আমার ফটো সাংবাদিকতা শুরু হয় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের শেষ টার্মের প্রথম দিকে অর্থাৎ ২০০৯ সালের মাঝামাঝি। তখন থেকে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের বিরোধী যেসমস্ত দল আছে তাদের মধ্যে বড় দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের গড়া বহু আন্দোলন ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখেছি। এসব আন্দোলন দেখে একসময় মনে হয়েছে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার তার শিকড় এত গভীরে ঢুকিয়েছে তাকে ওঠানো অসম্ভব। সরকারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এরপর আসে সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়া আন্দোলন, যা ধীরে ধীরে জোরদার হতে থাকলেও পূর্বের বড় বড় রাজনৈতিক দলের বড় বড় আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়তে দেখার কারণে এই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে অন্যসব আন্দোলনের মতোই ভেবেছিলাম। ভেবেছি হয়তো এই আন্দোলন আরও কয়েকদিন চলবে, তারপরে একসময় ঠিকই ফ্যাসিস্ট হাসিনা তাদেরকে দমিয়ে ফেলবে।

কিন্তু না আমার সব ভাবনা-চিন্তা পাল্টে যায় যখন দেখলাম ২৩জুলাই ২০২৪ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ছাত্রদের সংবাদ সম্মেলনে ভয়-ডরহীনভাবে, দৃঢ় সাহসিকতার সাথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিতে। কারণ এর আগে সমন্বয়ক নাহিদ, আসিফকে গুম করা হয়, নাহিদকে ছেড়ে দিলেও তখনও আসিফ-এর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। আসিফের বাবা-মা ঐ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে আসিফের সন্ধান দেয়ার দাবি জানান। গুমের কাহিনী নাহিদ নিজেই সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলেন, আন্দোলন যাতে নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে সেজন্য তাকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী (ডিবি বা ডিজিএফআই) কর্তৃক ২০ জুলাই তুলে নিয়ে গিয়ে ব্যাপক নির্যাতন করে।

পরবর্তীতে ২৪ ঘণ্টা পর তাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় পূর্বাচলে ফেলে দেয়। পরে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় তাকে জোর করে সংবাদ সম্মেলনে নেওয়া হয় যাতে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু নাহিদ কর্মসূচি প্রত্যাহার না করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় ঘোষণা দেন। স্বশরীরে উপস্থিত থেকে এই সংবাদ সম্মেলনটি আমি আমার ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি করি। তখনকার পরিবেশ পরিস্থিতি সম্বন্ধে না বললেই নয়Ñ পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ডিআরইউ-এর চারদিক ঘিরে রেখেছে। যেটা দেখে আমি নিজেই ভয় পেয়ে যাই এবং মনে মনে ভাবি, এত ভীতিকর পরিস্থিতির চাপ এই ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা নিতে পারবে কিনা। আমি ভেবেছি তারা আজকেই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেবে, আজকেই সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ওদের দৃঢ়তা, একাগ্রতা ও প্রচণ্ড সাহস দেখে আমি অভিভূত হয়ে যাই। নাহিদ, হাসনাত, সারজিসসহ যেসব শিক্ষার্থী ওখানে এসেছে তাদের কারো চোখে-মুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের ছাপ আমি দেখিনি। আমি তখন থেকেই প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম যে, এবার আর ফ্যাসিস্ট হাসিনার রক্ষা নেই। এবার ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হবেই।

এরপর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে সরকার পতনের একদফা আন্দোলন চলতে থাকে। পরবর্তীতে আসে ৫ আগস্ট অর্থাৎ ৩৬শে জুলাইয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। যা ছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের শেষ কর্মসূচি।

আমি যথারীতি বাসা থেকে সকাল সকাল বের হইÑ যেহেতু আন্দোলনের কারণে সারাদেশের মতো রাজধানীতে রাস্তায় গাড়ি নেই সেহেতু অন্যদিনের মত ওইদিনও হেঁটে হেঁটে উত্তর বাড্ডা থেকে ছবি তুলতে তুলতে পুরানা পল্টন আসি। কিন্তু ওইদিন আসার সময় রাস্তার মোড়ে মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান দেখতে পাই। কোন শিক্ষার্থীকে আশেপাশে দেখতে না পেয়ে মনে মনে ভাবছিলাম, ছেলেরা কি দমে গেল? কিন্তু পরোক্ষণে ভাবলাম না, ওইদিন নাহিদ, হাসনাত, সারজিসদের যে সাহস দেখেছি ওরা দমে যাওয়ার নয়। নিশ্চয়ই ওরা বের হবেÑ এটা আমার বিশ্বাস। পরবর্তীতে যেটা ভাবছিলাম সেটাই হলো, আমি যখন পল্টন আসলাম তখন আমার সহকর্মীদের কাছে শুনতে পাই যে, ছাত্ররা উত্তরা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন জায়গায় রাস্তায় নেমে গেছে। এটা শোনার পর মনে মনে ভাবি, যেহেতু আমার জীবদ্দশায় কোন স্বৈরাচারের পতন নিজের চোখে দেখিনি এবার হয়তো দেখতে পাবো। তখন দুপুর ১টা বাজে। যোহরের নামাযের সময় হয়েছে, খাবারও খেতে হবে। পাশে থাকা আমাদের ফটোজার্নালিস্ট এসোসিয়েশনে গিয়ে নামায ও খাবার খাওয়া সেরে টিভির দিকে লক্ষ্য করতেই দেখতে পাই একটি ঘোষণÑ সেনা প্রধানের সংবাদ সম্মেলন দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হবে (পরে অবশ্য সময় পরিবর্তন হয়েছিল)। এর মধ্যেই শুনতে পাই, বাইরে মানুষের স্লোগান “পলাইছে রে পলাইছে শেখ হাসিনা পলাইছে”। আমি তৎক্ষণাৎ বাইরে বের হলাম, বের হয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড! সারা রাস্তাজুড়ে জনস্রোত। কাঁধে ক্যামেরাটা নিয়ে আমি সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম।

পুরানা পল্টন মোড়ে এসে দেখি তিনদিক থেকে মানুষ বিজয় উল্লাস করতে করতে শাহবাগের দিকে ছুটছে আর স্লোগান ওই একটাইÑÑ “পলাইছে রে পলাইছে শেখের বেটি পলাইছে”। রাস্তায় এত মানুষ এর আগে আমি আর কখনও দেখিনি। শুধু আমি কেন আমার পাশেই এক বৃদ্ধকে বলতে শুনেছি যে একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার দিনেও নাকি উনি এত মানুষ দেখেননি।

পরোক্ষণেই দেখি, জিরো পয়েন্টে জনতার ছুটাছুটি ও উল্লাস। উপর দিকে তাকাতেই দেখতে পাই বঙ্গবন্ধু এভিনিউ-এর ওপর দিয়ে কালো ধোঁয়া। শুনতে পেলাম এক লোক বলতে বলতে যাচ্ছিল “দিছে আওয়ামী লীগের কার্যালয় পুরাইয়া দিছে”। তখন আমি দৌড়ে সেখানে যাই এবং ছবি তুলতে থাকি আর মনে মনে ভাবতে থাকিÑ এইতো বেশ কয়েক বছর আগের কথাÑ এই কার্যালয়েই দৈনিক সংগ্রামে কাজ করি বিধায় আমাকে আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলনে শুধু ঢুকতে দেয়াই হয়নিই বরং এক প্রকার ভীতি প্রদর্শন করে আমাকে বের করে দিয়েছিল। যদিও আমি বলেছিলাম ভাই আমি তো ওখানে চাকরি করি, কিন্তু আমি তো একজন সাংবাদিক। সাংবাদিক হিসেবে তো প্রোগ্রামটা কভারেজ করতে পারি। ওখানে দায়িত্বরতরা আমাকে ঢুকতে দেয়নি, বলেছিল, সংগ্রাম পত্রিকা আমাদের দরকার নেই। সেদিন তাদের ভিতরে অতিমাত্রায় অহংকার দেখেছি আর বির বির করে বলেছি বেশি অহংকার ভালো নয়। বেশি অহংকার করলে পতন হয়। সেই অহংকারের ফলস্রুতিতে আজকে দাঁড়িয়ে দেখলাম কি জৌলুসে গড়া আওয়ামী লীগের কার্যালয় যা বেশি দিন হয়নি নতুন করে সাজিয়েছে, তা দাউ দাউ করে জ্বলছে আর সাধারণ জনতা বুক চিতিয়ে উল্লাস করছে।

আওয়ামী কার্যালয় ভাঙা ও আগুন দেয়ার ছবি তোলা শেষে আমি আবার পুরানা পল্ট মোড়ে এসে দেখিÑ সাধারণ জনতা মোড়ের কানায় কানায় পূর্ণ। সবাই বিজয় উল্লাস করছেন। এদের মধ্যে অনেকেই মিষ্টি, মধু ও রসমালাই দিয়ে মিষ্টিমুখ করছেন যেন খুশির জোয়ার বইছে। তখন আমার আর বোঝার বাকি রইল না যে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের ঘোষণা হয়ে গেছে। মানুষের মাঝে এত আনন্দের জোয়ার দেখে আমি বুঝলাম যে দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্টের পরের যে আনন্দ সেটা এরকমই হয়।

২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলনের ভয়াবহ ও গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলোর বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও আবেগের গল্পগুলো ক্যামেরার পেছনের কারিগর হিসেবে তুলে ধরে নিজেকে কৃতজ্ঞ ও সম্মানিত মনে করছি।