কেবল কয়েকটি সাংবিধানিক ধারা সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। একটি প্রকৃত বিপ্লব কেবল ক্ষমতাসীন ব্যক্তির পরিবর্তন বা সরকারের রদবদলের নাম নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, ক্ষমতার বিন্যাস এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি নতুন জাতীয় ঐকমত্যের প্রতিফলন। ফলে বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ যদি এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় যেখানে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোকেই নতুনভাবে মূল্যায়ন ও পুনর্গঠন করতে হবে।
এই পুনর্গঠনের প্রথম শর্ত হলো ক্ষমতার কাঠামোকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করা, যাতে রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত না হয়। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার উৎস জনগণ হলেও, সেই ক্ষমতার প্রয়োগ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণভাবে বণ্টিত থাকে। নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা, বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমন একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান অপরটির ওপর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। এই ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন সাধারণত বিচ্ছিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে নয়; বরং সমন্বিত সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমেই অধিক কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
একইভাবে নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার কেবল নির্বাচন কমিশনের গঠন বা কয়েকটি আইনি বিধান পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক অবস্থান, নিয়োগ পদ্ধতি, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা, নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, নির্বাচনী প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় আংশিক পরিবর্তন হয়তো কিছু প্রশাসনিক সমস্যা সমাধান করতে পারে, কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে না।
বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা শুধু বিচারক নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং বিচার বিভাগের সাংবিধানিক অবস্থান, প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন, আর্থিক স্বাধীনতা, জবাবদিহির কাঠামো এবং বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার পাওয়ার বাস্তব সক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যদি বিচার বিভাগকে প্রকৃত অর্থে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে সেই সংস্কারকে সামগ্রিকভাবে বিচার করতে হবে। বিচ্ছিন্ন সংশোধনী প্রায়ই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়, কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা তার সামগ্রিক সাংবিধানিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করে।
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি পুনর্লিখনের প্রশ্নটি আরও গভীর। সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি, নাগরিকের অধিকার, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং সাংবিধানিক দর্শন পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। এই অংশগুলোর একটিতে পরিবর্তন আনলে অন্য অংশগুলোকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হয়। ফলে যদি বিপ্লবের লক্ষ্য রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তবে কেবল একটি বা দুটি অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। একটি সুসংহত ও পরস্পর-সামঞ্জস্যপূর্ণ সাংবিধানিক পুনর্লিখন ছাড়া এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন প্রায়ই অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আইনগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
একইভাবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্র্নিধারণও বিচ্ছিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে সহজে সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ও পারস্পরিক সম্পর্ক একটি সামগ্রিক সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ। একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বাড়ানো বা কমানো হলে অন্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং জবাবদিহির ব্যবস্থাও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হয়। অন্যথায় সাংবিধানিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং নতুন সংকটের জন্ম নিতে পারে।
এই কারণেই বলা যায়, যদি বিপ্লবের লক্ষ্য রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন হয়, তবে বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত সংশোধনীর মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হতে পারে। একটি ধারার পরিবর্তন আরেকটি ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে, আবার একটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার অন্য প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ক্ষমতার সঙ্গে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আংশিক পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক রূপান্তর ঘটানো অনেক সময় আইনগত অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ বিচারিক বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই এখানে ‘সংস্কার’ বলতে কেবল কয়েকটি ধারা পরিবর্তনকে বোঝানো হচ্ছে না। বরং এর অর্থ হলো একটি সুপরিকল্পিত, পরস্পর-সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অভ্যন্তরীণভাবে সঙ্গতিপূর্ণ সাংবিধানিক বন্দোবস্ত, যা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি মৌলিক প্রশ্নকে একই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পুনর্বিন্যাস করবে। এমন একটি সাংবিধানিক সংস্কারের ভিত্তি হতে হবে বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্য, স্বচ্ছ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন। একই সঙ্গে এর আইনগত ভিত্তিও হতে হবে এতটাই শক্তিশালী যে তা ভবিষ্যতে বিচারিক পর্যালোচনার মুখেও টিকে থাকতে পারে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।
অতএব, বিপ্লবের আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল সংবিধানের ভাষা পরিবর্তন নয়; বরং এমন একটি স্থিতিশীল, টেকসই এবং জনগণ-অনুমোদিত সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণ করা, যা ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারকে সংবিধানের সীমার মধ্যে পরিচালিত হতে বাধ্য করবে এবং রাষ্ট্রকে আবারও কর্তৃত্ববাদ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সাংবিধানিক সংকটের দিকে ফিরে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে।
বিশ্বের বহু দেশ বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সাংবিধানিক বন্দোবস্ত গ্রহণ করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর একটি অন্তর্বর্তী সংবিধান প্রণীত হয় এবং পরে গণঅংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন সংবিধান গৃহীত হয়। কেনিয়া ২০১০ সালে গণভোটের মাধ্যমে নতুন সংবিধান গ্রহণ করে, যাতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের নতুন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। চিলিতেও সামরিক আমলের সংবিধান পরিবর্তনের লক্ষ্যে জাতীয় সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়, যদিও প্রথম খসড়া গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে সাংবিধানিক বৈধতার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছিল। এই উদাহরণগুলো দেখায়, গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কেবল আংশিক সংশোধন নয়, বরং আমূল সংস্কারই অধিক টেকসই সমাধান হতে পারে।
ইতিহাস জাতিকে খুব কমই দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। বাংলাদেশ আজ সেই বিরল সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে। আমরা চাইলে কয়েকটি ধারা সংশোধন করে রাজনৈতিক সংকট সাময়িকভাবে মিটিয়ে ফেলতে পারি। কিন্তু তাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট ফিরে আসার ঝুঁকি থেকে যাবে। অন্যদিকে, যদি জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকে ভিত্তি করে একটি আইনগতভাবে সুদৃঢ়, রাজনৈতিকভাবে সর্বসম্মত এবং গণতান্ত্রিকভাবে বৈধ সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করা যায়, তবে সেটিই হতে পারে জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত অর্জন। বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল কেবল সরকার পরিবর্তন নয়; রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন। আর রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে হলে কেবল সংবিধান সংশোধন যথেষ্ট নাও হতে পারে-প্রয়োজন হতে পারে একটি সুপরিকল্পিত, সর্বসম্মত এবং ভবিষ্যতমুখী সংবিধান সংস্কার। কারণ, একটি ভালো সংবিধান কেবল বর্তমানকে পরিচালনা করে না; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে।